সাধারনর মানুষের কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও আখিঁ সুপার শপ

0
457

দেশে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অনলাইন ব্যবসা । কিন্তু তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্রতারণার বিষয়ও ফুটে উঠেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্যোক্তারা নিজেরাও চিন্তিত। বাংলাদেশে ই-কমার্সের যাত্রা শুরু হয়েছে এক দশকেরও কম সময় হয়েছে। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে তা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। অনলাইনে মাসে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বেচাকেনা হচ্ছে। তবে করোনার সময়ে তা প্রায় তিনগুণ বেড়েছিল। পচনশীল পণ্য থেকে শুরু করে ওষুধ, ইলেকট্রনিক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও কিনছেন মানুষ। সংশ্লিষ্টদের অনুমানে প্রায় ১ লাখ অর্ডার প্রতিদিন আসতো। যদিও এর বড় অংশ ঢাকাভিত্তিক। কিন্তু এসব ব্যবসার পেছনে আরো একটা প্রতারণামূলক গল্পও আছে। যেটা হলো সাধারণ জনগণকে ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেয়ার পদ্ধতি। ফটকা ব্যবসায়ীরা ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে এসব কাজ সম্পূর্ণ করেছে। যা সাধারণ জনগণ আজো বুঝতে পারেনি এদের প্রতারণা। এদের নাটকের শুরু হয় অবিশ্বাস্য মূল্যছাড় দিয়ে। এরপর ধারাবাহিকভাবে ক্যাশব্যাক ও গিফট ভাউচারের প্রলোভনে গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয় কোটি কোটি টাকা।

Advertisement

তেমনি সিলেট শহরতলীর শাহপরান বটেশ্বর গইলাপাড়ায় ব্যাঙ্গের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছিল আখি সুপার শপ ই-কমার্স ব্যবসা। জমকালো বিজ্ঞাপন আর বিভিন্ন লোভনীয় অফারে যেমন অল্প কিছু সংখ্যক ভোক্তা লাভমান হয়েছেন তার চেয়ে প্রতরণার শিকারও হয়েছেন বেশি। এসব ব্যবসার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল লাইসেন্স ও কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তারা চালিয়ে গেছে এমন অবৈধ ব্যবসা।

বলছি শাহপরানের আঁখি সুপার শপ নামক কথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কথা। এই প্রতিষ্ঠান তাদের ফাঁদে ফেলে জনগণের ​কয়েক কোটি টাকা নিয়ে বর্তমানে উধাও। এখন উধাও রয়েছে আঁখি সুপার শপের জাহাঙ্গীর আলম ও আঁখিসহ তাদের স্থানীয় দালালরা। ফাঁদ ফেতে জনগণের সাথে প্রতারণা করে জনগণের কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও কথিত “আখি সুপার শপ” নামের ই-কমার্স এই প্রতিষ্ঠানটি। শাহপরান (রহ.) থানাধীন বটেশ্বর গইলাপাড়া মসজিদের পাশে অবস্থিত ছিল কথিত প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে আজ ৫ দিন থেকে তাদের প্রধান কার্যালয়সহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব অফিস। পাওয়া যাচ্ছে না আঁখি সুপার শপের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। আঁখি সুপার শপে অর্ডার করা পণ্য না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়গুলোতে যোগাযোগ করে শূন্য হাতেই ফিরছেন জনগণ। দিনভর বসে থেকেও কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা পাননি তারা। আর ভুক্তভোগী গ্রাহকরা লোভে পরে টাকা হারিয়ে এখন অনেকে প্রায় এখন রাস্তায়।

জানা গেছে- আঁখি সুপার শপ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জাহাঙ্গীর আলম ও আঁখি তারা ব্যবসায়ীক স্বামী-স্ত্রী। তারা স্বামী-স্ত্রী না হয়েও স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে স্থানীয় কয়েকজন দালাল যুবকের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চালিয়েছিল এই অবৈধ ই-কমার্স ব্যবসা। প্রথম প্রথম লোভনীয় অফার দিয়ে গ্রাহকদের আকর্ষণ বাড়িয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। আর এসব প্রতারণার বিষয়টি জেনে শুনে অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল স্থানীয় কয়েকজন বখাটে অসাধু যুবক চক্র।

“বাই ওয়ান গেট ওয়ান” অফারের নামে একটি মোটরযান ফ্রি দেওয়ার উরাধুরা অফার দিয়ে কথিত আঁখি সুপার শপ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের নিকট হইতে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা।

তাছাড়া এই কথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্থানীয় পুলিশের চিহ্নিত এক দালালের মাধ্যমে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদেরও অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে প্রায় সময়েই। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে কথিত আঁখি সুপার শপের বৈধতা যাচাই-বাচাইয়ের কি কোন দায়িত্ব নেই প্রশাসনের লোকদের? আর যদি বৈধ-অবৈধ যাচাইয়ের দায়িত্ব থেকেই থাকে তাহলে কি উনারা তা যাচাই-বাছাই করেছিলেন? প্রশ্ন থেকে যায় এখানেও।

অনুসন্ধানে জানা গেছে- আখি সুপার শপ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের একটি মোটরযানের সাথে আরেকটি মোটরযান ফ্রি দেয়ার বাম্পার অফার দিয়েছিলো। তাদের নিয়ম ছিল যে কোন একটি মডেলের মোটরযানের পুরো টাকা জমা দিলে ৯৯ দি পর তারা একসাথে ওই মডেলের ২টি মোটরযান দেবে। যা গত ৩১ জানুয়ারি ২০২১ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গ্রেজেট নং- ২৬.০০.০০০০.১৩৩.৯৩.০২৬.১৯.৫৮ জাতীয় ই-কমার্সের নীতিমালা ২০১৮ এর সম্পূর্ণ উল্টো। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করতে যে সকল লাইসেন্স দরকার তা তার একটিও তাদের ছিলো না। এভাবে কোন এক অদৃশ্য শক্তির বলে তারা গত ১০/১১ মাস থেকেই সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে ওই ব্যবসাটি পরিচালনা করে আসছিল। দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী-অনলাইন পণ্য অর্ডার করার ১০ দিনের ভিতরেই তা গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দিতে হয়। কোনভাবেই পণ্যের সম্পূর্ণ দাম অগ্রিম নেওয়া যাবে না। কিন্তু অদৃশ্য পেশীশক্তির বলে অবৈধভাবে কথিত আঁখি সুপার শপ জনগণের ব্রেইন ওয়াশের ব্যবসা চালিয়েছে স্থানীয় থানা পুলিশের নাকের ডগায়।

আরো জানা গেছে- জাহাঙ্গীর আলম ও আঁখি নামের এক ব্যবসায়ীক স্বামী-স্ত্রী প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এই অবৈধ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাদের এই একটি মোটরযানের সাথে আরেকটি মোটরযান ফ্রি দেয়ার লোভনীয় অফারে কয়েকশত গ্রাহক অর্ডার করা মাত্রই কয়েক কোটি টাকা নিয়ে গা ডাকা দিয়েছে কথিত আখি সুপার শপ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা জানান- তিনি প্রায় ৪ লাখ টাকা ইনভেস্ট করেছিলেন মোটরসাইকেল এর জন্য। কিন্তু হঠাৎ শুনতে পান আঁখি সুপার শপ কয়েকদিন থেকে বন্ধ। পরে তিনি খুঁজ নিয়ে জানতে পারেন আঁখি সুপার শপের কথিত স্বামী-স্ত্রী গা ডাকা দিয়ে বর্তমানে রাজশাহী আছে। তবে তিনি তাদের এই সুপার প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে উঠতে পারেন নি বলেও জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে “আখি সুপার শপের” কর্নধার জাহাঙ্গীর আলমের মুঠোফোন একাধিকবার যোগাযোগ করলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে সর্বশেষ বুধবার (২৯ই ডিসেম্বর) রাত ০৮:২৫ মিনিটের সময় কথিত আঁখি সুপার শপের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজে একটি স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছে তা পাঠকের জন্য হুবুহু তুলে ধরা হলো-পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে আঁখি সুপার শপ বন্ধ রাখা হয়েছে। আপনারা কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। একটু ধৈর্য রাখুন। আমরা আছি। প্লিজ আমাদের কেউ ভুল বুঝবেন না।
এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, সত্যি কি কথিত আঁখি সুপার শপ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আবার ফিরে আসবে? না কি জনগণকে শান্তনা দিয়ে দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করছে জাহাঙ্গীর ও আঁখি?

এ ব্যাপারে হাজারো ভুক্তভোগী জনগণ সাংবাদিকদের দেখে কান্নায় জর্জরিত হয়ে ভেঙ্গে পড়েন। তারা জানান- স্থানীয় অসাধু কয়েকজন দালালের খপ্পরে পরে তাদের কুপরামর্শে লোভে পরে কেউ বাড়ি বন্ধক রেখে, কেউ বিভিন্ন সমিতি থেকে কিস্তি, আবার কেউ বউয়ের গয়নাসহ নিজের শেষ সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করে আঁখি সুপার শপে টাকা ইনভেস্ট করেছিলেন। আর এখন যদি তাদের এই কষ্টের টাকা গুলো ফেরত না পান তাহলে তাদের বাঁচা-মরা এক সমান বলে আকুতি মিনতি করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

সর্বশেষে তারা এই কথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আঁখি সুপার শপের প্রতারক জাহাঙ্গীর ও আঁখিসহ তাদের স্থানীয় সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here