সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে চলছে সিলেট স্টেশন ক্লাব

0
908

নুরে আলম খোকন: সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে চলছে সিলেট স্টেশন ক্লাব লি:। চয়ের দেশ খ্যাত সিলেটে ইংরেজ টি প্লানটাররা তাদের ব্যবসায়ীক মিলন ও বিনোদনের জন্য এ ক্লাবকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই ক্লাবের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় তৎকালীন অবৈতনিক সম্পাদক জি. এইচ ভ্যালন্টাইন সিলেটে শহরের  তেলিহাওর নিবাসী মহেন্দ্র নাথ দাস ও শেখঘাট নিবাসী বনোয়ারী লাল দাস ও বিনোদ লাল দাসের কাছ থেকে ১৯১৬ সালে ক্লাবের জন্য এক বিঘা ১২ কাঠা ৮ ছটাক জমি সংগ্রহ করে আইনী মালিকানা সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে ক্লাবের অবৈতনিক সম্পাদক ক্যাপ্টেন রশিদ আহমদ শেখঘাট এলাকার বাবু বনবীর লাল দাসের বিধাব স্ত্রী পারুল বালা দাসের কাছ থেকে ২ বিঘা ৭ কাটা জমি সংগ্রহ করলে যাত্রা শুরু হয় আধুনিক এক ক্লাবের। ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ১৯৪৮ সালে ক্লাবটির দায়িত্ববার গ্রহণ করেন সিলেটের সুনামধন্য ৯ জন ব্যক্তি। তৎকালীন সিলেটের ডিসি খুর্শেদের মধ্যস্থতায় মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন যারা তারা হলেন আমিনুর রশীদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন রশিদ আহমদ, খান বাহাদুর আব্দুল হাই চৌধুরী, বনবীর লাল দাস, বিমলাংশু সেনগুপ্ত, কালিপদ চৌধুরী, রণেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী, সমরেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী এবং বিনোদ লাল দাস। এসব বিশিষ্টজনেরা কেউ আজ বেঁেচ নেই। শুধু স্মৃতির পাতায় যেন ষ্টেশন ক্লাবের ইতিহাসে স্বর্ণক্ষরে লেখা তাদের নাম। এ ক্লাবটি ১২৫ বছর পূর্তি উৎসব করেছে অনেক আগেই। সিলেট ষ্টেশন ক্লাব মানবিক ও সামাজিক সব উদ্দ্যেগের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করে চলছে। যে ক্লাবে মুক্তিযোদ্ধা, বিচারপতি থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনাকারী অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

Advertisement

আজকাল ঢাকার অলি-গলিতে গড়ে ওঠা ক্লাব গুলো ষ্টেশন ক্লাবের মতো সুনামধন্য ক্লাবের ঐতিহ্য ধ্বংস করে দিচ্ছে সামাজিক অঙ্গনে। ক্লাব পাড়া মানে ক্যাসিনো আর অসামাজিকতা এমন ধারণার সৃষ্টি করছে আজকালের স¤্রাটেরা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে আগেকার সময়ে ক্লাব সংগঠণে কাজ করতো যুবকরা আর অর্থের যোগান দিতো অভিভাবকরা।

সিলেট ষ্টেশন ক্লাব দেশ-বিদেশের প্রতিষ্ঠিত ও প্রাচীন ক্লাবগুলোর মধ্যে একটি। দেশের বরণ্য ক্লাব গুলোর মধ্যে প্রথম সারীর ক্লাবের মধ্যেই যার অবস্থান বললে চলে। এ ক্লাবের ঐতিহ্য ও সুনাম দেশ-বিদেশে প্রশংসিত। শুধু বিনোদনই নয় আর্ত্মসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এ ক্লাবের ভূমিকা প্রশংসার দাবী রাখে। সহায়তা করা হয় ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধী অসহায় দুস্থদেরও।

ক্লাব সংগঠণের সেই শিষ্টাচার আজকের প্রজন্মের কাছে ক্যাসিনো নামে খ্যাত। কিন্তু এদের মধ্যেও দেশের ব্যতিক্রমী নীতি-নৈতিকতা নিয়ম-কানুনের মধ্যে আবদ্ধ ক্লাব গুলোর মধ্যে একটি সিলেট ষ্টেশন ক্লাব।

বর্তমানে শুদ্ধি অভিযানে ক্লাব নামধারী স্থানে আবিস্কার হয়েছে অপরাধ জগতের আস্তানা। অভিযানে বেরিয়ে আসলো ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো পরিচালনার ফিরিস্তি। কোটি কোটি টাকাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন রাজনৈতিক নেতা। উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র, মাদকসহ আরও অনেককিছু। এসব দেখে সঙ্গত কারণেই ক্লাবের প্রতি নতুন প্রজন্মের বিরূপ ধারনার সৃষ্টি হয়েছে।

তারা মনে করছে ক্লাব মানেই জুয়া, ক্লাব মানেই অপরাধীদের আস্তানা। কিন্তু না, তাদের এ ধারণা পরিবর্তনের জন্য সিলেট ষ্টেশন ক্লাবই যতেষ্ট। সরেজমিনে সিলেট ষ্টেশন ক্লাবে এ প্রতিবেদকসহ দৈনিক সংবাদ এর বিশেষ প্রতিনিধি আকাশ চৌধুরী, দৈনিক আজকের পত্রিকার সিলেট ব্যুারো চীফ এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া, ফটো সাংবাদিক ইদ্রিছ আলীসহ মিডিয়ার একটি টিম অনুসন্ধানে গেলে দেখা যায় প্রাণবন্দ এক পরিবেশ।

ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৮৮৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ব্রিটিশরা যখন আমাদের দেশ শাসন করেছে তখনই তার প্রতিষ্ঠা। এ ক্লাবের উল্লেখযোগ্য সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সাবেক রাষ্ট্রদূত এ এস এম আব্দুল মুবিন, সাবেক রাষ্ট্রদূত তোফায়েল করিম হায়দার, ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান সাফওয়ান চৌধুরী, মৌলভীবাজার সাতগাঁও টি গার্ডেন-এর ম্যানেজিং পার্টনার আরদাশির কবির।

ক্লাব কর্তাদের সাথে আলোচনা করলে জানা যায়, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বাণিজ্যেক যেসব ক্লাব গড়ে উঠেছে সেখানে অবাধে সাধারণ মানুষের পদচারণা রয়েছে। তবে ঢাকা ক্লাব বা সিলেট স্টেশন ক্লাবের মতো যেসব ক্লাব আছে সেখানে তাদের সদস্যদের বাইরে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। তবে হ্যাঁ, এক্ষেত্রে কোনো বিশেষ অতিথি ও বিদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা নেই বলেও জানা তারা। 

এসব ক্লাবের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট। মূলত সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কিছুটা অবসর সময় কাটানোর জন্যই ইতিহাসের অনেক স্বাক্ষী হয়ে আছে এসব ক্লাব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর আবারও পটপরিবর্তন। পাকিস্তানিদের বিদায়ের পর তা দখলে আসে বাংলাদেশিদের। সদস্য হতে থাকেন সরকারী কর্মকর্তা, শিল্পপতি, চা-কর সাংবাদিক-সাহিত্যিক,

রাজনৈতিক ব্যক্তি, আইনজীবিসহ সুশিল সমাজের প্রতিনিধিরা। সম্প্রতি এ ক্লাবে গেলে কথা হয় ক্লাবটির প্রেসিডেন্ট ই. ইউ. শহিদুল ইসলাম। তিনি ক্লাবের হলরুম, ডাইনিং, সুইমিং পুল, টেবিল টেনিস, ক্যারাম, দাবা, ব্যডমিন্টন, ভলিবলসহ নানা খেলাধুলার আকর্ষণীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখান।

এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ই. ইউ. শহিদুল ইসলাম জানান, সিলেট স্টেশন ক্লাবের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৪২৫ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ৪৫ জন। ক্লাবের সদস্যদের ফি ও অন্যান্য খাতে যে আয় হয় তা থেকে সংশ্লিষ্টদের ভেতন-ভাতাদি দেওয়া ছাড়াও দু:স্থ ও সামাজিক কর্মকা-ে দেয়া হয় নগদ অর্থ।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here