অধীর অপেক্ষার রায় আজ

0
1174

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর পুলিশ বাদী হয়ে যে মামলা করেছিল তার এজাহারই ছিল সাদামাটা। হামলার জন্য কারো প্রতি কোনো সন্দেহেরই উল্লেখ ছিল না এজাহারে।

Advertisement

অথচ ওই হামলার আগেও কয়েকবার শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করেছিল জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম বাংলাদেশ (হুজিবি)। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই মামলাটি করা হয়েছিল। পরে চেষ্টা করা হয় তদন্তও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার। যদিও সরকার বদল হওয়ার পর তদন্তের মাধ্যমে রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষ করা হয়েছে মামলার বিচার কার্যক্রমও। রায় ঘোষণা করা হবে আজ বুধবার। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুটি মামলার রায় ঘোষণা করবেন ঢাকার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল ১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন। রাজধানীর নাজিমুদ্দীন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত আদালতে রায় ঘোষণা করা হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আড়াল করতে কিভাবে মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল তার অনেক বিষয় গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই। মামলার আলামত নষ্ট করা থেকে শুরু করে দুর্বল এজাহার দাখিল, জজ মিয়া নাটক সাজানোসহ নানা উপায়ে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে তদন্ত ও বিচার কঠিন করে তোলা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ঘটনার মূল হোতা চিহ্নিত করে হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে পেরেছে রাষ্ট্র। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুটি মামলায় আসামি ছিল ৫২ জন। তাঁদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, হুজিবি নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে এ দুটি মামলার বিচার চলছে না। এখন আসামির সংখ্যা ৪৯। ২১ আগস্টের ঘটনায় কয়েক স্তরে অপরাধ সংঘটিত হয় বলে মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এসবের মধ্যে হত্যার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, গ্রেনেড সরবরাহ, গ্রেনেড হামলা, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা, গুরুতর জখম করা, হত্যার চেষ্টা করা, গ্রেনেড সংরক্ষণ করা, গ্রেনেড সরবরাহকারী অপরাধীকে পালাতে সহযোগিতা করা, আলামত নষ্ট করা, ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা উল্লেখযোগ্য অপরাধ। বর্তমানে থাকা ৪৯ জন আসামির মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আর হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে ৪৯ জনের বিরুদ্ধে। তাঁরা হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক এমপি শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, ঢাকার ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ, এনএসআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই ও হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, পাকিস্তানের নাগরিক ও কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গি নেতা ইউসুফ ভাট ওরফে আবদুল মাজেদ ভাট, কাশ্মীরি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, হুজি নেতা মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর হুমায়রা, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে হান্নান সাব্বির, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ওরফে রাতুল (পিন্টুর ভাই), মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি (মুফতি হান্নানের ভাই), মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের (তাজউদ্দিনের ভায়রা, অর্থাৎ পিন্টুর আত্মীয়), শাহাদৎ উল্লাহ জুয়েল, হুসাইন আহম্মেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুসালিন ওরফে মুরসালিন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মো. ইকবাল, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার ও মো. খলিল। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, হত্যার পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, গুরুতর জখম ইত্যাদি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রত্যক্ষ হত্যার অভিযোগ রয়েছে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে। ষড়যন্ত্রের অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে : অন্যদিকে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, হারিছ চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে অপরাধজনক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের ষড়যন্ত্রের ফলেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের বিরুদ্ধে মুফতি হান্নানকে তারেক রহমানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আরিফুল ইসলাম আরিফ ও মোহাম্মদ হানিফের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র ও হামলাকারীদের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার অভিযোগ : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক খোদাবক্স চৌধুরী, সিআইডির তখনকার বিশেষ সুপার রুহুল আমিন, সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদের বিরুদ্ধে মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। জজ মিয়া নাটক সাজানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তার অভিযোগ : সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হকের বিরুদ্ধে হত্যাকারীদের আর্থিক সহযোগিতা ও প্রশাসনিক সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিএমপির তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি-পূর্ব) ওবায়দুর রহমান ও ডিসি দক্ষিণখান সাঈদ হাসানের বিরুদ্ধে মামলার আলামত নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া হামলাকারীদের প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম ডিউক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিনের বিরুদ্ধে হামলার গ্রেনেড সরবরাহকারী মওলানা তাজউদ্দিনেকে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল  বলেন, মামলার তদন্ত যেমন কঠিন ছিল, তেমনি এই মামলার বিচারও কঠিন ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আন্তরিকতা ও তদন্ত কর্মকর্তাদের আন্তরিকতায় শেষ পর্যন্ত বিচার সম্ভব হয়েছে। এমন একটি নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করতে না পারলে এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ঋণী থাকতে হতো রাষ্ট্রকে। মামলার এই বিশেষ পিপি বলেন, ‘মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা ছিল। আসামিদের বাঁচাতে মামলার আলামত নষ্ট করা হয়েছে। হামলাকারীদের প্রত্যক্ষ মদদদাতাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। রাজনৈতিকভাবে সরকারে প্রশাসন যন্ত্রকে ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়েছে। এই কঠিন অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে রাষ্ট্রকে। সুতরাং এই মামলার বিচার সহজ ছিল না।’ কাজল আরো বলেন, ‘মামলার বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহই মনে করিয়ে দেয়, এই নারকীয়, পৈশাচিক ও বর্বর হামলার বিচারে কত বাধা ছিল। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডটি কয়েক স্তরের ষড়যন্ত্রের ফল। দফায় দফায় রাজনৈতিক কিছু নেতা, জঙ্গি, সেনা কর্মকর্তা সভা করে ষড়যন্ত্র সফল করে। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছিল।’ জোট সরকারের সময় জজ মিয়া নাটকে আটকে ছিল মামলা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরদিন মতিঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন ওই থানার এসআই শহীদ ফারুক আহমেদ। মামলায় হত্যার অভিযোগসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারাও সংযুক্ত করা হয়েছিল। প্রথমে তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এসআই আমির হোসেন। পরে মামলাটি ডিবিতে গেলে তদন্তের ভার পড়ে এসআই শামসুল ইসলামের ওপর। পরে মামলা সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। সিআইডির তৎকালীন এএসপি আব্দুর রশিদ ও মুন্সী আতিকুর রহমান তদন্ত করেন। তদারকি কর্মকর্তা ছিলেন সিআইডির এসএস রুহুল আমিন। তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা কৌশল নেন তাঁরা। জজ মিয়া নামের এক নিরীহ যুবককে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করেন সিআইডির ওই তিন কর্মকর্তা। ওই স্বীকারোক্তিতে কিছু সন্ত্রাসীকে জড়ানো হয়। চেষ্টা করা হয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীকে জড়ানোর। এরপর ব্যাপক সমালোচনা হলে অন্ধকারে চলে যায় মামলার তদন্তকাজ। ওই সময়েই অভিযোগ উঠেছিল, তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ইন্ধনে ওই তিন কর্মকর্তা মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন। তা ছাড়া হাওয়া ভবনের কর্ণধারদের ইন্ধন ছিল ব্যাপক। একসময় চুপ হয়ে যায় সিআইডি। তদন্ত আর এগোয় না। জোট সরকারের পুরো সময়ই ২১ আগস্টের ঘটনাটি জজ মিয়া নাটকে আটকে থাকে। তবে এক-এগারোর ঘটনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তদন্ত জোরদার হয়। ২০০৭ সালের ২২ আগস্ট এই মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় এএসপি ফজলুল কবীরকে। পাশাপাশি র‌্যাবও ছায়া তদন্ত করে। ৯ আসামিকে গ্রেপ্তার করার পর তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন, প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে জঙ্গিরা ওই হামলা চালিয়েছিল। পরে বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেন তিনি ২০০৮ সালের ৯ জুন।কিন্তু ওই তদন্তে গ্রেনেডের উৎস এবং গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার পেছনে কারা জড়িত তা উদ্ঘাটন না করেই তড়িঘড়ি করে চার্জশিট দেওয়া হয়। সে কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবার তদন্ত হয়। ২০০৯ সালে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর বিচার শুরু হতে কেটে যায় আরো আট মাস। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুটি মামলায় অধিকতর তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করে সিআইডি। উভয় মামলায় তারেক রহমান, লুত্ফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ পুলিশ কর্মকর্তা এবং মুফতি হান্নানসহ তাঁর অনুসারী জঙ্গিরাও আছে। নতুন তদন্তে প্রকাশ পায়, হাওয়া ভবনে বসেই বিএনপির রাজনীতিকরা ওই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। এদিকে নতুন করে ৩০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করায় এ মামলার আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তর হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৯ মার্চ আবার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে সাক্ষ্য নেওয়া হয় ২২৫ জনের। গত বছরের ১১ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এই মামলার বিচারেও দেখা দেয় নানা জটিলতা। এই মামলায় গ্রেপ্তার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে অসংখ্য মামলা ছিল। এসব মামলায় এক জেলা থেকে আরেক জেলায় নেওয়া হতো তাদের। এ কারণে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বারবার তারিখ পড়েছে। পরে অবশ্য সারা দেশের আদালতের সঙ্গে সমন্বয় করে এই মামলার তারিখ নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান এবং পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া আসামিপক্ষ থেকে বারবার সময় চাওয়া, ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে বিভিন্ন আবেদন করায় বিচারও বারবার পিছিয়ে যায়। প্রত্যেক আসামির পক্ষে সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ দেওয়ায়ও বিচার বিলম্বিত হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি সমাপ্ত ঘোষণার পর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলায় জামিনে থাকা আট আসামির জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আজ রায় উপলক্ষে কারাগারে থাকা সব আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে। এরই মধ্যে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৩ অক্টোবর এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। টানা ১১৯ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক শুনানি হয়। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষে ২২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আসামিদের মধ্যে লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, মহিবুল্লাহ ওরফে অভি, আরিফ হাসান ওরফে সুমনসহ ৩১ জন কারাগারে। তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাইদ হাসান, সাবেক পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান, মুফতি শফিকুর রহমানসহ ১৮ জন পলাতক। ২১ আগস্টের ওই গ্রেনেড হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আওয়ামী লীগের তখনকার মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। কয়েক বছর ধুঁকে পরে তিনি মারা যান। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হলেও দলের উপস্থিত নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে কোনোমতে তাঁকে রক্ষা করেন। ফলে অনেক নেতাকর্মী আহত হন।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here