হাতে লোগোসহ মাইক্রোফোন, কাঁধে ভিডিও ক্যামেরা আর কারো হাতে ক্যামেরা স্ট্যান্ড, গলায় শোভা পাচ্ছে প্রেস লেখা চওড়া ফিতায় আইডি কার্ড। সকাল থেকেই দৌঁড়ঝাপ। প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার ছাপানোর নামে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা নেয়া, আবাসিক হোটেলে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করা, জমি দখল মুক্ত করে দেয়া এবং সরকারি চাকরি পাইয়ে দেয়ার নাম করে লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া। এই ছিল চক্রটির প্রতিদিনের কাজ। সাংবাদিকতার নামে দুর্ বিত্তায়ন।সংবাদ পেয়ে (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে র্যাব-৩ এর একটি টিম বিশেষ অভিযান চালায় নিউজ টুয়েন্টি ওয়ান নামের একটি ভুয়া অনলাইন টেলিভিশন অফিসে। বের হয়ে যায় চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। যুবকদের বেকারত্বকে পুঁজি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলো নিউজ টুয়েন্টি ওয়ানের মালিক শহিদুল ইসলাম।অভিযানে সেখানে বেশ কিছু নথিপত্রও পায় র্যাবের কর্মকর্তারা। অভিযানের সময় র্যাব জানতে পারে শহিদুলের প্রধান ঘাটি হলো রাজধানীর পল্টন এলাকায়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল দুপুর ২টায় শহিদুলকে নিয়ে র্যাব অভিযান চালায় পল্টন থানা এলাকার ৫০/১ ভবনের ৮ম তলার সাপ্তাহিক অপরাধ চক্রের কার্যালয়ে। অভিযানটির নেতৃত্বে ছিলেন র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু।
অভিযোগ রয়েছে এই চক্রটি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের নাম এবং সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সীল ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছিলো। দীর্ঘদিন যাবত প্রতারণার অভিযোগে শহিদুল ইসলাম ও আমেনা খাতুন নামের ২জনকে আটক করা হয়।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে প্রতারক চক্রকে হাতেনাতে আটক করে। তাদের অফিস তল্লাসি করে বিভিন্ন নামীয় উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিবসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের জাল সীল, জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ৮২টি, চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন ভুয়া নথিপত্র উদ্ধার করা হয়।
এবি চ্যানেল নামের অনলাইনে কর্মরত প্রতারণার শিকার নোয়াখালীর রিয়া (১৮) জানান, জাহাঙ্গীর (২৫) নামের এক যুবকের সাথে পরিচয় হয় রিয়ার। তার মাধ্যমেই পল্টনে সাপ্তাহিক অপরাধ চক্র ও এবি চ্যানেল নামের অনলাইন টিভিতে যোগদান করেন।
মাঝে মধ্যে তাকে পাঠানো হত বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের স্বক্ষাতকার আনতে। রিয়া জানায় মিডিয়াতে নিজেকে গড়ে তোলা এক স্বপ্ন ছিল। আর সেই স্বপ্ন পুরন করতে রিয়া তার মায়ের গহনা বিক্রি করে এই প্রতিষ্ঠানে দিয়েছে ৬০হাজার টাকা। ৬ মাসের মত কাজ করলেও রিয়া পায়নি কোন পারিশ্রমিক। সে প্রতারনার স্বীকার।
আরেক ভিকটিম টাঙ্গাইল থেকে আসা নিশি (১৯) বলেন, তিনি একটি পার্লারে কাজ করতেন। ৩ মাস হল তিনি এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তার কাজ ছিল বিভিন্ন নিউজে ভয়েজ দেয়া। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ক্যামেরা নিয়ে বাইরে যাওয়া। তার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।
এদিকে সাপ্তাহিক অপরাধ চক্রের প্রকাশক ও সম্পাদক পরিচয়দানকারী আমেনা বলেন, তিনি কোন অন্যায় করেননি। আর্থিক সংকট থাকায় কাউকে (সাংবাদিক) বেতনভুক্ত রাখা সম্ভব হয়নি। তাই সকলকে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। চাকরির নামে অর্থ আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি কারো কাছে টাকা নেননি। তবে তার প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী সম্পাদক এই প্রতারণার সাথে জড়িত।
পল্টনের অফিসটি প্রতিমাসে ৩৩ হাজার টাকা ভাড়া ও স্টাফ খরচ ২০ হাজার টাকা। তবে কিভাবে এই খরচ বহন করা হতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশ বাববত টাকা ও কিছু বিজ্ঞাপন বিল আনতেন তাই দিয়ে খরচ চালানো হতো। তবে বিজ্ঞাপনের কোন রেজিস্টার বা অয়-ব্যয়ের হিসাব তারা দেখাতে পারে নাই।তবে প্রতারক সহিদুল ইসলাম অপরাধ স্বীকার করে বলেন এখন এর প্রাশ্চিত্ত করছি।

