আবারও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা উদ্বেগজনক। জানা গেছে, সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও বুধবার রাতে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এর আগে গত কয়েক দিনে অন্তত পাঁচশ রোহিঙ্গা মিয়ানমারের আরাকান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বস্তুত রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কারণেই তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন বলে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আতঙ্কের এ পটভূমি তৈরি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘদিনের। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সামাল দেয়ার তাৎক্ষণিক কোনো প্রস্তুতি আমাদের নেই। গত বছরের অক্টোবরে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন, ধর্ষণ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ছাড়াও ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে জাতিগত দাঙ্গায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছিল।
আলোচনার মাধ্যমে তখন অনেককে ফেরত পাঠানো হলেও প্রচুর রোহিঙ্গা এখনও বাংলাদেশে রয়ে গেছে। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কারণে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় আর্থ-সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির ঘটনা সর্বজনবিদিত। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ গিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে এবং এর দায়ভার বর্তাচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হলেও সমস্যাটির সমাধান আজ পর্যন্ত হয়নি। বাংলাদেশ বরাবরই রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। দুঃখজনক হল, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা ইস্যুকে সংকট হিসেবে স্বীকার করে নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগও নেয়নি দেশটি। তাছাড়া সংকট নিরসনের লক্ষ্যে মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশসমৃদ্ধ রাখাইন রাজ্যও গড়ে তোলেনি। বৌদ্ধপ্রধান মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও দীর্ঘ সামরিক শাসনের কারণে আরাকান তথা রাখাইন অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলমানরা বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্যাতনের শিকলে বন্দি করেন। ১৯৮২ সালের মিয়ানমারের সরকারি আইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উদ্বাস্তু ঘোষণা করে তাদের ভোটাধিকার, ভ্রমণ, বিয়ে ও সন্তান প্রতিপালনের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনীতেও তাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি মুসলমানদের ঐতিহ্য মুছে ফেলার জন্য আরাকানের নতুন নাম দেয়া হয় রাখাইন। অথচ ইতিহাস বলছে, আরাকান (রাখাইন) অনেক বছর আগে থেকেই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য ছিল। সুতরাং আরাকান তথা রাখাইন অঞ্চলে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানরা ঐতিহাসিকভাবেই সেখানকার নাগরিক; তারা অভিবাসী নয়। এ ঐতিহাসিক সত্য মেনে নিয়ে মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গা হত্যা, নির্যাতন ও বিতাড়ন বন্ধ করে তাদের নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার বিষয়ে যতœবান হওয়া।

