সিস্টেম এনালিস্ট মাহাবুবুলের ডিজিটাল তেলেসমাতি রাজউকের ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারীর নামে ৬ কোটি টাকা লোপাট

0
1206

বিশেষ প্রতিনিধিঃ রাজউকের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট কাজী মোঃ মাহাবুবুল হকের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারীতে ডিজিটাল তেলেসমাতি দেখিয়ে গ্রাহকদের নিকট থেকে অন্তত ৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ১মিনিট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন ডিজিটাল লটারীতে ৮৩৭ জন ফ্ল্যাট বিজয়ীর মধ্যে অন্তত ৩শ জন গ্রাহকের নিকট থেকে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়ে তাদেরকে তাদের পছন্দমত ভবনের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়ে এই টাকা হাতিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউকের উত্তরা এপার্টমেন্ট প্রকল্প-এ ক্যাটাগরীতে মোট ১০ টি ১৫তলা ভবনে ১৬শ ৫৪ বর্গফুট আয়তনের ৮শ ৩৭টি ফ্ল্যাট গ্রাহকদের মাঝে গত ১০ সেপ্টম্বর-২০১৭ তারিখে বরাদ্দ দেয়া হয়। বেশীর ভাগ গ্রাহকেরই পছন্দ ছিল ভবনের নিচের দিকের মনোরম ফ্ল্যাট গুলো। এজন্য সিনিয়র সিস্টেম এনালিষ্ট কাজী মোঃ মাহাবুবুল হক ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়ার জন্য বিধান করেন ডিজিটাল লটারী। লোক দেখানো লটারীর অন্তরালে প্রায় তিনশ গ্রাহকের নিকট থেকে অন্তত ৬ কোটি টাকার উপরে ঘুষ নিয়ে তাদেরকে ভবনের পছন্দসই ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেন। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকরা মাহাবুবুল হকের ডিজিটাল লটারীকে সুষ্ঠ নিরপেক্ষ মনে করলেও আস্তে আস্তে ঘুষনীতির থলের বেরিয়ে আসতে থাকে। ৬ হাজার ১০৯ জন গ্রাহকের জন্য আলাদা নথি হিসাবে ৬১০৯টি কোর্ড নাম্বার তৈরি করা হয়। তম্মধ্যে ডিসেম্বর-২০১৬ তালিকায় যেসকল গ্রাহক ৪কিস্তি পরিশোধ করেছে তাদেরকে লটারী কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে গ্রাহক সংখ্যা ১৯০৯ জন হলেও লটারীত ফ্ল্যাট বরাদ্দ পায় ৮৩৭ জন। ১ মিনিট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন ডিজিটাল লটারীতে ৮৩৭জন লোক বিজয়ী হয় এ প্রশ্ন রাজউকের কর্মকর্তা মাহাবুবুল হকের নিকট সম্ভব হলেও বিশ্ববাসীর কাছে নজিবীহিন এমন ঘটনা। আইটি স্পেশালিষ্ট অমিত কুমার জানান, কম্পিউটারের মাউজে একটা ক্লিক করলে লটারীর মাধ্যমে বহু লোকের এক সাথে বিজয়ী হওয়ার কোন সুযোগ নাই, এমন কোন কম্পিউটার সফটওয়্যার আবিস্কার হয় নাই যার মাধ্যমে অনির্দিষ্ট কাজকে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্পন্ন করা হবে। কম্পিউটারকে আপনে যেভাবে কমান্ড বা দিকনির্দেশনা দিবেন সফটওয়্যার আপনাকে ঠিক সেই ভাবে ফলাফল প্রদান করবে। যে কোন স্কেলে কম্পিউটারে লক্ষ কোটি কাজের ফলাফল এক সাথে প্রকাশ করতে পারে। একজন মানুষের ভাগ্যে কি ঝুটবে তার হিসাব কম্পিউটার নিজে নিজে দিতে পারে না। ৬১০৯ জন লোকের জন্য ৬১০৯ টি আলাদা আলাদা কোর্ড নাম্বার রয়েছে এবং প্রতিটি ফ্ল্যাটেরই একটা করে আলাদা নাম্বার রয়েছে। এখন একজন লোকের ভাগ্যে কোন ফ্ল্যাটটি মিলবে তার হিসাব কম্পিউটার কিভাবে দিবে। যদি আপনে কম্পিউটার সফটওয়্যারে এটা নির্দিষ্ট করে দেন তাহলেই কেবল সম্ভব। আপনে একটির সাথে আরেকটি চিহ্নিত করে দিলেই কম্পিউটার আপনার কাজের ফলাফল প্রকাশ করতে পারবে। আর রাজউকের ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে যে লটারী করেছে তা কোন লটারীর আওতায় পড়ে না। একাজটি মুলত মাইক্রোসফট এমএস ওয়ার্ডের এক্সেল প্রোগ্রামে ডাটা এন্ট্রির মাধ্যমে করা হয়েছে। ডাটাএন্ট্রির মাধ্যমে আগে থেকেই নির্ধারন করা হয়েছিল কাকে কোন ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হবে। একাজটি লটারীর ফলাফল ঘোষণার পুর্বে অনেক সময় নিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ফ্ল্যাট বরাদ্দের মেলায় উপস্থিত গ্রাহক ও লটারীর নমুনা থেকে জানা গেছে, ভবনের ২য়, ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম তলায় যে সকল গ্রাহক ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছে তাদের ৯০ভাগ লোকই লটারীর দিন উপস্থিত ছিলেন না। তারা ২ থেকে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। তারা আগে থেকেই জানতেন কোন ভবনের কত নাম্বার ফ্ল্যাট পেয়েছেন। যে সকল গ্রাহক চাহিদা মতো ঘুষ দিতে পারে নাই তাদেরকে দেয়া হয়েছে ভবনের ১৫ তলার ফ্ল্যাট। আগে থেকেই কম্পিউটারে সাজানো সিরিয়াল অনুসারে পছন্দের লোকদের পছন্দসই ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়ার তালিকা ১মিনিটের ডিজিটাল লটারীতে এক ক্লিকে বের গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দেন। তাতে দেখা যায় ১-১৩২ নং সিরিয়ালে ৬১০৯ জনের কোর্ডের নাম্বারগুলোর ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। ১৩৩ থেকে ১৫০ নং সিরিয়াল পর্যন্ত কোন গ্রাহক নেই। ১৫১ থেকে ২৮৭ নং পর্যন্ত সিরিয়াল আবার ধারাবাহিক বরাদ্দ। যা উপস্থিত গ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। অনেকই মন্তব্য করেন পছন্দনীয় ৩ শতাধিক গ্রাহকের নিকট থেকে কমপক্ষ ২ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়ে অন্তত ৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মাহাবুবুল হক তার সিন্ডিকেট। রাজউকের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত এই সিন্ডিকেটের সদস্য। সবাই এ টাকার কমিশন পেয়ে থাকেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এমআইএস শাখার এক কর্মকর্তা জানান, সড়ক ও জনপথ বিভাগের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী রানাপ্রিয় বড়ুয়া। সড়ক ও জনপথ বিভাগে চাকরির সুবাদে তিনি রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের সহকর্মী ছিলেন। তিনি ৩য় তলার ফ্ল্যাটের জন্য অনেক দিন ঘুরাঘুরি করেন। পরে তিনি ৩ লাখ টাকার মাধ্যমে আব্দুর রহমানের নির্দেশনায় মাহাবুবুল হককে ম্যানেজ করেন। এ কারনে তিনি ৫৩২ নং সিরিয়ালে ১১আই ভবনের ৩য় তলার ২০২ নং ফ্ল্যাটটি পেয়েছেন। যার বর্তমান বাজার মুল্য ৯০ লাখ টাকার উপরে। কর বিভাগের কর্মকর্তা ইসমত আরা জেরিন ৬২২নং সিরিয়ালে ৪র্থ/৫ম তলায় ফ্ল্যাটের জন্য পুর্বেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি পেয়েছেনও তাই। ৪লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে দেয়া হয়েছে থ্রিডি ভবনের ৪০৫ নং ফ্ল্যাটি। অথচ তিনি লটারীর দিন উপস্থিত ছিলেন না। মাহাবুবুল হক সিন্ডিকেটের সদস্যরা রাজউকে অক্টোপাসের মতো চেপে ধরেছে। তাদের দুর্নীতি দমন করা না হলে সরকারের অনেক ক্ষতি হবে।
লটারীর বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী মাহাবুবুল হক বলেন, চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া কোন কথা বলা যাবে না। তবে লটারী কার্যক্রম পরিচালনা করেছে আমাদের সহকারী সিস্টেম এনালিষ্ট সেলিম সাহেব।
(রাজউকের দুর্নীতি সংক্রান্ত যেকোন তথ্য অপরাধ বিচিত্রাকে জানাতে পারেন। চলবে…..)

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here