রাষ্ট্রীয় ১২৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ
রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) থেকে প্রায় ১২৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লাপাত্তা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিলফুল ফুজুল সমাজকল্যাণ সংস্থার দুর্নীতি ধামাচাপার মিশনে নেমেছেন সংঘবদ্ধচক্র। ফলে টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হিলফুল ফুজুলের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম রাষ্ট্রের ১২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে গাঢাকা দিয়েছেন। সৌরবিদ্যুতের প্রসারে ইডকল এই বিপুল অংকের ঋণ দিয়েছিল। বারবার বৈঠক করেও পাওনা অর্থ আদায়ে ব্যর্থ ইডকল অভিযোগ করার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উপ-পরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম এক পত্রে রফিকুল ইসলাম, তার স্ত্রী খাদিজা ইসলাম নাজমা, ছেলে যুবায়ের ইসলাম এবং মেয়ে জুয়াইরিয়া ইসলামের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানোর পর পিলেচমকানো অনিয়ম বেরিয়ে এসেছে। এ থেকে রক্ষায় উঠে পড়ে লেগেছেন ধুরন্ধর রফিকুল ইসলামের বিভিন্ন জালিয়াতির সহযোগী আবুতালেব, কো-অর্ডিনেটর ফিরোজ আহমেদ এবং হিসাব রক্ষক আমজাদ হোসেন।
জানা গেছে, হিলফুল ফুজুল সমাজকল্যাণ সংস্থা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমআরএর লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। এনজিও ব্যুরো ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটির। ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করার কাজও করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ইডকলের অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ করে আসছে। ইডকলের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন ইউনিট সূত্র জানিয়েছে,২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যথাযথভাবেই লেনদেন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ইডকল ১৩৩ কোটি টাকা ঋণ দেয় হিলফুল ফুজুলকে। এতে প্রতি তিন মাসে আট কোটি ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে হিলফুল। কিন্তু এরপরই ধীরে ধীরে নানা অজুহাতে অর্থ ফেরত দেওয়া বন্ধ রেখেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই কোটি আট লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। সর্বশেষ হিসাবে হিলফুল ফুজুলের কাছে ইডকলের পাওয়া দাঁড়িয়েছে ১২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে আসল ১০৭ কোটি ৮২ লাখ, বাকিটা সুদ। হিলফুলফুজুল ইডকলকে বলেছে, সৌর বিদ্যুতের গ্রাহকদের নিকট থেকে ঋণ আদায় করতে না পারায় তারা ইডকলের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না। এদিকে ইডকলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে ইডকল ৫৬টি প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করেছে। বাকি ৫৫ টি প্রতিষ্ঠান সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করছে। হিলফুল ফুজুল উদ্দেশ্যমুলকভাবে টাকা পরিশোধ করছেনা। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছর তাদের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন দিচ্ছেনা চুক্তির শর্তানুযায়ী। এ নিয়ে অভিযোগ করা হলে তারা ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু তাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ছিল না। ইডকলের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও প্রতিবেদন পরীক্ষা করতে দেয়নি। এতে হিলফুল ফুজুলের প্রতি সন্দেহ তীব্র হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে ইডকলের নিজস্ব অনুসন্ধান চালায়। এতে দেখা যায়, হিলফুল ফুজুল গ্রাহকদের থেকে অর্থ তুলে নিয়ে তা অন্য খাতে বিনিয়োগ করেছে; কিছু অর্থ পাচার করেছে। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর বসিলাতে রফিকুল ইসলাম নয়তলা বাড়ি করেছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে এম-ব্লকে প্লট কিনেছেন। নামে-বেনামে কিছু অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বিভিন্ন খাতে।
দুদকে দাখিলকৃত ইডকলের অভিযোগে বলা হয়েছে, রফিকুল ইসলাম দুর্নীতির মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন। এই অর্থ দিয়ে তিনি নিজের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ওই সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিপুল অর্র্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আর-ওয়ান সোলার, শ্যামলীর আর-ওয়ান ইলেকট্রনিক্স, কামরাঙ্গীরচরে ফুজুল প্রডাক্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, শিকড় হাউজিং লিমিটেড, রিছওয়ে ফ্যাশনস লিমিটেড, সেতু রোজ টেকনোলজি লিমিটেড সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, জি কেবল ফ্যাক্টরি ও আডিয়েল ক্যারিয়ার সোসাইটি গড়ে তুলেছেন। এ সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও এমডি তিনি নিজেই।
ধুরন্ধর ও মামলাবাজ রফিকুল ইসলামের আরো প্রতারণার তথ্য বেরিয়ে পড়েছে।তার প্রতিষ্ঠানে চাকরী দেয়ার আড়ালে চেক জালিয়াতির ফাঁদে তাদের আটকে দেয়া হয়। তিনি এ সময় সিকিউরিটির নামে ব্ল্যাঙ্ক চেক জমা নেন যোগদানের সময়ে। তার অপকর্মে সহায়তা বা শর্ত পুরনে আপত্তি জানালেই ইচ্ছেমতো টাকার পরিমান রিখে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। টাকা দিতে আপত্তি জানালে মামলায় ফাঁসিয়ে দেন। এ ধরনের প্রতারণা তার ব্যবসায়িক কৌশল। তিনি শত শত মামলার বিবাদী।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দুদক অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নিলেই চতুর রফিকুল ইসলাম তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে অনুগত কর্মচারিদের কাছে রেখেছেন। এর মধ্যে অন্যতম বিশ্বস্ত আবুতালেব। হিসাব রক্ষক আমজাদ হোসেন রফিকুল ইসরামের জালিয়াতির গোপন সাম্রাজ্য সম্পর্কে অবগত বলেই চাকরীচ্যুতির পর পুনর্বহাল করা হয়েছে চাতুরতার সঙ্গে। সব অপকর্ম এবং অবৈধ অর্থের উৎস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল প্রতিষ।ঠানের কো-অর্ডিনেটর ফিরোজ আলম বিভিন্ন মামলা থেকে রক্ষায় তদ্বিরে নেমেছেন। দক্ষিাণ্চলের একজন ধর্মীয়ব্যক্তিত্ব তাদের সহায়তা করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, হিলফুল ফুজুল সমাজকল্যাণ সংস্থা রাজধানীর মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের ৫/১২ হোল্ডিং নম্বরে অবস্থিত প্রধান কার্যালয়টি বন্ধ করে দিয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে ওই কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে হিলফুল ফুজুলের কার্যালয় নেই। কিছু লোক ওই কার্যালয় থেকে পুরনো মালপত্র বের করে নিয়ে যাচ্ছে। ওই বাড়ির কেয়ারটেকার মোহাম্মদ আলম সমকালকে বলেন, এখানে আর অফিস নেই। হিলফুল ফুজুল চলে গেছে। তাদের মালপত্র নিয়ে গেছে। কিছু ভাঙাড়ি মালপত্র ছিল। সেগুলোও বিক্রি করে দিয়ে গেছে।
অন্যদিকে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলামের মোহাম্মদপুরের বাবর রোড ও ধানম-ি পুরাতন ২৭ নম্বরের বাসার ঠিকানায় গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ওইসব বাসার কেয়ারটেকাররা জানিয়েছেন, রফিকুল ইসলাম নামের কেউ সেখানে থাকেন না। রফিকুল ইসলাম সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে যেসব ফোন ও মোবাইল নম্বর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন সেগুলোও বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মনিটরিং বিভাগের প্রধান ফিরোজ আহমেদ মোবাইল ফোনে সমকালকে জানান, ‘রফিকুল ইসলাম কোথায় আছেন তিনি তা জানেন না। তিনি দাবি করেন, ইডকলের বিষয়টি সালিশির মাধ্যমে সমাধানের নির্দেশনা আছে আদালত থেকে। এ জন্য আদালত আরবিট্রেটর নিয়োগ দিয়েছেন।’
ইডকলের এক কর্মকর্তা জানান, হিলফুল ফুজুল মিথ্যা কথা বলেছে। পাওনা টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে ইডকল দুদকের আশ্রয় নিয়েছে। হিলফুল ফুজুল একতরফাভাবে আদালতে আরবিট্রেশনের আবেদন করলেও তা গৃহীত হয়নি। কোনো আরবিট্রেটর নিয়োগ দেয়নি। একতরফাভাবে সালিশি আদালতে আরবিট্রেশনের মামলার বিধান নেই।
#
