সিনটিলা বিজ্ঞান ক্লাব আয়োজিত ৬২ তম বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

0
995
 ১৭ই মার্চ। জাতীয় শিশু দিবস। দিনটি আমাদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি গৌরবের। কারণ এ দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার জন্ম না হলে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম খুঁজে পাওয়া যেত না। তাই এই দিনে আমার বক্তব্যের শুরুতেই আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আমি স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের নৃশংস হত্যাকা-ে নিহত বঙ্গবন্ধুর পরিবারসহ  ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকা-ে নিহত জাতীয় চার নেতাকে। আমি স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী ৩০ লাখ শহিদ ও সম্ভ্রম হারানো ২ লাখ মা-বোনকে।
সেই সাথে আমি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি সেইসব ক্ষুদে বিজ্ঞানী ভাই-বোনদের যাদের অংশগ্রহণে এই বিজ্ঞান মেলা সফল ও সার্থক হয়েছে। আমি ধন্যবাদ দিতে চাই ঐতিহ্যবাহী সেন্ট যোসেফ পরিবারকে আমাকে এই মহতী আয়োজনে আহ্বান জানানোর জন্য।
প্রিয় ক্ষুদে বিজ্ঞানী ভাই ও বোনেরা
তোমাদের পুঞ্জীভূত মেধা, মনন আর প্রজ্ঞার এই পুষ্প কাননে আসতে পেরে আজ আমি সত্যিই অভিভূত, মুগ্ধ, বিস্মিত। কী নেই এখানে? বিজ্ঞানের ফুল, প্রযুক্তির সৌরভ, দর্শনার্থীরূপী ভ্রমরের আনাগোনা! তোমাদের মতো ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা যে পুষ্পকাননের মালি, সে বাগানের ফুল কখনো তার সৌরভ হারাবে না। তা টিকে থাকবে যুগ যুগ; সময়ের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে।
একজন যোসেফাইট হিসেবে আজ আমার গর্বে বুক ভরে যায়, যখন তোমাদের মধ্যে আমার শৈশবকে দেখতে পাই। আমিও একদিন তোমাদের মতো এই ক্যাম্পাসে ছুটোছুটি করেছি, এখনো যেন এই মাঠের ধূলো আমার পায়ে লেগে আছে। সেই ছোট্ট আমি আজ এখানে প্রধান অতিথির আসনে বসে বসে শৈশব স্মৃতিগুলোকেই রোমন্থন করছিলাম। এটি যেমন তোমাদের প্রতিষ্ঠান তেমনি আমারও প্রাণের প্রতিষ্ঠান। আজ আমি মন্ত্রী হয়েছি, শত ব্যস্ততা থাকে। তারপরও মনের কোন এক মণিকোঠায় ‘যোসেফাইট’ শব্দটি চির অম্লান থাকে। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই আমি জীবন চলার মূল দীক্ষা লাভ করেছি। আমি চিরকাল স্যলুট জানাই সেন্ট যোসেফ বিদ্যালয়কে।
সম্মানিত সুধি
আজ একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং উন্নয়নের হাতিয়ার। কেবল গতিশীল সময়ের প্রয়োজনে বিজ্ঞান নয়, জাতীয় শিল্পোন্নয়নে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির  উন্নয়ন ছাড়া কোন দেশের উন্নয়ন কল্পনাই করা যায় না।
অথচ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আমাদের সমাজের একটি বিরাট অংশ এখনো অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও পশ্চাদপদ চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন। পশ্চাদপদ চিন্তা-চেতনার এসব মানুষকে বাদ দিয়ে দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কাঙ্খিত উন্নয়ন করতে হলে আধুনিক চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। সবাইকে কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ আমরা জানি বিজ্ঞান শিক্ষা শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী হতে শেখায়। অন্ধকার থেকে আলোর পথে এবং জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলে।
ক্ষুদে বিজ্ঞানী ভাই ও বোনেরা
এতক্ষণে তোমরা নিশ্চয় জেনে গেছো “ঞড় ওসধমরহধঃরড়হ ঞড় ওহহড়াধঃরড়হ” Ñ কল্পনা থেকেই আবিষ্কারের সূচনা হয়। বিজ্ঞান মেলায় তোমাদের আজ এই প্রদর্শিত প্রজেক্টগুলোই তোমাদের দৃঢ় কল্পনাশক্তির পরিচয় দেয়। তোমাদের মতো এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের কাছেই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্নগুলোকে রেখে যেতে চাই।
আমরা জানি, তোমরাই একদিন এ দেশটিকে একটি প্রযুক্তি-নির্ভর, আধুনিক ও উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। তোমাদের মধ্যে এত মেধা রয়েছে, এত জ্ঞান রয়েছে, এত প্রজ্ঞা রয়েছে যে, কোনো অপশক্তি চাইলেও আর আমাদের দেশটাকে পেছনে টেনে নিয়ে যেতে পারবে না। তাই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আমি তোমাদের সামনে বলে যেতে চাই, তোমরা স্বপ্ন দেখ, সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার দ্বায়িত্ব আমাদের। এখানে এসে আমার উপলব্দি হয়েছে, এ দেশ একদিন বদলাবেই, উন্নয়নের যে মহাসড়কে দেশ এগিয়ে চলছে তা একদিন তার গন্ত্যব্যে পৌঁছাবেই।
সম্মানিত সুধিবৃন্দ
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৬ কোটি মানুষকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করতে তথা একটি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতেও আমাদের নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে হবে। তাই নতুন প্রজন্মকে আনন্দের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার সুযোগ করে দিতে হবে যাতে তাদের বিজ্ঞান ভীতি কেটে যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চার জন্য বিজ্ঞান মেলা খুবই জরুরি। কারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রদর্শনী সংস্কারমুক্ত সৃষ্টি বয়ে আনে। বিজ্ঞান মেলা খুদে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান মনস্ক হয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। বিজ্ঞান মেলার আয়োজন শুধু সৃষ্টিশীল নয় এ প্রজন্মের গবেষকদের তুলে নিয়ে আসে। মন ও মেধা অনুসন্ধানী হওয়ার সঙ্গে নতুনদের মনের সুপ্ত প্রতিভা জাগরণে বিজ্ঞান প্রদর্শনী সাফল্যময় দিক। তাই ক্ষুদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞান শিক্ষার আগ্রহ সৃষ্টি করতে প্রত্যেক স্কুল ও কলেজে বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করতে হবে।
সম্মানিত সুধি
আমরা দেখেছি প্রতি বছর বিজ্ঞান মেলাগুলোতে নতুনদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। এক্ষেত্রে ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের আগ্রহটাই যেন একটু বেশি মাত্রায় থাকে। আমাদেরকে ক্ষুদে বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে তারা শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানী বা উদ্ভাবক হিসেবে নিজেকে নির্মাণ করতে পারে। শিশু কিশোরদের তীব্র আগ্রহ দেখলে বোঝা যায়, তারা কিছু একটা করতে চায়। নতুন কিছু। এই নতুন কিছু করার জন্য তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।
এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন- ব্যাংক, এনজিও, শিল্প প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে পারেন। আমি আশা করি সকলের সহযোগিতায় আমাদের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা তাদের মেধা, মনন ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় এ বিশ্বকে আলোকিত করবে।
সমবেত সুধিমন্ডলী
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার এই যুগে সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এইরকম বিজ্ঞান মেলার আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আমার জানা মতে সেন্ট যোসেফ বিদ্যালয় ১৯৫৭ সাল থেকে এই বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করে আসছে। যার কারণেই এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আজ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশে^র বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। এমনকি নাসাসহ বিশে^র স্বনামধন্য ও বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কাজে নিয়োজিত রয়েছে। তাদের মৌলিক চিন্তাধারা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে তারা এই বিশ^ জয় কওে চলেছে বীরদর্পে। আমার মতে, এই প্রতিষ্ঠানই ঐতিহ্যিকভাবে সবচেয়ে বড় স্কুলভিত্তিক বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করে থাকে। আর এ জন্য সেন্ট যোসেফ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।
প্রিয় ক্ষুদে বিজ্ঞানী ভাই ও বোনেরা
আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন  দেখতেন এ দেশটি একদিন সোনার বাংলাদেশ হবে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তোমাদের মতো সোনার ছেলেরা অবদান রাখলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
তোমরা  তোমাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করবে। সর্বদা মৌলিক ও বাস্তবধর্মী চিন্তা করবে এবং তা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জনকল্যাণ করার চেষ্টা করবে। জাতীয় সমস্যা সমাধানে স্বল্পব্যয়সম্পন্ন ও কার্যকর প্রকল্প নিয়ে তোমরা এখন থেকেই চিন্তা-ভাবনা কর। আমাদের দেশের স্বনামধন্য বিজ্ঞানীরা যেখানে সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সেই জায়গাগুলোতে তোমাদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে আসতে পারে।
তোমরাই আগামী দিনের আইনেস্টাইন, তোমরাই আগামী দিনের নিউটন, তোমরাই আগামীর জগদীশ চন্দ্র বসু। তাই তোমরা এগিয়ে চল দৃপ্তপায়ে, নির্ভীকচিত্তে, নিঃসংকোচে। তোমরা দেখিয়ে দাও, বঙ্গবন্ধুর সেই অমর উক্তি -“আমাদের দাবায়া রাখতে পারবা না।” তোমাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হোক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর বাণী: থাকবো নাকো বদ্ধ করে, দেখব এবার জগতটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’
পরিশেষে, সেন্ট যোসেফ পরিবারকে আবার ধন্যবাদ জানাই ও বিজ্ঞানের ‘বঙ্গ-বিজয়’ কামনা করে আমার  বক্তব্য এখানেই শেষ করি। আপনারা সুস্থ ও সুন্দর থাকুন।
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here