স্মরণ : ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক : একজন আলোকিত মানুষ

0
1006

দেশের সংবাদপত্র শিল্পের অন্যতম অগ্রদূত, চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, মহামণিষী ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব মোহাম্মদ আব্দুল খালেক একজন অনুস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ও আলোকিত মানুষ। তিনি মৃত্যুর আগমূহুর্ত্ব পর্যন্ত মানব সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁর ৫৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। চট্টগ্রাম জেলার ঐতিহ্যবাহী রাউজান সুলতানপুর গ্রামে ১৮৯৮ সালের ২০ জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ৬৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। সংবাদপত্র ও আধুনিক মুদ্রণ শিল্প জগতের পথিকৃত চট্টগ্রামের প্রথম ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মহামণিষী ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব মোহাম্মদ আব্দুল খালেক-এর বিচরণ বা অবদান অন্তত চট্টগ্রামবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার খুব প্রয়োজন নেই। তিনি রাউজান সুলতানপুর গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে রাউজান আরআরএসি ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯১২ সালে প্রবেশিকা এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯১৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯১৯ সালে শিবপুর  ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে স্বর্ণপদকসহ তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা পেশার মধ্যদিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। তড়িৎ প্রকৌশলী হিসেবে কিছুকাল রেঙ্গুনে চাকরী করেন। চট্টগ্রাম ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানীতে তড়িৎ প্রকৌশলী হয়ে যোগদান এবং চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। পরে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন। চট্টগ্রামের শিক্ষা-সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় পৃষ্ঠপোষকতা এবং এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কোহিনুর ইলেক্ট্রিক প্রেস। যা ছিল এ অঞ্চলের প্রথম বিদ্যুৎ চালিত ছাপাখানা।

Advertisement

এর পূর্বে ১৯২৯ সালে ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব মোহাম্মদ আব্দুল খালেক চট্টগ্রাম শহরে প্রতিষ্ঠা করেন পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রির প্রতিষ্ঠান কোহিনুর লাইব্রেরী। ১৯৫০ সালের ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক কোহিনুর পত্রিকা। তিনি ছিলেন, সাপ্তাহিক কোহিনুর-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। পরে ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করেন চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত দৈনিক আজাদী। যা আজ সারাদেশে সমাদৃত। ওই সময়ে কোহিনুর প্রেস ও পত্রিকাকে ঘিরে চট্টগ্রামের বুকে গড়ে ওঠে একটি সৃজনশীল সাহিত্য ও সাংবাদিক গোষ্ঠি।

মরহুম ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব মোহাম্মদ আব্দুল খালেক তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক আজাদী চট্টগ্রামের বুকে জন্ম দিয়েছে বহু সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কবি ও গবেষককে-যারা এই পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থা থেকে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এবং ড. এনামুল হকের যৌথ গ্রন্থ চট্টগ্রামী ভাষার রহস্যভেদ, আরাকান রাজ সভার বাংলা সাহিত্য প্রকাশিত হলে সবত্র সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়াও শওকত ওসমান, আবুল ফজল, সাদত আলী আখন্দ, মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, সুচরিত চৌধুরীসহ বহু সাহিত্যিকের গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকী প্রকাশিত হয়। বাঙালী সংস্কৃতি-বিদ্বেষী পাকিস্তান সরকারের দমননীতি উপেক্ষা করে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রচিত একুশের প্রথম কবিতা “কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি” এই প্রেসেই গোপনে মুদ্রিত হয়েছে। এ নিয়েও রয়েছে অনেক ইতিহাস। শুধু তাই নয়, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক শিশুপাঠ্য ও শিশুতোষসহ বহু গ্রন্থের রচয়িতাও ছিলেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো যথাক্রমে : শহীদে কারবালা হযরত হোসাইন (রাঃ), হযরত ইমাম আবু হানিফা (রঃ), বার আউলিয়া, চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৯৩০), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন (১৯৫৭), দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন, শেখে চাঁটগাম কাজেম আলী, নেপোলিয়ান, বার আউলিয়া, মৌলানা মোহাম্মদ আলী শওকত আলী, ইতিহাসের শহীদ, নেপোলিয়ান, প্রাথমিক ভূগোল, বিজ্ঞান ও গ্রাম্য জীবন, রচনার প্রথম ছড়া, উর্দু প্রাউমার,  বয়েস ইংলিশ গ্রামার, ফার্স্ট বুক অব ট্রান্সলেশন, চাইল্ড পিকচার ওয়ার্ড বুক, ব্যাকরণ মঞ্জুষা,  তাওয়াফ, ঝলমল (শিশুপাঠ), মুসলিম বাল্য শিক্ষা, সহজ পাঠ (শিশুপাঠ্য) প্রভৃতি।

মোহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার চট্টগ্রামের সংবাদপত্র ও আধুনিক মুদ্রণ শিল্প জগতের পথিকৃৎই ছিলেন না, তিনি উপমহাদেশের অন্যতম সুফি সাধক হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ ছিরিকোটি (র.)’র প্রধান খলিফা হিসেবে ধর্মীয় ক্ষেত্রেও একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি সিলসিলাহ ও আলিয়া কাদেরিয়ারও একজন খলিফা ছিলেন।

১৯৫৪ সালে তিনি চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সাথেও জড়িত ছিলেন এবং মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিরও কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৬২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টলার এই মহামণিষী, সদা হাস্যোজ্জল, শুভ্র হাসির সরল প্রাণ মানুষটির মহাপ্রয়াণ ঘটে। চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি মৃত্যুর আগমূহূর্ত্ব পর্যন্ত একাধারে মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে শিখিয়ে গেছেন, কিভাবে সমাজের মানুষকে ভালোবাসতে হয়।

কিভাবে ক্ষুদ্র স্বার্থকে ত্যাগ করে মহৎ জীবনকে গড়তে হয়। ৫৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্ত নসিব দান করুন। আমিন।
লেখক : মো. এনামুল হক লিটন, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি। চট্টগ্রাম-২২ সেপ্টেম্বর’২১  

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here