চকবাজার ট্র্যাজেডির কয়েকটি পরিবারের প্রতিদিনকার জীবয়ন এখন বিভীষিকাময়

0
642

চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনে থমকে গেছে নিহত হওয়া ৬৭ জনের পরিবার। নিখোঁজ থাকা আরো কয়েকটি পরিবারের প্রতিদিনকার জীবনও এখন বিভীষিকাময়।

Advertisement

 

ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রিয়জনের লাশ খুঁজে ফিরছেন তারা। ছুটতে হচ্ছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের লাশঘরেও। পুড়ে যাওয়া দেহটা পাওয়া যেন এক যুদ্ধের সমান। ২০শে ফেব্রুয়ারি চকবাজার ট্র্যাজেডিতে নিভে যাওয়া প্রাণগুলোর বেশির ভাগই ছিলেন মাঝারি ও নিম্ন  আয়ের, ছিলেন পরিবারের একমাত্র আশার আলোও। তাদের আয়ের ওপর ভর করে চলতো সংসারের চাকা। একে তো প্রিয়জন হারানোর শোক, তার উপর সংসারের বোঝা। নিহত ও নিখোঁজ হওয়া পরিবারগুলোর কাছে এ যেন আরেক জীবন যুদ্ধ। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বোয়ালমারির সোহরাব হোসেন ও সাহেরা বিবির ছেলে নুরুজ্জামান। আয়-উপার্জনের আশায় জন্মস্থান ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বসতি গড়েন। কখনো ছোট ব্যবসা, কখনো রিকশার চাকায় ভর করে চলতো ছয়জনের যৌথ পরিবার। ঘামে ঝরা উপার্জনের টাকা থেকে একটু একটু করে জমিয়ে প্রতিবন্ধী ছোট বোনের বিয়ের আয়োজন করেন। একেবারে ঘটা করে না হলেও সাধ্যের সবই করার চেষ্টা করেন ভাই নুরুজ্জামান। এদিকে, ঘরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা সাহারা বিবির ওষুধ-চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে হতো তাকে। চকবাজার ট্র্যাজেডির পাঁচ মাস আগে নুরুজ্জামান আর শিরিনের ঘর আলো করে আসে এক সন্তান, নাম রাখা হয় আবুল হোসেন। ফতুল্লা এলাকায় থাকলেও নুরুজ্জামান রিকশা চালাতেন পুরান ঢাকা এলাকায়। প্রতিদিনকার আয় থেকে ছেলের জন্য নতুন পোশাক, খেলনা নিয়ে ঘরে ফিরতেন বাবা। নুরুজ্জামানকে ছাড়া তার পরিবার এখন পথে প্রায়। শ্বাশুড়ী সাহারা বিবির জন্য ওষুধ কেনা, চিকিৎসার খরচ আর ছেলে আবুলের দেখভাল সবকিছু যেন পাহাড় সমান ঠেকছে। নুরুজ্জামানের স্ত্রী শিরিন গতকাল মানবজমিনকে বলেন, ‘স্বামীকেও হারাইলাম, লাশটাও পাইলে মনরে বুঝাইতে পারতাম। হে যাইয়্যা তো আমারে অকুল পাথারে মাঝে ছাইড়া গেল। আবুলরে এখন আমি কেমনে মানুষ করমু?’ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর মোহাম্মদ জাফর চকবাজার এলাকায় প্লাস্টিকের ব্যবসা করতেন। তার টাকায় চলতো পাঁচজনের পরিবার। দুই ছেলে মোহাম্মদ রাজু ও মোহাম্মদ সাকিব সবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছেন। এখনো পরিবারের হাল ধরার বয়স হয়নি তাদের। বাবাকে ছাড়া কিভাবে সামনের দিনগুলো পাড়ি দেবে এমন ভাবনা তাদের মুখ-চোখজুড়ে। একে বাবা হারানোর শোক সঙ্গে পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আত্মীয়-স্বজনরা কতটুকু পাশে দাঁড়াবেন সে প্রশ্নও রাজু-সাকিবের মুখে। পুরান ঢাকায় চিংড়ি চপ ও ভাজাপোড়া ব্যবসা করতেন ২৫ বছরের সোলাইমান। একটি ভ্যানে করে ঘুরে ব্যবসা চালাতেন। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বট্টবাড়ী এলাকায়। টাঙ্গাইলের আরো কয়েকজনের সঙ্গে মিলে থাকতেন পুরান ঢাকার শহীদনগর ঢালপাড় এলকায়। গত শুক্রবার দুপুরে সোলাইমানের মরদেহ শনাক্ত করেন তার পরিবারের সদস্যরা। তার ভাই শফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় অনেক কষ্ট করে থাকতো সোলাইমান। প্রতি মাসে বাড়িতে বাবা-মায়ের জন্যও কিছু টাকা পাঠাতো। অল্প হলেও কাজে লাগতো খুব। নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বিয়ে করেন নি সোলায়মান। বিয়ে করলে তো আর বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারবেন না। সোলাইমানের বন্ধু সজল ও সুজন জানান, সব সময় কম খরচ করার চিন্তা থাকতো সোলাইমানের। আমাদেরও টাকা-পয়সা হিসাব করে খরচ করার জন্য বলতো। শুধু বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য এত কষ্ট করতো সোলাইমান। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার নাটেশ্বর গ্রামের মো. সিদ্দিক উল্লাহও (৪৫) কাজ করতেন পুরান ঢাকায়। চুড়িহাট্টার আগুনে মারা যান তিনি। সিদ্দিক উল্লাহর ছেলে আহসানউল্লাহ বলেন, বাবার পাঠানো টাকায় সংসার চলতো তাদের। বাবাকে হারিয়ে এখন দিশেহারা তাদের পরিবার। ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে যে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়া হয়েছে তা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া আর দৌড়াদৌড়িতেই খরচ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতের প্রশ্নে আহসানও কোনো উত্তর খুঁজে পাননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. কাউছার আহমেদকে হারিয়ে দিশেহারা তার পরিবারও। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীপুরে গ্রামে থাকেন তার বাবা খলিলুর রহমান ও মা নুরুন্নাহার। কাউছারদের চার ভাইয়ের আর্থিক সঙ্গতিও খুব একটা সুবিধার নয়। বছর তিনেক আগে নুসরাত জাহান মুক্তার সঙ্গে বিয়েও হয় তার। ঘরজুড়ে আসে আব্দুল্লাহ ও মেহজাবীন নামে জমজ দুই শিশু। একদিকে নিজের সংসার আর পড়াশোনা আবার বাবা-মায়ের ভরপোষণের চেষ্টা। পড়াশোনার ফাঁকেই ছোটখাট ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। ক্লাসের অবসরে অংশীদারিত্বে আল-মদিনা মেডিকেল ফার্মেসিতে কাজ করতেন। তার স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে মানবজমিনকে বলেন, দুই সন্তানকে নিয়েই আমার এখন যত চিন্তা। মানুষটা তো চলে গেল, আল্লাহ তাকে জান্নাতাবাসী করুক। এখন আব্দুল্লাহ আর মেহজাবীনকে নিয়ে কিভাবে সংগ্রাম করবো? কাউছারের ভাই হাফিজ আহমেদ বলেন, আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারে ভাইটা ছিল আশার আলো। সংসারে সাহায্য করতে নিজেই একা লড়াই করে গেল। পড়াশোনা শেষে বড় চাকরি করার স্বপ্ন ছিল আমার ভাইয়ের। কিন্তু সে স্বপ্নটা আর পূরণ হলো না। তার দুই সন্তানকে লালন-পালন করাই এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কাউছারের দুই সন্তানের ভরপোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান জুয়েল। তিনি মানবজমিনকে বলেন, নিহত ছোট ভাইয়ের জন্য এটুকু করা আমাদের দায়িত্ব। চেষ্টা করবো সব সময় যেন তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। এদিকে, কাউছার আহমেদের সন্তানদের পাশে দাঁড়াতে অনুদান সংগ্রহ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার নামে একটি সংগঠন। এর অন্যতম উদ্যোক্তা সাদমান শাকিল জানান, রোববার পর্যন্ত তাদের কাছে প্রায় তিন লাখ টাকা অর্থ সাহায্য জমা পড়েছে। আশা করি এই অনুদান আরো বাড়বে। অর্থ সংগ্রহ শেষ হলে পুরো টাকা কাউছারের ছেলেদের নামে ব্যাংকে এককালীন জমা করে দেয়া হবে। আমরা চাই, তার দুই সন্তান বড় হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করুক।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here