অ্যাজমা চিকিৎসা জগতে একটি গুরুতর সমস্যা। সারা বিশ্বে অ্যাজমা রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে অ্যাজমা প্রতিরোধে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন চিকিৎসাবিজ্ঞান সংস্থা। আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালিত হয়ে আসছে। প্রথম স্পেনের বার্সেলোনায় ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিদের এক সম্মেলনে বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমা নামক একটি সংস্থা বিশ্ব অ্যাজমা দিবসের সংগঠক। বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়। প্রতি বছরই দিবসটি উদযাপিত হয় নানা প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে। লিখেছেন অধ্যাপক ডা. জি এম ফারুক
হাঁপানির পরিচয়
হাঁপানি রোগটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। হাঁপানি বলতে আমরা বুঝি, শ্বাসপথে বায়ু চলাচলে বাধা সৃষ্টির জন্য শ্বাসকষ্ট। হাঁপানির প্রধান তিনটি লক্ষণ হলো- প্রথমে কাশি, বুকে সাঁইসাঁই শব্দ এবং শ্বাসকষ্ট। এগুলোর মধ্যে সাঁইসাঁই শব্দই হলো হাঁপানি চেনার প্রধান উপায়। প্রদাহজনিত কারণে শ্বাসনালীর পথে বাধার সৃষ্টি হয় এবং এ বাধাপ্রাপ্ত সরু নলের মধ্য দিয়ে বায়ু চলাচলের ফলে সাঁইসাঁই শব্দ হয়। হাঁপানি রোগীরা আর পাঁচজনের মতো চলাফেরা এবং কাজকর্ম করতে পারেন। কিন্তু আক্রমণের সময় কাশি, সাঁইসাঁই শব্দ ও শ্বাসকষ্ট হয়। হাঁপানির এ লক্ষণগুলো সাধারণত ভোররাতে সবচেয়ে বেশি হয়। বলা যায়, ৯০ শতাংশ হাঁপানি রোগী রাত ৩টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে শ্বাসকষ্টের শিকার হন। সকালেও কিছুক্ষণ হাঁপানির উপসর্গ থাকে এবং বেলা বাড়ার সাথে সাথে আস্তে আস্তে কমে আসে। রাতে হাঁপানি বাড়ার কারণ হলো- রাতে রক্তে কর্টিজোন এবং অ্যাড্রিনালিনের মাত্রা কমে যায়। প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। তাছাড়া শোয়ার ঘরে অ্যালার্জেনের মাত্রাও রাতে হাঁপানির কারণ।
বেশির ভাগ হাঁপানি রোগীর শ্বাসকষ্ট হঠাৎ আরম্ভ হয়, সাথে সাথে শুকনো কাশি এবং সাঁইসাঁই শব্দ। অল্প পরে শ্বাস কষ্ট আরো বেড়ে যায় এবং বুকের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয়। প্রশ্বাসের সময় শ্বাসনালীর ব্যাস আরো সরু হয়ে যায় এবং সেই সরু নালীর মধ্যে বাতাস চলাচলের সময় বাঁশির মতো সাঁইসাঁই আওয়াজ শোনা যায়। এ ধরনের শ্বাসকষ্ট সাধারণত হয় রাতে এবং তখন রোগী উঠে বসে থাকে। তা ছাড়া আগেই বলা হয়েছে, বেশির ভাগ রোগীর শ্বাসকষ্ট শেষ রাতে বাড়তে দেখা যায়।
মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, হাঁপানির একমাত্র কারণ অ্যালার্জি। যদিও অ্যালার্জি হাঁপানির একটি প্রধান কারণ। কিন্তু অ্যালার্জি ছাড়াও অনেক কারণই হাঁপানির জন্য দায়ী। যে উদ্দীপক কারণ হাঁপানির জন্য দায়ী সেগুলোকে বলা হয় ট্রিগার ফ্যাক্টর।
হাঁপানির কারণ
ক) ভাসমান অ্যালার্জেন : ঘরের ধুলো, ঘরের ধুলোর পোকা, পরাগ রেণু, পোষা প্রাণীর পশম, ছত্রাকের স্পোর, আরশোলার অ্যালার্জেন, ত্বকের মামড়ি ইত্যাদি।
খ) জ্বালাকারক বা উত্তেজক ধোয়া, যেমন বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, বাতাসে ভেসে বেড়ানো বিভিন্ন গ্যাস, মশা মারার ধুপ, সুগন্ধি সাবান, সেন্ট, পাউডার ডিওডোরেন্ট ইত্যাদি।
গ) জীবাণু সংক্রমণ। শ্বাসনালীর সংক্রমণ যেমনÑ রাইনো ভাইরাস, কোরোনা ভাইরাস, এডিনোভাইরাস, ইত্যাদির মাধ্যমে নাক, গলা ও বুকের সংক্রমণ।
গ) ব্যায়াম বা অতিপরিশ্রম কিংবা খেলাধুলা।
ঘ) মানসিক : মানসিক টেনশন, অবসাদ, আবেগ, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, হতাশা ও ভয়।
ঙ) ছত্রাক : ফ্রিজের গ্যাসকিট, চামড়ার জুতো, স্যাঁতসেঁতে জায়গায়, বাড়ির আশপাশে ছত্রাক জন্মে। এই ছত্রাকের স্পোর থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে।
চ) মাইট : ‘মাইট’ জাতীয় জীবাণু থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। এই জীবাণু বিছানা, তোষক, তোয়ালে ও ঘরের ধুলোবালিতে মিশে থাকে।
ছ) খাবার : ডিম, দুধ, চিংড়ি, ইলিশ, বোয়াল, গরুর গোশত ইত্যাদিতেও অ্যালার্জি হতে পারে। এ ছাড়া খাবারে যেসব রঙ মেশানো হয় তাতেও অ্যালার্জি হতে পারে।
জ) ওষুধের প্রতিক্রিয়া : কিছু কিছু ওষুধের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। যেমনÑ পেনিসিলিন, সালফার জাতীয় ওষুধ, কুইনিন, বিটাব্লকার, অ্যাসপিরিন, নোভালজিন প্রভৃতি ব্যথানাশক ওষুধ।
হাঁপানি প্রতিরোধ
অ্যালার্জিকারক বস্তু এড়িয়ে চলা। যেমন- ধুলোবালি, ঘরের ঝুল, ধোঁয়া, ঝাঁঝালো গন্ধ ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা।
ঘরবাড়িকে ধুলাবালিমুক্ত রাখার চেষ্টা করা। এ জন্য দৈনিক অন্তত একবার ঘরের মেঝে আসবাবপত্র ভেজা কাপড় দিয়ে মুছতে হবে
কিংবা ভ্যাকিউম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
ঘরে কার্পেট না রাখা
বালিশ, তোষক, ম্যাট্রেসে তুলা ব্যবহার না করে স্পঞ্জ ব্যবহার করা।
মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তাকে ইতিবাচক মনে মোকাবেলা করা কিংবা মানসিক উত্তেজনা এড়িয়ে চলা।
পরিশ্রম বা খেলাধুলায় শ্বাসকষ্ট বাড়লে চেষ্টা করতে হবে পরিশ্রমের কাজ পরিহার করা।
পেশাগত কারণে অ্যাজমার কষ্ট বাড়লে চেষ্টা করতে হবে স্থান বা পেশার পরিবর্তন করা।
ধূমপান না করা।
যে সব খাবারে অ্যালার্জি সৃষ্টি করে তা পরিহার করা। বিশেষভাবে রঙ দেয়া খাবার পানীয় পরিহার করা।
ফ্রিজের খাবার, ঠাণ্ডা খাবার, আইসক্রিম ইত্যাদি না খাওয়া।
সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করা। ইতিবাচক মন হাঁপানির কষ্ট কমাতে পারে।
হাঁপানি রোগীর কিছু নিয়ম
• সাধারণ পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহণ করা।
• রাতের খাবার পেটভরে খাবেন না। ঘুমানোর দুই ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খাবেন।
• লাল, হলুদ ফল, শাকসবজি নিয়মিত খাবেন। কারণ এতে প্রচুর বিটাক্যারোটিন থাকে, যা ফুসফুসকে শক্তিশালী করে।
• ভিটামিন সি ও ই-সমৃদ্ধ খাবার ফুসফুসকে শক্তিশালী করে। এ জন্য সবুজ শাকসবজি প্রচুর খেতে হবে। একস্ট্রা ভারজিন অলিভ অয়েল নিয়মিত খেলে ভালো উপকার পাওয়া যাবে। নিয়মিত আপেল খেলেও ফুসফুস শক্তিশালী হবে।
• শ্বাসকষ্টের সময় প্রচুর পানি পান করুন। যাতে আপনার কাশি তরল হতে পারে।
বেশি রাত জাগবেন না। নির্দিষ্ট নিয়মে মাঝরাতের আগে ঘুমাতে যাবেন এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে।
• নিয়মিত ব্যায়াম করুন। অথবা সকালে হাঁটুন। সাঁতার কার্টুন।
• মানসিক চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।
• রাতে মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করুন।
• অতিরিক্ত মসলা, ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত খাবার কিংবা এসিডজাতীয় খাবার, যা শ্বাসকষ্ট বাড়াতে পারে তা পরিহার করা।
• গরুর দুধ, বিশেষভাবে শিশুদের গরুর দুধ না খাওয়ানো ভালো।
• হাঁপানি অনেকাংশে বংশগত রোগ। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে দেখা দরকার ছেলে-মেয়ের উভয় পরিবারেই হাঁপানি আছে কি না। উভয় পরিবারেই হাঁপানি থাকলে ছেলে-মেয়েদের হাঁপানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এমন বিয়ে এড়িয়ে চলা ভালো।
চিকিৎসা কোথায় করাবেন
সব চিকিৎসাপদ্ধতিতেই অ্যাজমা রোগীর চিকিৎসা বিদ্যমান। অ্যালোপ্যাথিতে নিয়মিত জীবনব্যাপী চিকিৎসার ব্যবস্থা। ইউনানি, হারবাল, আয়ুর্বেদিতেও এর চিকিৎসা রয়েছে। তবে তুলনামূলক আরোগ্যকর চিকিৎসা রয়েছে হোমিওপ্যাথিতে। সমস্যা হচ্ছে, অ্যাজমা রোগীরা নানাভাবে চিকিৎসার নামে প্রতারিত হচ্ছেন। গ্যারান্টি, চুক্তি, নিশ্চয়তাসহ নানাভাবে রোগীকে প্রতারিত করা হচ্ছে। তাই এ ধরনের প্রতারকদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। প্রশিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ চিকিৎসকের চিকিৎসা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়।
লেখক : মহাসচিব, ইন্টিগ্রেটেড অ্যাজমা সোসাইটি। মোবাইল : ০১৭১২৮১৭১৪৪

