বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ক্ষমতাসীন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতিকে কাদায় ফেলে গাঁধার পিঠেই চড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন। তবে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো যুদ্ধবাজ হবেন কিনা এমন শংঙ্কায় রয়েছে বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে বাইডেন বলেন, সব বিভেদ ভুলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ ও সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
দেশকে ‘একতাবদ্ধ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আত্মা’কে ফিরিয়ে আনতে চান। দেশকে ‘বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ’ করতে চান। এর আগে জয়ের খবর পেয়ে এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘ভোট দিক বা না দিক, আমি সবার প্রেসিডেন্ট হব।’আমি এমন একজন প্রেসিডেন্ট হওয়ার অঙ্গীকার করছি যিনি বিভাজন না করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চান। যিনি লাল ও নীল রাজ্য দেখেন না, কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে দেখেন।এমন খবর গুলোই প্রকাশ করেছে বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, সিএনএন ও আলজাজিরা সহ গণমাধ্যমগুলো।৩ নভেম্বর-২০২০ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মধ্যে জয়ের জন্য বাইডেনের প্রয়োজন ছিল ২৭০টি ভোটের।
কিন্তু তার গাধার পিঠে ২৭৩টি ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত হওয়ার পরেই আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়ে যায় ডেমোক্র্যাট শিবিরে। ট্রাম্প-বাইডেন শিবিরে নির্বাচনকালীন সময়ে টানটান উত্তেজনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। হাতি ছাড়া সাদা-কালো সবাই মেনে নিয়েছে বাইডেনকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের উইলমিংটনে নিজের নির্বাচনী প্রচার সদর দফতর থেকে শনিবার রাতে দেয়া ভাষণে জো বাইডেন বলেন, যারা তাকে ভোট দিয়েছেন, আর যারা তাকে ভোট দেননি আমি সবার প্রেসিডেন্ট হব।এ সময় তিনি ঐক্য শব্দটির ওপর বারবার বিশেষ গুরুত্ব দেন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান সবাইকে তিনি শত্রুতা ভুলে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
ভোটার, প্রচারণা ক্যাম্পের কর্মী, নির্বাচনে নানা ধরনের কাজে অংশগ্রহণকারী, বন্ধু ও সহকর্মীদের ধন্যবাদ জানান তিনি। দেশটির কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা যেভাবে আমার সঙ্গে ছিলেন সেভাবেই আমিও আপনাদের পাশেই থাকব।
নিজের বর্তমান অবস্থানের জন্য স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিসহ পরিবারের সদস্যদের অবদানের কথা স্মরণ করেন বাইডেন। তিনি বলেন, পরিবারের সবার ভালোবাসা ও অক্লান্ত সমর্থন ছাড়া আমার পক্ষে এ জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। তারা আমার কলিজা। রানিংমেট কমলা হ্যারিসকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানান বাইডেন।
যুক্তরাষ্ট্রবাসীর উদ্দেশে ‘প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট’ জো বাইডেন বলেন, মার্কিন জাতির ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আমরা সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছি। আমার ওপর আপনাদের এ আস্থা ও বিশ্বাসের জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
কোটি কোটি আমেরিকান আমার দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এটি আমার জীবদ্দশায় এক অনন্য সম্মান। তিনি বলেন, যে দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ রায় দিয়েছেন সেটি বাস্তবে পরিণত করাই এখন আমাদের কাজ।তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ুসহ সব ইস্যুতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি সৃষ্ট বিভেদ ও তিক্ততার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাইডেন বলেন, আমরা কি হতে চাই সে নিয়ে জোরালো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে।
আমরা যদি পরস্পরকে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্তও নিতে পারি। বিরোধীদের শত্রুপক্ষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনার আশ্বাস দেন তিনি।
পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যুকে ঘিরে সহিংস আন্দোলন, করোনাভাইরাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর অভিজ্ঞতা না ভুলে নতুন সমাজ গড়তে সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বলেন তিনি।
করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) বৈশ্বিক মহামারী প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে দল গঠন করার ঘোষণা দেন তিনি।
ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হারিয়ে হোয়াইট হাউসে যাওয়া নিশ্চিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বাইডেন সমর্থকদের সামনে হাজির হন। ৪৬তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর উদ্দীপ্ত ভাষণে তিনি বলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সারিয়ে তোলার’ সময়।
উৎসবমুখর সমর্থকদের সামনে তিনি বলেন, ‘আমি এমন একজন প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যিনি বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবেন; যিনি লাল রাজ্য বা নীল রাজ্য দেখবেন না, শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে দেখবেন।
তিনি বলেন, আমি চাই আমেরিকার আত্মাকে ফিরিয়ে আনতে, এ জাতির মেরুদণ্ড মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পুনর্গঠন করতে এবং আমেরিকার প্রতি ফের পুরো বিশ্বের শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনতে এবং আমাদের মধ্যে একতা ফিরিয়ে আনতে।নির্বাচনে যারা তাকে ভোট দেননি তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখন কর্কশ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর দূরে ঠেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সময়, আবার পরস্পরের দিকে তাকান, ফের একে অপরের কথা শোনেন আর এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা বন্ধ করুন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমিও বেশ কয়েকবার হেরেছি, আমি আপনার হতাশা বুঝতে পারছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রেসিডেন্ট (৭৭ বছর) বাইডেন এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ডেলাওয়ারের সবচেয়ে বেশি সময়ের সিনেটর তিনি।
তবে বাইডেনের বিজয় ভাষণের পর শনিবার এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি হার মেনে নেবেন না; বরং আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনী আইন পুরোপুরি বহাল রয়েছে এবং প্রকৃত বিজয়ীই হোয়াইট হাউসে আসন গ্রহণ করেছেন; এটি নিশ্চিত করতে সোমবার আমাদের প্রচার শিবির বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাবে।

