আল্লাহ ছাড়া মানব রচিত কোন আইন বিধানের আনুগত্য করার অধিকার আমাদের নেই

0
2192

আমরা জানি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ছাড়া হুকুম বা আইন বিধান দেয়ার অধিকার কারো নেই। অবশ্য এটা বুঝতে এত বেশি দলীল প্রমাণ প্রয়োজন হয় না। সাধারণ সেন্সেই এটা বুঝা যায় যে, যিনি এই পুরো বিশ্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টির জন্য আইন বা বিধান দেয়ার অধিকার তো একমাত্র তাঁরই হবে।

Advertisement

এটা তাওহীদ আল হাকিমিয়্যাহ তথা তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ এর অংশ। অর্থাৎ আইন বা বিধানদাতা হিসেবে আল্লাহ এক এবং এক্ষেত্রে তাঁর কোন শরীক নেই।

বেশিরভাগ মানুষই এই তাওহীদে বিশ্বাস করে। কারণ এই তাওহীদ বিশ্বাসের সাথে জড়িত। সেজন্য অধিকাংশ মানুষই এতে আপত্তি করে না। কিন্তু আপত্তি করে কর্মের তাওহীদে। অর্থাৎ যখন বলা হয়, আল্লাহর দেয়া আইন ছাড়া মানব রচিত কোন আইন বিধান মানা যাবে না বরং সকল ক্ষেত্রেই এক আল্লাহর দেয়া আইন বিধান মানতে হবে, তখনই সবাই আপত্তি শুরু করে। এক আল্লাহ ছাড়া আইন তৈরি করার অধিকার কারো নেই — এটা যেমন তাওহীদ, তেমনি এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হুকুমের আনুগত্য করা যাবে না — এটাও তাওহীদ। আর এটাকে বলা হয় কর্মের তাওহীদ বা তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ বা তাওহীদ আল ইবাদাহ। যুগে যুগে এই তাওহীদের ক্ষেত্রেই মানুষ আল্লাহর সাথে শিরকে লিপ্ত হয়েছে। এ জন্য যুগে যুগে সকল নবী-রাসূলদের দাওয়াতের মূল বাণী ছিল এই তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ বা তাওহীদ আল ইবাদাহ।

যেমন আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেনঃ “তোমার আগে আমি এ ওহী ব্যতীত কোন রাসূল প্রেরণ করিনি যে, আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর”। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত ২৫]

“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক”। [সূরা নাহল, আয়াত ৩৬]

সুতরাং এই উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদত, অনুসরণ এবং আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেয়ার জন্যই আল্লাহ সকল নবী রাসূল পাঠিয়েছেন।

আজকে আমরা আদেশ তথা হুকুম বা আইন বিধান মানার মাধ্যমে আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদের ব্যাপারে আলোচনা করব। অর্থাৎ মানব রচিত কোন আইন বিধান বা কোন তন্ত্র-মন্ত্র মানা যাবে না। বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে এক আল্লাহর দেয়া আইন বিধানেরই আনুগত্য করতে হবে। নিচে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলঃ

নিরঙ্কুশ আনুগত্য হবে শুধু আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্য। আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য যে কেউ, কোন আলেম, শাসক বা বিচারকের আনুগত্য হবে আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যের শর্ত সাপেক্ষে।

“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বের অধিকারী তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড় তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম”। [সূরা নিসা, আয়াত ৫৯]

এ আয়াতে যে শব্দ দ্বারা আনুগত্য করার আদেশ দেয়া হয়েছে অর্থাৎ আত্বী’উ শব্দটি আল্লাহ ও রাসূলের আগে এসেছে কিন্তু উলিল আমর (কর্তৃত্বের অধিকারী) এর আগে আসে নি। এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে শর্তহীন, নিরঙ্কুশ আনুগত্য হবে শুধু আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্য। আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য যে কেউ, কোন আলেম, শাসক বা বিচারকের আনুগত্য হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের শর্ত সাপেক্ষে। তারা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথার বিরুদ্ধে কোন আদেশ করে, সে ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলেরই আনুগত্য করতে হবে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিরঙ্কুশ আনুগত্য করতে বলা হয়েছে কারণ রাসূলের আনুগত্য করাই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্য করা। কারণ আল্লাহর যাবতীয় আদেশ নিষেধ আমরা একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমেই পেয়েছি। এ জন্য রাসূলের আনুগত্য ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য করা সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেনঃ “যে লোক রসূলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল”। [সূরা নিসা, আয়াত ৮০]

কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণ করে আমাদেরকে কিছু করতে বলেন নি বরং উনি যা কিছু বলেছেন পুরোটাই ওহী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ “নক্ষত্রের কসম যখন অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হন নি এবং বিপথগামীও হন নি এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। বরং তা হচ্ছে ওহী যা প্রত্যাদেশ হয়”। [সূরা নাজম, আয়াত ১-৪]

এ জন্যই আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক”। [সূরা হাশর, আয়াত ৭]

বরং রাসূল পাঠানোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে যাবতীয় বিধি বিধান বর্ণনা করা। কারণ আল্লাহ সকল মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলেন না। পৃথিবীতে নবী রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে আল্লাহ সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেন। নবী রাসূলদের আদেশ নিষেধই হল আল্লাহর আদেশ নিষেধ আর এ ক্ষেত্রে নবী রাসূলদের মান্য করা হল আল্লাহকেই মান্য করা। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নবী রাসূলদের মান্য করার জন্যই আল্লাহ তাদেরকে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ নিষেধ মান্য করা হয়”। [সূরা নিসা, আয়াত ৬৪]

এ জন্য সকল ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের আনুগত্য করতে হবে। যে কোন মতপার্থক্য, ঝগড়া বিবাদের ক্ষেত্রে একমাত্র রাসূলকেই বিচারক হিসেবে মেনে নিতে হবে। অন্যথায় ঈমান থাকবে না। কারণ আল্লাহ তা’আলা এটাকে ঈমানের শর্ত বানিয়েছেনঃ

“অতএব তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক কস্মিনকালেও ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা সন্তুষ্ট চিত্তে কবুল করে নেবে”। [সূরা নিসা, আয়াত ৬৫]

এখন যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে নেই সেহেতু বর্তমান সময়ে রাসূলের সুন্নাহ তথা রাসূলের রেখে যাওয়া ইসলামিক শরীয়াহকেই বিচারক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে শাসনকার্য, বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে বিধি বিধান একমাত্র ইসলামিক শরীয়াহ থেকেই গ্রহণ ও মান্য করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহ তা’আলা নিজের শপথ করে বলছেন, এর ব্যতিক্রম যারা করবে তারা ঈমানদার নয়। আল্লাহ তা’আলা এটা এমনিতে বললেই যথেষ্ঠ ছিল। কিন্তু এর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আল্লাহ নিজের শপথ করে বললেন। অর্থাৎ যারা এরকম করবে তাদের ঈমানদার না হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ নিজেই সাক্ষী।

সে ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে? যেখানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়ত কারো কারো পক্ষে কিছু ইসলামিক বিধি বিধান পালন করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবন চলছে জাহেলিয়াতের বিধি বিধান দ্বারা। ৯০% মুসলিমের দেশে ইসলামিক শরীয়াহকে বাদ দিয়ে দেশ চলছে পশ্চিমাদের থেকে আমদানী করা কুফুরী জীবন বিধান গণতন্ত্র দ্বারা। আর আমরাও এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ না করে এটাকে মেনে নিয়ে শুধুমাত্র কিছু নামায, রোজা আর যিকির করেই ইসলামিক জীবন যাপন করছি বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি। এ সমস্ত কুফর, শিরক ও জাহেলিয়াতকে সমাজ ও দেশ থেকে উৎখাত করে শুধুমাত্র আল্লাহর তাওহীদ (আইন ও বিধি বিধানের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ) প্রতিষ্ঠার কোনরূপ প্রচেষ্টাই যখন আমাদের মধ্যে নেই, তখন কি করে আমরা নিজেদেরকে তাওহীদপন্থী দাবী করি? এ ক্ষেত্রে উপরের আয়াত অনুযায়ী আমাদের ঈমানদার হওয়ার দাবীটাই কতটুকু যুক্তিযুক্ত? এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। এসব প্রশ্নের সমাধান দুনিয়াতে করতে না পারলে পরকালে করার আর কোন সুযোগ থাকবে না।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here