স্টাফ রিপোর্টারঃ
রাজধানীর উত্তরখান থানা সংলগ্ন এলাকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই ওসির কক্ষে সালিশ বসে। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। আর এসব সালিশ বৈঠকের সবই জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে। এলাকায় জনপ্রতিনিধি থাকলেও জমিসংক্রান্ত বিরোধের অধিকাংশই নিষ্পত্তি হয় ওসির মধ্যস্থতায়, তবে এ জন্য স্থানীয় জমি মালিকদের গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। ভাগবাটোয়ারা করে নেন ওসি সিরাজুল হক ও তার চক্রের সদস্যরা। কয়েকদিন ধরে চলা অনুসন্ধানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসে। সালিশ বৈঠকের নামে ওসি সিরাজুল হক এবং তার চক্রের সদস্যরা মাসে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ছাড়াও প্রায় ১৫টি মাদক স্পট এবং ইঞ্জিনচালিত অবৈধ অটোরিকশা থেকে লাখ লাখ টাকা মাসোয়ার আদায় করছে। এসব অপকর্ম নিয়ে কেউ মুখ খুলতে না পারে কারন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতা ছাড়াও জামায়াত-শিবিরের নেতাদেরও হাতে রাখছেন ওসি সিরাজুল হক। এমনকি তারই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জামায়াতের উত্তরখান থানার আমীর আলমগীর মোহাম্মদ ইউসুফ এলাকায় বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানি গড়ে তুলেছেন, প্রতিষ্ঠান থেকেও মাসে সিরাজুল হকের নামে মোটা অঙ্কের টাকা আসে। ওসি সিরাজুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি চক্র নানা ছল-ছুতোয় স্থানীয় জমি মালিকদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে, চক্রটির মূল হোতা হাজী শামীম আহসান, জালাল ও জাকির। স্থানীয়দের কাছে এরা সবাই ভূমিদস্যু নামে পরিচিত। এদের কাজই হল উত্তরখান এলাকায় নিজ জমিতে কেউ বাড়ি করতে গেলেই নানা অজুহাতে বিরোধ সৃষ্টি করা, বিরোধ মীমাংসার নামে চক্রটি ওসির শরণাপন্ন হয়। আর এ সুযোগটিই লুফে নেন ওসি সিরাজুল। মীমাংসার নামে দিনের পর দিন ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত জমির মালিককে ধার্য করে দেন মোটা ঘুষের টাকা, ওসির কথা না শুনলে চক্রের সদস্যদের দিয়ে পরে দেওয়ানি মামলা করিয়ে হয়রানি করা হয়। মামলা দায়েরের পর নিয়মানুযায়ী আদালত থানা পুলিশকে প্রাথমিক তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। সে সময় হয়রানি করার পুরো সুযোগটি নেন ওসি সিরাজুল। ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩৫/২০১৭ নম্বরের পিটিশন মামলার অনুসন্ধান করতে গিয়ে এর সত্যতাও পাওয়া যায়। হাজী শামীম আহসান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় মামলাটি করেন। ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ওই মামলার তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উত্তরখান থানার ওসিকে নির্দেশ দেন, সুযোগটি নেন ওসি সিরাজুল হক। চাহিদামতো ঘুষের টাকা না পেয়ে ওসির নির্দেশে তদন্তকারী কর্তকর্তা এএসআই মোঃ মোশাররফ হোসেন জমির মালিক শাহ জামালের বিপক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করেন। জবরদখলকারী হাজী শামীম আহসান হচ্ছেন ওসি সিরাজুল হকের ঘনিষ্ঠ ওই চক্রের প্রধান। ১১ মে জমিসংক্রান্ত আরেকটি বিরোধের জেরে দু’পক্ষের সংঘর্ষ হলে ওসি পক্ষ নেন জবরদখলকারীদের। জমি দখল করতে যারা যায় ওসি দখলকারী চক্রটির পক্ষ নেন, দখলকারীদের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করেন। মামলা নম্বর-১০, তারিখ ১১/৫/১৭। পরে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের চাপে তিনি জমির মালিকদের পক্ষে করা আরেকটি অভিযোগ কাউন্টার মামলা হিসেবে রেকর্ড করেন। ওসি সিরাজুল হকের কারণে বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হচ্ছেন উত্তরখানের স্থানীয় নিরীহ বাসিন্দারা। শত শত অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন উত্তরখানের বাসিন্দারা ওসি সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া থানার শাহ কবীর মাজার সংলগ্ন স্পট এবং থানার গলিসহ অন্তত ১৫টি মাদকের স্পট থেকে মাসে কয়েক লাখ টাকা মাসোয়ারা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ী কালা মানিক ও তার ছেলে সজিব, চম্পা রানীসহ অন্তত ২৫ জন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে ওসি সিরাজুল হকের। অন্যদিকে আবদল্লাহপুর থেকে আাটিপাড়া হয়ে মাঝুখানর্বিজ পর্যন্ত ইঞ্জিনচালিত প্রায় হাজার খানেক অবৈধ অটোরিকশা থেকেও মাসে প্রায় লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ এই ওসির বিরুদ্ধে। তিন বছর আগে ইন্সপেক্টর (তদন্ত) হিসেবে উত্তরখান থানায় যোগ দেন সিরাজুল হক। পরবর্তীতে ওসি হিসেবে ওই থানায় নিয়োগ পান। জন্মস্থান ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা হলেও তিনি পরিচয় দেন গোপালগঞ্জের। ওসি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই উত্তরখান থানার অফির্সাস ইনচার্জ পদে থেকে দু’হাতে টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অপরাধী-মাদক কারবারিদের গ্রেফতারের মতো গুরুদায়িত্ব যার ওপর সেই ওসি তার নির্ধারিত দায়িত্ব পালন না করে অপরাধীদের পক্ষে রায় দিছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি সিরাজুল হক। ওসি দাবি করেন, একটি চক্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে এলাকায় আাইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। হাজী ওসমান আহসানকে চেনেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে তিনি কয়েকবার থানায় এসেছিলেন। এ সূত্রেই তাকে চিনি।
