আগোরা…………………. ভেজাল ও ক্রেতার ভোক্তা অধিকার হরণ করছে!

1
2670

অপরাধ বিচিত্রা ঃ
সকাল ১০টা। উত্তরা চার নম্বর সেক্টরের চেইন সুপারশপ আগোরা আউটলেটে খুব মনোযোগ দিয়ে একটি নুডুলসের প্যাকেট দেখছিলেন এক নারী ক্রেতা। আগ্রহী হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখটি দেখছি। অনেক সময় আগোরা কর্তৃপক্ষ মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যে নিজেরাই নতুন তারিখ বসায়। এর প্রমাণ আমি পেয়েছি। তবে অভিযোগ করলেও কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেনি। সরেজমিনে ঘণ্টাখানেকের অবস্থানে আউটলেটটিতে বেশ কয়েকজন ক্রেতার মুখেই শোনা গেলো আগোরার বিরুদ্ধে নানা প্রতারণার অভিযোগ। উত্তরার বাসিন্দা শান্তা কোরেশি বলেন, মাছ কিনে বাসায় গিয়ে দেখি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি রাখা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তিনি বলেন, আমরা পণ্যের গায়ে লেখা মূল্য দেখে কিনি। একসঙ্গে অনেক পণ্য কেনায় কোনটার কোন দাম রাখছে সবসময় লক্ষ্য করা হয় না। বাসায় গিয়ে যখন মেলানোর চেষ্টা করি তখন অনকেবারই বেশি মূল্য নেওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। এটা তুল নয়, প্রতারণা। সকালে উত্তরার ব্যস্ততম এ আউটলেটটি ঘুরে দেখা যায়, হিমায়িত মাংস বিক্রির দায়ে ধানমন্ডি আউটলেটকে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও এ শাখাটিতে দিব্যি হিমায়িত মাংস রাখা হয়েছে। তাও টাটকা মাংসের দামেই। এ মূল্য আবার বাজার মূল্যের চেয়েও বেশি। দেখা যায়, কেজি প্রতি ৬শ টাকা মূল্যে দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে। হাড় ছাড়া গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৫শ ৯৫ টাকা দরে। আর এ সবই বাসি। পাশাপাশি টাটকা মাংসও রাখা আছে। আগোরার বিরুদ্ধে পচা মাছ বিক্রির অভিযোগও করলেন ক্রেতারা। উত্তরা চার নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, দেশের অন্যতম পুরনো চেইন শপ আগোরা। তাই বিশ্বাস করতাম এরা অন্তত পচা বাসি পণ্য বিক্রি করবে না। প্রায় প্রতিদিনই তাদের বিজ্ঞাপনও দেখি। তবে নিয়মিত পচা মাছ আর নিম্নমানের সবজি কিনে বুঝছি এতো বিজ্ঞাপন শুধু ক্রেতাদের মন ভোলানোর জন্য। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিত্য বাহারি বিজ্ঞাপন দিয়েও ক্রেতা টানতে পারছে না আগোরা। একসময় এ চেইন শপের নিয়মিত ক্রেতারাও এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে ক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, এক সময়ে কাঁচাবাজারও নিয়মিত আগোরা থেকে করতাম। এখন খুব জরুরি না হলে এখানে খুব বেশি আসা হয় না। পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ তো আছেই। সেই সঙ্গে নির্ধারিত খুচরা মূল্যের উপর নতুন করে মূল্য সাঁটানো থাকে। এছাড়া আগোরার বিরুদ্ধে ভ্যাটমুক্ত পণ্য থেকেও ভ্যাট আদায় করার অভিযোগও তোলেন তিনি। এর আগে প্রসাধনীসহ বিএসটিআইয়ের অননুমোদিত পণ্য রাখার অভিযোগে আগোরার উত্তরা আউটলেটকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে নিম্নমানের পণ্য রাখা কিংবা ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে আগোরা কর্তৃপক্ষ। ভুল বোঝাবুঝির কারণেই ভ্রাম্যমাণ আদালত আগোরাকে জরিমানা করছে বলে দাবি করেন তারা। এ বিষয়ে আলাপকালে প্রতিষ্ঠানটির শাখা ব্যবস্থাপক জানান, নিম্নমানের পণ্য রাখার সুযোগ নেই আগোরাতে। মাংসও দেড়দিনের বেশি রাখা হয় না। তবে পণ্যের গায়ে লেখা মূল্যে অতিরিক্ত আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে এমন ভুল হয়ে যেতে পারে। হয়তো মূল্য পরিবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু গায়ে বসানো হয়নি। তবে এটা সব সময়কার ভুল নয়। এছড়া পণ্যের মানের বিষয়ে জানতে চাইলে শাখার নির্বাহী বলেন, এসব বিষয়ে কথা বলার অনুমতি আমাদের নেই। কোম্পানির সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয় হেড অফিস থেকে। সেখানে যোগাযোগ করতে হবে।

Advertisement

mg-18
পিংক সিটি থেকে বিদায়
হয়েছে আগোরা ‘আপদ’ ঃ
নষ্ট, পচা মাছ-মাংস, ফরমালিনযুক্ত শাক-সবজি ও ফল বিক্রি এবং চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা-সাধারণের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ মাথায় নিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২ থেকে বছর দেড়েক আগেই বিদায় হয়েছে রিটেইল চেইন সুপার শপ আগোরা। গুলশান-২ এর প্রাইম লোকেশনে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শপিং কমপ্লেক্স গুলশান পিংক সিটির বেসমেন্টের যে স্পেসটিতে আগোরা সুপার শপ ছিল সেখানে এখন টপটেন ফেব্রিক্স অ্যান্ড টেইলার্স, ইনফিনিটি ও রিচম্যান’র আউটলেট। পিংক সিটির
বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারী-কর্মকর্তা, মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্য-সামগ্রী সংরক্ষণ, ক্রেতা সাধারণের কাছে বিক্রি, ফরমালিনযুক্ত সবজি ও ফল বিক্রি এবং নষ্ট ও পচা মাছ-মাংস বিক্রির অভিযোগে বেশ কয়েকবার আগোরা সুপার শপকে জরিমানা করা হয়। তাছাড়া সাধারণ ক্রেতারাও মাঝে-মধ্যে আগোরার বিরুদ্ধে পচা মাছ-মাংস পরিবেশনের অভিযোগ তুলতো। এ নিয়ে মার্কেটের পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিঘিœত হতো। ফলে মার্কেট কর্তৃপক্ষ আগোরার সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি বাতিল করে। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঝে মধ্যেই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পণ্যের কম মূল্য জাহির করা হতো। কিন্তু ক্রেতারা কিনতে এলেই দেওয়া হতো জটিল শর্ত। বিজ্ঞাপনে থাকত নাজিরশাইল চাউল প্রতি কেজি ৪৫ টাকা। কিনতে এলে বলা হতো, একসঙ্গে ২০ কেজি নিলে এই সুবিধাটা পাওয়া যাবে। তাছাড়া যৌক্তিক কোনো কারণ থাকলে বিক্রিত মাল ফেরত নেওয়ার ঘোষণা দিলেও গুলশান পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্সের আগোরা কোনো দিনও কাস্টমারের কাছ থেকে বিক্রিত পণ্য ফেরত নিতো না। এ নিয়ে প্রায়ই বিক্রয় প্রতিনিধি ও শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে বাক-বিতন্ডা হতো ক্রেতাদের। কখনো কখনো ইন্ডিয়ান গরু ও পাকিস্তানি মুরগিকে দেশি গরুর মাংস ও দেশি মুরগি বলে চালিয়ে দিতো এ চেইন সুপার শপটি। এভাবে ক্রমাগত ক্রেতা সাধারণের সঙ্গে প্রতারণা অব্যাহত থাকায় এক সময় আগোরা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন গুলশান-বনানীর অভিজাত বাসিন্দারা। শেষের দিকে এসে পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্সের আগোরার আউলেটটি ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়েই এখান থেকে বিদায় নেয় আগোরা। দীর্ঘদিন পিংক সিটি শপিং কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে আসছেন এমন একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগোরা নিয়ে আমরা খুব ঝামেলায় ছিলাম। প্রায় প্রতিদিনই কোনো কোনো ক্যাঁচাল লেগেই থাকতো। বছর দেড়েক আগে আগোরা এখান থেকে চলে গেছে। আমাদের মনে হচ্ছে ‘আপদ’ গেছে, বেঁচেছি। এদিকে বছর দেড়েক আগে পিংক সিটি থেকে আগোরা বিদায় নিলেও প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে এখনো দেখাচ্ছে গুলশান-২ এ তাদের আউটলেট আছে। এ বিষয়টিকেও সাধারণ মানুষকে হয়রানি হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন ‘গুলশানের অভিজাত এলাকায় নিজেদের একাধিক আউটলেট রয়েছে’ এমন বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্যই নিজেদের ওয়েবসাইটে পিংক সিটি আউটলেটি’র অবস্থান ঝুলিয়ে রেখেছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে আগোরার কোনো কর্মকর্তা মিডিয়াতে কথা বলতে রাজি হননি।

mg-19
কর্মী ঠকায় আগোরা,
প্রভাব সেবায় ঃ
শুধু ভোক্তাদের নয়, কর্মীদেরও ঠকিয়ে চলেছে চেইন সুপারশপ আগোরা। টানা ১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করছেন বিক্রয়কর্মীরা। অথচ কারও বেতনই ৮ হাজার টাকার বেশি নয়। চাকরি শুরুর পর বাড়ে না বেতনও। ক্ষোভ প্রকাশ করে কর্মীরা বলছেন, মালিকপক্ষ লাভ করে যাচ্ছেন, তবে তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। তার প্রভাব পড়ছে সেবায়ও। রাজধানীতে আগোরার একটি ব্রাঞ্চের বিক্রয়কর্মী নাছিমা (ছদ্মনাম) জানান, ২০১৩ সালের জুন মাস থেকে তিনি আগোরায় চাকরি করছেন। এখানে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ডিউটি। চাকরির সময় ৬ হাজার টাকা বেতনে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন, এখনো বেতন পাচ্ছেন ৬ হাজার টাকা। নাছিমার স্বামী একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তার আয়ও বেশি নয়। নিজের বৃদ্ধ বাবা-মাকেও সাহায্য করতে হয়। চার বছরের চাকরিতে আয়ের কোনো উন্নতি নেই। নাছিমা বলেন, আগোরায় নিয়োগের সময় বলা হয়েছিল প্রতিবছর বেতন বাড়বে। ভালো কাজের জন্য বোনাসও দেওয়ার কথা। কিন্তু তার কোনোটাই হয়নি। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে জেনেটিক প্লাজা সংলগ্ন আগোরার একজন বিক্রয়কর্মী জানান, গত তিন বছর ধরেই সাড়ে সাত হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন তিনি। অথচ কথায় কথায় দূর্ব্যবহার করা হয় এখানে। প্রতিদিন সকালে এসে পণ্য মোছা থেকে শুরু করে হিসাব এবং ক্রেতাদের প্রতি নজর রাখা, ট্যাগ লাগানো সবই করতে হয়। দুপুরে খাবারের জন্য আধ ঘণ্টাও সময় দেওয়া হয় না। বিকেলেও নেই নাস্তা বা চা পানের সুযোগ। আর রাতে আবার সব হিসাব শেষে মাল গুনে হিসাব বুঝিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত ১০টা বেজে যায়। এই বিক্রয়কর্মী বলেন, চলতি বছরের শুরুতে বেশ কয়েকজন কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়। বলা হয়, কোম্পানি ক্ষতির সম্মুখীন তাই খরচ কমাতে এই ছাঁটাই। এছাড়াও যারা আছি, তাদের বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। প্রতিশ্রুতির কোনোটিই পূরণ করেনি কর্তৃপক্ষ। সীমান্ত স্কয়ার আগোরা ব্রাঞ্চের একজন বিক্রয়কর্মী বলেন, দিন দিন আগোরার মান কমে যাচ্ছে। মোবাইল কোর্ট অভিযান চালালেই নিম্নমানের এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ক্রেতার সংখ্যাও কমছে। অথচ কর্তৃপক্ষ বিক্রি বাড়াতে আমাদের ওপর চাপ দিচ্ছে। ওই বিক্রয় কর্মী আরও বলেন, কাঁচাপণ্য খুবই স্পর্শকাতর। কিন্তু এখানে দেখা যায় প্রায়ই কিছু বাসি পণ্য নিয়ে অভিযোগ তোলেন ক্রেতারা। এর জন্যও আমাদের দোষী করা হয়! এই ব্রাঞ্চের ক্যাশে চাকরিরত একজন কর্মী বলেন, এখানে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ১০ হাজার টাকা বেতনে কেউ নিয়োগ পেলে সেই বেতনেই থাকতে হয়। তার আর বাড়ে না। আবার হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও নেই কোনো সাধুবাদ। এভাবে আর যাই হোক ব্যবসা হয় না। কারণ কর্মীরা সন্তুষ্ট না থাকলে সেবার মান বাড়ে না। তিনি আরও বলেন, এখানে মূল্য নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ। অনেক সময় দেখা যায় তা মানের তুলনায় খোলা বাজারের চেয়ে বেশি। তখন ক্রেতারা আমাদের জিজ্ঞাসা করেন বা পণ্য ফিরিয়ে দিতে চান। আবার কর্তৃপক্ষের চাপ থাকে সেই পণ্য ক্রেতাকে বুঝিয়ে বিক্রি করতে। এটা খুবই কঠিন কাজ। বলা যায় লোক ঠকানো।

mg-27
২০১৪ সালের পণ্যে
সয়লাব আগোরা ঃ
ধানমন্ডির সীমান্ত স্কয়ারের আগোরা। ভেতরে ঢুকতেই সারি সারি পণ্যের
সমাহার। তবে ক্রেতাদের ভিড় নেই আগের মতো। মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রির দায়ে মোবাইল কোর্টের জরিমানার খবরে ক্রেতারা এখন আগোরা বিমুখ। সম্প্রতি আগোরায় বিভিন্ন পণ্য দেখতে দেখতে চোখ চড়ক গাছ! মেরিন্ডার ৪৫০ মিলি বোতল চোখে পড়লো, যার মেয়াদ এ মাসেই শেষ হয়েছে। উৎপাদনের তারিখ দেওয়া হয়েছে ৪ মাস আগের। এভাবে নতুন ও পুরনো পণ্য একসাথে মিশিয়ে রাখা হয়েছে ক্রেতাদের ধোঁকা দিতে। ফুড ফ্লেভার, কসমেটিকসেও দেখা গেছে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের ছড়াছড়ি। আগোরায় রাখা মাছের মূল্যও বেশি রাখা হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন ক্রেতারা। ধানমন্ডির এক ক্রেতা সোবহান বলেন, বাইরের কাঁচাবাজারে টেংরার কেজি সাড়ে চারশ’ টাকা। কিন্তু এখানে সাড়ে পাঁচশ’। কাঁচাবাজারের তুলনায় বেশি মূল্য রাখার কারণেই এখান থেকে এখন মাছ ও মাংস কেনা সম্পূর্ণ বাদ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এর আগে সকালে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে জেনেটিক প্লাজা সংলগ্ন আগোরায় ম্যাক্স, ডু-ইট, এক্স-এর মতো বডি স্প্রে গুলোরও দেখা যায় মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। সবগুলো পণ্যেরই উৎপাদন ও আমদানির সময় ২০১৪ সাল। ভারত থেকে আমদানি করা লরেলের একটি শ্যাম্পুর বোতলে উৎপাদনের মেয়াদ ২০১৪ সাল দেখালেও মেয়াদোর্ত্তীণের কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। একই ব্র্যাঞ্চে থাইল্যান্ডের কিছু কসমেটিকস ও মাউথ ওয়াশও দেখা যায়। বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া এসব মাউথ ওয়াশ উৎপাদিত হয়েছে ২০১৪ সালে। বিক্রি না হলেও রেখে দেওয়া হয়েছে পণ্যগুলো। ট্যাং, ফস্টরের মতো কিছু পণ্য রয়েছে, যেগুলো উৎপাদনের মেয়াদ এক বছর পেরিয়ে পেলেও বিক্রি হয়নি। আবার নতুন পণ্যও আনা হয়নি। এছাড়াও আরও যেসব প্যাকেটজাত খাবার রয়েছে সেগুলোরও মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং অধিক মূল্যের কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা গোণা আগোরার জন্যে নতুন কিছু নয়। দেশব্যাপী তাদের সবগুলো আউটলেটকেই জরিমানা করা হয়েছে এসব অভিযোগে। গত ১০ জুন চট্টগ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে প্রবর্তক মোড়ের আফমি প্লাজার আগোরায় দেখা যায়, কাঁচা মরিচ কেজি প্রতি ৮০ টাকা, বেগুন ৫৫ টাকা, টমেটো ৬৫ টাকা, খোলা চিনি ৬৩ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। অথচ রিয়াজউদ্দিন বাজারে এগুলোর মূল্য অনেক কম। সে সময় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয় আগোরাকে। গত ১১ মে পচা মাছ-মাংস ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য রাখার দায়ে আগোরার শান্তিনগর শাখার ম্যানেজারকে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করে আদালত। গত ১১ মার্চ ফার্মগেটের আগোরায় পরিচালিত অভিযানে দেখা যায় মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুখাদ্য ল্যাকটোজেন-১ ও ২, তরলজাতীয় খাদ্যের মধ্যে লাবাং ও জুস পাওয়া যায়। মেয়াদোত্তীর্ণ আইসক্রিম, প্রসাধনী সামগ্রী, নারকেল তেল, আমদানি করা ফল বা সবজিসহ আরও বেশ কিছু পণ্য পাওয়া যায় একই অভিযানে। প্রতিষ্ঠানটি বাজারের চেয়ে অধিক দামে পণ্য বিক্রি করছে বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়।

mg-17
আগোরা থেকে মুখ ফিরিয়ে
নিচ্ছেন ক্রেতারা ঃ
পচা মাছ, মাংস, সবজি ও ভেজাল পণ্য উৎপাদন, বিক্রয় এবং প্রতারণার জন্য জরিমানা দেওয়া নিয়মিত ঘটনা রিটেইল চেইন শপ আগোরার কাছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতারণা একাধিকার হাতেনাতেও ধরেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। এমন প্রতারণার শিকার হয়ে আগোরা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্রেতারা।
রাজধানীতে আগোরার কয়েকটি আউটলেট ঘুরে তাদের ক্রেতা সংকট দেখা যায়। ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে ক্রেতা সংকটের কারণ হিসেবে এসব প্রতারণার কথা জানা যায়।
১১ আগস্ট মিরপুর-১ নম্বর সনি সিনেমা হলের কাছে আগোরার চেইনশপে গিয়ে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকজন ক্রেতা পচনশীল পণ্য বাদ দিয়ে অন্যান্য পণ্য কিনছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর মাছ ও মাংসের সারিতে গিয়ে দেখা গেলো দু’একজন ক্রেতা। যারা আবার দরকষাকষি করছিলেন সেলসম্যানদের সঙ্গে। সেই কষাকষি একটা সময় বিতর্কেও রূপ নিতে দেখা গেল। বিক্রেতা দাবি করছিলেন, গরুর মাংস টাটকা। কিন্তু ক্রেতা মাংস ধরে দেখে তা নাকচ করে দিচ্ছিলেন। বরং তোপ দাগছিলেন, ফ্রিজিং করে রাখা গরুর মাংস টাটকা থাকার প্রশ্নই আসে না। আর মাছের সারিতে গিয়ে পাওয়া পচা গন্ধই বলে দিচ্ছিল সেখানকার অবস্থা। যে কারণে মাছ, মাংস ও সবজি বিক্রয়ের সারিতে অনেকটা ফাঁকা ছিল। ক্রেতার এমন সংকট থাকলেও পকেট কাটতে এতটুকু পিছপা হচ্ছে না আগোরা। তারা উল্টো সাধারণ কাঁচাবাজারের চেয়ে চড়া দামে বিক্রি করছে পচনশীল সবজি ও অন্যান্য পণ্য। আউটলেটটি ঘুরে দেখা যায়, মাংস বিক্রি করা হচ্ছে প্রতিকেজি ৪৩০ টাকা দরে। সাধারণ বাজারের চেয়ে চড়া দামে ছোট রুই বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৯৫ টাকা, পাঙ্গাস ১৪০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৩০ টাকা। ছোট একটি প্যাকেটে কয়েকটি চিংড়ি দিয়ে দর লিখে দেওয়া হয়েছে ২৪৫ টাকা। এই চিংড়ির প্যাকেট রসে ভিজে পুরো মাছের সারিতে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। মাছের চেয়েও আগোরা বেশি চড়া দাম রাখছিল সবজি বিক্রির ক্ষেত্রে। তারা কেজিপ্রতি বেগুন বিক্রি করছিল ৫০ টাকা দরে, বরবটি ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ টাকা, লাউ ৬০ টাকা এবং কচুর লতি বিক্রি করছিল ৫০ টাকা দরে। আগোরার এসব প্রতারণা ও ক্রেতা ঠকানো নিয়ে সকালেই কথা হয় মিরপুর-১ নম্বরের বাসিন্দা ও চেইন শপটির এক সময়ের ক্রেতা হোসনে আরার সঙ্গে। তিনি বলেন, অনেক সময় জেনে শুনেই পচা পণ্য কিনতে হয়। কী করবো? বাচ্চা মনিপুরী স্কুলে পড়ে। বাচ্চাকে সময় দিতে গিয়ে কাঁচা বাজারে যাওয়া হয় না। তবে আগোরার মাছ ও মাংসের প্রতি আমার কোনো বিশ্বাস নেই। আগোরা থেকে চাল, ডাল, তেল ও কিছু শুকনো পণ্য কিনে ঘরে ফিরছিলেন মিরপুরের ইব্রাহিম খলিল। তিনি পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সেজন্য সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয় ইব্রাহিমকে। ইব্রাহিম বলেন, আগোরা থেকে আমি কোনো সময়ই মাছ, মাংসসহ পচনশীল কোনো পণ্য কিনি না। আমরা জানি, আগোরা পচা মাছ ও মাংস বিক্রি করে। পচা মাছ-মাংস ও বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া পণ্য বিক্রির দায়ে একাধিকবার জরিমানা করা হয় আগোরার এ আউটলেটের। তারপরও ক্রেতা ঠকানো থেমে নেই এখানে। বাজার মনিটরিং টিম পরিচালনার জন্য এখানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর রুটিন মাফিক কাজ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জরিমানার স্বীকারোক্তি দিলেন স্বয়ং আগোরার আউটলেট ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) দিপুই। তিনি বলেন, মাছ, মাংস ও এক্সপাইরিং ডেট না থাকার কারণে ওরা (বাজার মনিটরিং টিম) আমাদের এখানে জরিমানা করেছে। আমাদের কাছে মাছ ও মাংস ভালো মনে হয়েছে। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে ভালো মনে হয়নি। বিএসটিআইয়ের লোগো না থাকার কারণে জরিমানা করা হয়েছে। ওনারা কোনো কথাই শোনেন না, জরিমানা করে চলে যান। এখানে আমাদের কিছু করার থাকে না। তারপরও কেন ভেজাল পণ্য বিক্রি করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আউটলেট ইনচার্জ বলেন, আমরা সচেতন হচ্ছি। যেন ভালো পণ্য সরবরাহ করতে পারি। তবে আমাদের ফল্টের (তূল) কারণে জরিমানা হয়ে থাকে। মাছের কোয়ালিটি অনেক সময় ঠিক থাকে না। পচা মাছ ও মাংস বিক্রির দায়ে আমাদের জরিমানা করা হয়েছে। ওনারা (বাজার মনিটরিং টিম) প্রয়োজনীয় পেপার্স নিয়ে আসেন। আমাদের বিক্রি করা পণ্যের কোডের সঙ্গে মিল থাকে না, যে কারণে আমাদের জরিমানা করা হয়। তবে এতে আমাদের কোনো দোষ থাকে না। কারণ অনেক সময় সাপ্লাইয়াররাই আমাদের কাছে খারাপ পণ্য বিক্রি করে। এই মাশুল আমাদেরই দিতে হয়। জানা যায়, মাছ-মাংস-সবজিতে জালিয়াতির পাশাপাশি আগোরার বিরুদ্ধে ফলে ফরমালিন বা ভেজাল মেশানোর অভিযোগও আছে। ফরমালিনযুক্ত আম বিক্রির দায়ে এই আউটলেটেই কয়েকবার জরিমানা করা হয়। এই আউটলেটে প্রায় পঁচা আম বিক্রি হচ্ছিল ৯০ টাকা কেজি দরে।

mg-14
মানহীন পণ্যে গ্রাহকের
পকেট কাটছে আগোরাঃ
লোভনীয়, প্রয়োজনীয় নানা পণ্যের পসার সাজিয়ে গুলশান অভিজাত এলাকায় ব্যবসা করে গ্রাহকের পকেট কাটছে চেইন শপ আগোরা। অথচ পণ্যের মান নিয়ে গ্রাহকদেরই রয়েছে নানা প্রশ্ন, আপত্তি। কোন পণ্য কবেরকার, তা জানার উপায় না থাকায় গ্রাহকদের রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। এ নিয়ে গুলশানে আগোরার বিক্রয়কর্মীদের কাছ থেকে সদুত্তর না পেলেও এক ছাদের নিচে নিত্যপণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে গ্রাহক। নিত্যপণ্যের মান নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকা আগোরার গুলশান-২ নম্বর সার্কেলের কাছের শাখায় ১১ আগস্ট দুপুরে প্রথমেই ছবি তুলতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। পরে কথা হয় গ্রাহক, বিক্রয়কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। কিন্তু পণ্যের মান নিয়ে আগোরা থেকে মেলেনি অনেক প্রশ্নের উত্তর। পণ্যের মান কেমন- বাজার করতে আসা স্থানীয় এক বাসিন্দার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কীভাবে বুঝবো? বলে তো টাটকা, কিন্তু বোঝার উপায় নেই। তিনি বলেন, এই এলাকার মানুষের সময় কম, সবাই কাজে ব্যস্ত, দেখে-শুনে বাজার করার সময় কই? তাই এক ছাদের নিচে বাধ্য হয়েই কিনতে হচ্ছে নিত্যপণ্য। এই গ্রাহকের কথায় প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে থাকা কর্মীদের কাছে পণ্যের তালিকা চেয়ে পাওয়া যায়নি। প্রবেশপথে থাকা এক নারী কর্মী জানান, এখনও তালিকা আসেনি। কখন পাওয়া যাবে তালিকা, তা জানাতে পারেননি তিনি। আগোরায় পণ্যের মূল্য নিয়েও গ্রাহকরা সবসময় ধোঁয়াশায় থাকেন। অনেক পণ্যের উপর ‘বিগ সেভার’ অফার লেখা থাকলেও এ নিয়ে বিক্রয়কর্মীদের কাছে সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। দেশি মুরগি, গরুর মাংস, ইলিশ মাছে ‘বিগ সেভার’ লেখা থাকলে তার কারণ জানা নিয়ে নিজেরাই ধোঁয়াশায় তারা। ইলিশ মাছে ‘বিগ সেভার’ দিয়ে ৮১ টাকা কমে ৪৬৯ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে একজন বিক্রয়কর্মী বলেন, সাপ্লাইয়ার পাল্টেছে, তাই দাম কমেছে। অথচ একই পণ্যে এই অফার নিয়ে প্রশ্ন গ্রাহকদের। এ প্রসঙ্গে একজন নারী গ্রাহক বলেন, বিক্রি বাড়াতে অফার দিয়েছে। আসলে বাজার মূল্যের থেকে বেশি ধরে ছাড় দিয়ে কৌশলে পকেট কাটছে আগোরা। পণ্যের মানও দর-দামের তফাত নিয়ে আগোরা গুলশান-২ শাখার ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা বদরুল আলম দাবি করেন, নির্দিষ্ট সাপ্লাইয়ারের কাছ থেকে আমাদের পণ্য আসে। তবে দামের হেরফের কেন- জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। অথচ এই কর্মকর্তাই ছবি তুলতে বাধা দেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে পরবর্তীতে ছবি তুলতে দিলেও সঙ্গে ছিলেন সবসময়। বর্তমানে আরএম সেন্টারে ব্যবসা করা আগোরা দেড় বছর আগে গুলশানে পিংক সিটি থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। এ প্রসঙ্গে পিংক সিটির সামনের একজন নিরাপত্তা কর্মী বলেন, লোকসান, শুধুই লোকাসান। বিদায় না নেবে তো কি লোকসান দেবে? একজন গ্রাহক বলেন, সুপার শপ মানেই ভেজাল। দেখার কেউ নেই। ভেজাল ধরে, কিছু দিন আসা বন্ধ থাকে, আবারও আসে। সুপার শপের বিরুদ্ধে পণ্যের মান নিয়ে এর আগে জরিমানা গুনতে হলেও মার্কেট ভবনের পিছনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছিল পণ্য খালাস। পয়ঃনিষ্কাশন নালার উপর কর্মীরা পণ্য খালাস করছিলেন কাচঘরে বিক্রির জন্যই। একজন সাপ্লাইয়ারের সঙ্গে সেখানে পণ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলেননি।mg-15
আগোরার প্রতারণার
ফাঁদে ক্রেতারা ঃ
‘আগোরায় ২৭০ টাকায় ইলিশ বিক্রি হচ্ছে’ -এমন বিজ্ঞাপন দেখে শান্তিনগরের আগোরায় এসেছেন এক প্রবীণা। ৮৫ বছর বয়স্কা মায়ের জন্য ইলিশ কিনতে এসেছেন তিনি। কিনতে গিয়ে ইলিশতো পেয়েছেন কিন্তু তা ২৭০ টাকায় নয় বরং ৪৬৯ টাকায়। মাথায় হাত এই প্রবীণার। সম্প্রতি প্রবীণ এই নারীর সাথে শান্তিনগর শাখায় আগোরার ম্যানেজার আনোয়ারের কথা হচ্ছিল। ক্ষোভ জানিয়ে তিনি ম্যানেজারকে বলেন, ‘’বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন যে ২৭০ টাকায় ইলিশ বিক্রি করছেন। কিন্তু এখানে এসে এই দামের কোনো ইলিশই পেলাম না। ইলিশের দাম শুরুই হচ্ছে  ৪৬৯ টাকায়। এগুলোর কোনো মানে হয়! শধু শুধু মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন আপনারা।’’ এ সময় ম্যানেজার আনোয়ার বলেন, ‘’ম্যাডাম আপনার মোবাইল নাম্বার রেখে যান। ঐ দামের ইলিশ এলে আপনাকে জানানো হবে।’’ প্রবীণা তখন হতাশ হয়ে বললেন, ‘’আপনি না হয় আমাকে কল করবেন। কিন্তু এই জ্যাম ঠেলেতো আমাকে আসতে হবে। যেই জিনিস নেই তার বিজ্ঞাপন কেন দেন!’’ অন্যদিকে পটল কিনতে এসে শান্তিনগরের বাসিন্দা লিজা আহমেদের চোখ ছানাবড়া। পচা পটল সাজিয়ে রেখেছে আগোরা কর্তৃপক্ষ। পচা পটল কেন সাজিয়ে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে আগোরার বিক্রেতা রূঢ়ভাবে বলেন, ‘পটল এমনই!’ লিজা আহমেদ বলেন, ‘মানুষ সুপার শপে এসে বাড়তি দাম দিয়ে জিনিস কেন কিনবে? কেবলমাত্র মান ভালো পাওয়ার জন্য। কিন্তু এখানে এসে দেখি পচা পটল সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। জিজ্ঞেস করতেই তাদের কাছ থেকে ব্যবহার পেলাম তা সত্যি দু:খজনক। শুধু তাই না সামনে গিয়ে দেখুন শুকিয়ে যাওয়া ফুল কপি সাজিয়ে রেখেছে।’’ ২৭০ টাকায় ইলিশ না থাকা, পচা পটল, পচা সবজির কথা স্বীকার করেছেন খোদ আগোরার শান্তিনগর শাখার ম্যানেজার আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘আমাদের ২৭০ টাকায় যে ইলিশ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে তা সাতক্ষীরা থেকে আসার কথা। কিন্তু এখনো তা আসেনি। এলেই বিক্রি শুরু হবে। আর এতো এতো পটল বিক্রি হয় তাতে দু একটি পচা পটল থাকতেই পারে। পেয়াজও এমনই দু একটি নষ্ট। এতো সব জিনিস বিক্রি হয় তার মাঝে দু একটি পণ্য নষ্ট থাকা অস্বাভাবিক কিছু তো নয়।’’ অন্যদিকে বাটা মসলার কৌটায় যে ফাঙ্গাস পড়েছে সেটা দেখিয়ে দিতেই আগোরার লোকদের বক্তব্য: ‘‘স্টক থেকে ভূলে চলে এসেছে।’’ প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া বাইন মাছ আগোরার শান্তিনগর শাখায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ কিনতে গিয়েও বিরক্ত ক্রেতারা। কারণ আধা নষ্ট পেয়াজ রাখা আছে ঝুড়িতে। ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, মানুষ টাকা দিয়ে মানসম্মত পণ্য কিনতে আসে এখানে। এসেই প্রতারণার শিকার হয়। কারণ মাছ নষ্ট, সবজি নষ্ট, চাল ডালের মান না হয় নাই বললাম। মেঝেতে ময়লা। মাছ মাংসের মতো পচনশীল খাদ্যপণ্য যেখানটায় রাখা হয়, ঠিত সামনের মেঝেতেই পাওয়া গেল রক্তের দাগ। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিক্রি হয় মাছ মাংসসহ অন্যসব পচনশীল খাদ্যপণ্য। শুধু মান নিয়েই প্রতারণা থেমে নেই আগোরার। স্বাভাবিক দামের তুলনায় বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছে তারা। ৩০ টাকার পটল আগোরায় বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকা কেজি দরে। ১৪০ টাকার চোষা আম বিক্রি করছে ২০০ টাকা কেজি দরে। নাম না প্রকাশ করার শর্তে আগোরার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘’আমাদের এখানে পণ্যের দ্বিগুণ দামের ট্যাগ লাগানো হয়। তবে এতে কিছু আসে যায় না কর্তৃপক্ষের। এই তো দুই মাস আগে ১০ জুন দামে কারসাজি করার কারণে আমাদের একটি শাখাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল ভ্রাম্যমান আদালত। কিন্তু মালিকপক্ষ কোনো না কোনোভাবে সেটা ম্যানেজ করে। তাই এসবের কোনো প্রভাব পড়ে না।’’ ‘‘মালিকপক্ষ কিভাবে কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করছে?’’ জানতে চাইলে চুপ হয়ে যান আগোরার এই কর্মকর্তা।

mg-24
‘দামের আগাগোড়া ঠিক
নাই আগোরায়’ ঃ
‘সকালে বিজ্ঞাপনে দেখলাম পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতলে ৫০ টাকা ছাড়। কিন্তু আগোরায় এসে দেখলাম ওই সয়াবিনের বোতলের বডি প্রাইস (এমআরপি) ৪৫৫ টাকার স্থলে করা হয়েছে ৪৬৫ টাকা। তার ওপর আবার ছাড় দেওয়া হচ্ছে ৩৫ টাকা। বিক্রয়কর্মী জানান, সফটওয়্যারের বাইরে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। দামের আগাগোড়া ঠিক নাই আগোরায়।’ ১১ আগস্ট দুপুরে প্রবর্তক মোড়ের আফমি প্লাজার বেইজমেন্টে গড়ে তোলা আগোরার আউটলেটে এভাবেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন একজন ক্রেতা। দাম নিয়ে অনেক ধরনের অভিযোগই পাওয়া গেল ক্রেতাদের কাছ থেকে। মেডিকেল কলেজের ছাত্রী পরিচয় দিয়ে আনিকা তাবাসসুম জানালেন, ‘প্রায়ই দেখছি চট্টগ্রামের আগোরায় মাছের দাম ঢাকার আউটলেটের চেয়ে বেশি রাখা হচ্ছে। জানতে চাইলে ম্যানেজার বলেন, ঢাকা থেকেই আসে মিঠা পানির মাছ। তাই পরিবহন খরচ যোগ করে দাম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সমুদ্র তো চট্টগ্রামের কাছে, সামুদ্রিক মাছের দাম দেখলাম ঢাকার মতোই রাখা হচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠান এক দেশে দুই রেটে পণ্য বিক্রি করাটা আইনসিদ্ধ কি?’ আবুল খায়ের একজন সংস্কৃতিকর্মী। বলছেন সকালে বিজ্ঞাপন দেখলাম দেশি প্যাকেট চিনি ৫৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম লালচে বর্ণের দেশি খোলা চিনিই বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৫৯ টাকা। রিফাইন্ড সাদা চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা। এটা কি যৌক্তিক হলো? গরুর মাংসের দাম মাত্রাতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মেহেদিবাগের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, বাজারে হাড় ছাড়া গরুর মাংস বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকা। কিন্তু এখানে ৬৫০ টাকা। কেন? ক্রেতাদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আগোরার ব্যবস্থাপক মোঃ সরওয়ার আজম বলেন, ‘আমরা ষাঁড় গরুর মাংসই বিক্রি করি, তাই দাম বেশি। আপনি চাইলে প্রমাণ দিতে পারবো। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে আমাদের গরু ষাঁড় নয় তবে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেবো। বাজারে যে গরুর মাংস বিক্রি হয় তা আসলে মহিষের।’ মিঠা পানির মাছের দাম ঢাকার আউটলেটগুলোর তুলনায় বেশি নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ি থেকে মিঠাপানির মাছগুলো এখানে আনা হয়। গাড়িভাড়া যোগ করেই দাম নির্ধারণ করা হয়। চট্টগ্রামে সামুদ্রিক মাছের দাম ঢাকা আউটলেটের সমান রাখা হলে বেশি নেওয়া হলো কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একই সাপ্লাইয়ার ঢাকা ও চট্টগ্রামে সামুদ্রিক মাছ দেন। তাই একই দামে বিক্রি হয়।’ নাসিরাবাদ হাউজিংয়ের বাসিন্দা আবদুন নূর বললেন, সময় বাঁচানোর জন্যে সুপারশপ থেকে বাজার করতে আসি। কিন্তু মাছ-মাংসের কাটাকুটিগুলো এমন নোংরা পরিবেশে করা হচ্ছে দেখলে আর আসতে ইচ্ছে করে না। কাটাকুটির সময় হাতে গ্লাভস পরে না আগোরার কর্মীরা। এমনকি মাংস মাপার সময়ও। বিক্রয়কর্মীদের অমনযোগিতার বিষয়টিও এড়ায় না গ্রাহকদের। প্রবাসী জসিম উদ্দিন বললেন, বিদেশের আদলে সুপারশপ হচ্ছে। কিন্তু আগোরায় দেখলাম লুঙ্গি পরা শ্রমিকরা চাল-ডাল এসব ড্রামে প্রদর্শনের জন্যে রাখছে। এতে কি বিদেশিদের কাছে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে না। অনেক নারী-পুরুষ কর্মীকে দেখছি যখন তখন ক্রেতাদের সামনে মসলার প্যাকেটে নতুন রেট বসাচ্ছে। ট্রলিতে করে মালপত্র এনে সেলফে রাখছে, ক্রেতাদের ট্রলি নিয়ে আসা-যাওয়ার অসুবিধার ব্যাপারে বিক্রয়কর্মীরা উদাসীন। মনে হচ্ছে টাইলস করা একটি বাজার। সবার পরনে ইউনিফর্ম (নির্দিষ্ট পোশাক) নেই। বিদেশে আপনি গ্রাহকদের কেনাকাটার সময় পণ্যসামগ্রী নিয়ে বিক্রয়কর্মীদের দৌড়ঝাঁপ কল্পনাই করতে পারবেন না। চকবাজার থেকে আসা একজন ক্রেতা জানান, এখানে আমের অবস্থা দেখুন। রাজ্যের যত পচা, শুকিয়ে যাওয়া আম ডিসপ্লে করা হচ্ছে। এই একটি পণ্য থেকে সব কিছু বিচার করতে পারবেন। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘আগোরার বিরুদ্ধে ক্রেতাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে একেক আউটলেটে একেক দামে পণ্য বিক্রি। বিশেষ করে মাছ-মাংস। এরপর ক্রেতাদের অভিযোগ হচ্ছে প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য যোগ করে পুনরায় ভ্যাট আরোপ করা। এতে ক্রেতারা একই পণ্যে দুইবার ভ্যাট দিচ্ছেন। তা বোধগম্য নয়।’ তিনি বলেন, উন্নত সেবা ও পরিবেশের কথা বলে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে সুপারশপগুলো।  সমস্যা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ভোগ্যপণ্য চেক করার জন্যে পর্যাপ্ত বিক্রয়কর্মী নেই। সাপ্লাইয়ার থেকে পণ্য নেওয়ায় মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সাত-আট হাজার আইটেম থাকে একেকটি আউটলেটে। নিম্নমানের লোকাল পণ্যও রাখা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে অনেক বিদেশি পণ্যের পাশাপাশি দেশি পণ্যেরও মেয়াদ চলে যাচ্ছে। যা ক্রেতাদের হাতে প্রতিনিয়তই পড়ছে। আমাদের কাছে অভিযোগ করে। এসএম নাজের হোসাইন বলেন, কাঁচামরিচ, বেগুন ও চিনির মূল্য নিয়ে কারসাজি করায় গেল রমজানে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে চট্টগ্রামের আগোরাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here