হিংসা মানব চরিত্রের একটি মন্দ বৈশিষ্ট্য। এর কারণে সবাই কষ্ট পায়। যার প্রতি হিংসা করা হয় সে তো কষ্ট পায়ই, এমনকি হিংসুক নিজেও এর কারণে কষ্ট পেতে থাকে। এছাড়া হিংসার আগুন যখন জ্বলে ওঠে তখন আশপাশের মানুষও এ থেকে রেহাই পায় না। হিংসা থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্য কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর (আশ্রয় চাচ্ছি) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।’ সুরা ফালাক : ৫ হিংসা খারাপ গুণ। কোরআনে কারিমে হিংসা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা এক আয়াতে বলেন, ‘আর তোমরা কামনা করো না ওই জিনিস, যা দিয়ে আল্লাহ তোমাদের কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।’ হিংসা নিন্দনীয় এবং হিংসুক নিজেও সর্বদা চিন্তাযুক্ত থাকে। হিংসা নেক আমলকে খেয়ে ফেলে, যেভাবে আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে। হিংসাই পৃথিবীর প্রথম গোনাহ, যা আসমান ও জমিন উভয়স্থানে প্রথম সংঘটিত হয়েছিল। আসমানে হজরত আদম আলাইহিস সালামের প্রতি হিংসা করেছিল অভিশপ্ত শয়তান।
আর জমিনে কাবিল হিংসা করেছিল তার ভাই হাবিলের প্রতি। অসংখ্য হাদিসে হিংসার ব্যাপারে উম্মতকে সতর্ক করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে দূরে থাকো। কেননা হিংসা নেক আমলকে ওইভাবে ধ্বংস করে দেয়, যেভাবে আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দেয়।’ সমাজে হিংসার অনেক ক্ষতিকর দিক রয়েছে। হিংসা থেকে অনেক শারীরিক রোগ সৃষ্টি হয়। মানুষের কাছে হিংসুকের মর্যাদা কমে যায়। মানুষ হিংসুককে ঘৃণা করতে শুরু করে। হিংসুক আল্লাহর অবাধ্যতা করে তার অসন্তুষ্টি অর্জন করে। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে হিংসুকের সম্পর্ক নষ্ট হয়। হিংসা থেকে পরনিন্দা, পরকথা ও কথা লাগানোর মতো মন্দগুণের সৃষ্টি হয়। হিংসার কারণে জুলুম, চুরি, শত্রুতা, হত্যাকা- ইত্যাদি ঘটনার পথ তৈরি হয়। হিংসা মারাত্মক গোনাহের কাজ। তাই এ থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেকের জন্য জরুরি। এমন কিছু অভ্যাস আছে যেগুলো নিয়মিত চর্চা করলে হিংসা থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। যেমন মানুষের মুখাপেক্ষিতা থেকে অন্তরকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর প্রতি সর্বদা মনকে ঝুঁকিয়ে রাখা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। কারও সঙ্গে দুনিয়ার বিষয়ে নয়, বরং আখেরাতের বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা। মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা করার ব্যাপারে অভ্যাস গড়ে তোলা। অন্যের উন্নতি দেখলে মাশাআল্লাহ বলা কিংবা বরকতের দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তোলা। অন্যের ভালোর জন্য সর্বদা দোয়া করা। বিশেষ করে কারও মধ্যে আল্লাহর কোনো নিয়ামত দেখলে তার জন্য বেশি করে দোয়া করা। আল্লাহর যেকোনো ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা।
হিংসার পরিণতি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা। হিংসা যে নেক আমলকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়, তা সর্বদা চিন্তায় জাগ্রত রাখা। মানুষের ঘৃণার ভয় করা। কারণ হিংসুককে সবাই ঘৃণা করে। হিংসা সৃষ্টি হয় এমন কিছুর বিপরীত কাজ করা। যেমন হিংসা অন্যের সমালোচনা করতে উৎসাহিত করে। এমনটি না করে সর্বদা অন্যের প্রশংসা করা। কু-প্রবৃত্তিকে দমন করে আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা। হিংসুকের ক্ষতি থেকে বাঁচার কয়েকটি উপায় রয়েছে। যথা আল্লাহতায়ালার কাছে হিংসুকের ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাওয়া। কারণ তিনিই বাঁচানোর একমাত্র মালিক। তাই তো তিনি সুরা ফালাকে আমাদের এ কথা শিক্ষা দিয়েছেন, ‘আর (আশ্রয় চাচ্ছি) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।’ আল্লাহভীতি ও ধৈর্যধারণ করা। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তোমরা সবর করো এবং আল্লাহকে (যথাযথ) ভয় করো তবে তাদের (হিংসুকের) চক্রান্ত তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ আল্লাহর ওপর সর্বদা ভরসা করা। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।’ অন্যের দিকে মনোনিবেশ না করা এবং তা নিয়ে চিন্তাফিকির না করা। আল্লাহতায়ালার প্রতি মনোনিবেশ করা এবং সব মুসলিমকে ভালোবাসা। গোনাহ থেকে তওবা করতে থাকা। কারণ গোনাহর কারণেই মানুষের ওপর মুসিবত আসে। সদকা করা। কারণ সদকার দ্বারা সব প্রকার বালা-মুসিবত দূর হয়। হিংসুকের প্রতি উপকার করে তার অন্তর্জ্বালা দূর করা। এ বিশ্বাস অন্তরে জাগ্রত রাখা যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

