নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর উত্তরার জসিমউদ্দিন থেকে বাউনিয়া ও বাদালদী রোডে জীবনের ঝুকি নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন শতশত যাত্রী। নেই যেমন সেবার মান, তেমনি নেই দক্ষ ড্রাইভার।এই সুযোগে কড়াগন্ডায় নিজের স্বার্থ বুঝিয়ে নিচ্ছে কর্তাব্যক্তিরা। প্রতিমাসে এই রোডে লেগুনা থেকে চাঁদা উঠানো হয় ৫ লাখ ৫৬ হাজার। ইজিবাইক থেকে ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সর্বমোট ১২ লাখ ৩১ হাজার টাকা উঠানো হয় চাঁদা নামক জিপির নামে। এই টাকা প্রায় যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ও গিয়াস উদ্দিন সরকার। সরেজমিনে গিয়ে দেখাযায়, রাস্তায় অদক্ষ, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ড্রাইভার দিয়ে চলছে ফিটনেস বিহীন ও অনুমোদন বিহীন লেগুনা ও ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক। রাস্তায় চলাচলের অনুমোদন যা দেয়া আছে তার ৩গুণ চলছে। সেই সাথে বাড়ছে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা। ইজিবাইক ও লেগুনা দুর্ঘটনায় পুংত্ববরণ করার মত ঘটনার জন্মদিয়েছেন অনেকবার। রিক্সাসাচালকরা প্রায় দিশেহারা যাত্রীদের নিয়ে।
অনুসন্ধানে জানাযায়, জসিমউদ্দিন থেকে বাউনিয়া বাজার ও বাদালদি ৬তলা পর্যন্ত চলাচল করে ৫৩টি বেঙ্গলের লেগুনা। বাদালদিতে চলে ১৩টি, আর বাউনিয়া রুটে চলে ৪০টি গাড়ি। প্রতি গাড়ি থেকে চাঁদা নেয়া হয় ৩৫০ টাকা। এই রুটে ইজিবাইক নেয়া হয় ১৫০ টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন লেগুনা ও ইজিবাইকের মালিক বলেন, ‘আমরা নিজের লাখ লাখ টাকা দিয়ে রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে জিপি নামের চাঁদা গুনতে হয়। সেটা গাড়ি চলুক বা না চলুক আমরা প্রতিদিন ৩৫০ টাকা করে লাইনম্যান জাহিদুলের কাছে দিতে হয়।
তার পরও রয়ে যায় নানা ঝামেলা। কি ঝামেলা জানতে চাইলে তারা অভিযোগের সুরে বলেন, প্রতিমাসে লাইনম্যানের কাছে যে জিপি দেয় সেখান থেকে থানা পুলিশ ও সার্জেন্টদের নিয়মিত বাজেট অনুযায়ী দেয়া হয়। প্রশ্ন হলো তার পরও কেন মাঝে মাঝে গাড়ী ধরে জসিমউদ্দিন পুলিশ বক্সে নিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় সার্জেন্টরা? যেকোন একটা করবেন হয় চালাবে না হয় বন্ধ করবেন?
দেখা যাক লেগুনা থেকে চাঁদার একটি সমীকরণ:
চাঁদার এই সমীকরণ দেখে চোঁখ যেন কপালে, শুধু লেগুনা থেকে প্রতিদিন চাঁদা উঠে ১৮ হাজার পাঁচশ টাকা। প্রতি মাসেচাঁদার পরিমান দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৬ হাজর টাকা। বছর শেষে চাঁদার টাকার পরিমান দাড়ায় ৬৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এটিশুধু ছিল লেগুনার হিসাব। এই টাকা যায় যুবলীগ নেতা সোহেলের পকেটে। এবার ইজিবাইক থেকে কত টাকা চাঁদা উঠানো হয়। জসিমউদ্দিন পাকার মাথা থেকে বাউনিয়া ও বাদালদি রুটে ইজিবাইক চলে ১৫০টি। প্রতিটি ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন চাঁদা উঠানো হয়
১৫০ টাকা। প্রতিদিন ২২ হাজার ৫শত টাকা। মাসে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, বছরে দাঁড়ায় ৮১লাখ টাকা। বছরে লেগুনা ও ইজিবাইক এই দু লাইন থেকে চাঁদা উঠানো হয় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়াও গুনতে হয় গাড়ী নামানোর সময় ২-৩ হাজার টাকা। লাইন পরিচালনাকারী সোহেল মিয়া ও গিয়াস উদ্দিন সরকারের কাছে দেয়া হয় এই চাঁদা। যুবলীগ নেতা সোহেল দেখ ভাল করেন লেগুনা। ইজিবাইক লাইন দেখ ভাল করেন গিয়াস উদ্দিন সরকার। আইনশৃংখলা বাহিনীর বেশ কিছু অসাধু সদস্যসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের যোগসাজশে চলছে এই চাঁদার।
চাঁদা নেয়ার তালিকায় রয়েছে, তুরাগ থানা, বিমানবন্দর থানা, ডিয়াবাড়ি পুলিশ ফাড়ি, পশ্চিম থানা ও তালিকার শীর্ষে নাম রয়েছেন জসিমউদ্দিন ট্রাফিকপুলিশ বক্সের টিআই ফারুক, এসি পেট্রোল ফেরদৌস, পিআই মনির। শুরুতেই টি আই ফারুক সম্পর্কে জানাযাক, নাম পরিচয় গোপন রেখে একজন লেগুনা মালিক বলেন, টি আই ফারুক স্যারকে প্রতিমাসে দিতে হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা লেগুনা থেকে। তার পরেও মাঝেমাঝে গাড়ি জসিমউদ্দিন বক্সে নিয়ে ১৫-১৬শ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। ভাড়া থাক না থাক তাকে এই টাকা দিতেই হবে।
সোহেল ও গিয়াসের নির্দেশে লেগুনার লাইনম্যান জাহিদুল ইসলাম ও ইজিবাইকের লাইনম্যান জামানের মাধ্যমে দেয়া হয় টি আই ফারুকের টাকা। তার মানে দু’লাইন থেকে টিআই ফারুক মাসে পায় ৫০ হাজার টাকা। এছাড়াও আছে গাড়ি ধরার আলাদা টাকা। একজন লেগুনার ড্রাইভার টি আই ফারুক সম্পর্কে বলেন, একবার আমার লেগুনা জসিমউদ্দিন বক্সে ধরে নিয়ে গিয়ে সে পারিবারিক বাজার করতে যান শপিংমলে। সেখানে বিল আসে ১৬ শ ৮০টাকা। বিলের কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে বিল দিয়ে আয় আমার ২০টাকা লস হয়ে গেল। এই হলো টি আই ফারুকের কর্মকান্ড।
অনুসন্ধানে যানাযায়, লেগুনা ও ইজিবাইক থেকে প্রতি মাসে টিআই ফারুককে দিতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও তার নামে চারটি গাড়ি থেকে মানতলি ২হাজার করে টাকা দিতে হয়। লেগুনা ও ইজিবাইক মালিকরা অভিযোগের করে বলেন, যদি চাঁদা দেয় তাহলে পুলিশ কেন আমাদের গাড়ী রেকারে দিবেন? মাঝে মাঝে হয়রানী করবেন? আমরা তো ঠিক মত তাদের চাঁদার টাকা পরিশোধ করে থাকি। তাহলে কেন আমাদের উপর এমন অত্যাচার করা হয়। আপনারা যেকোন একটা করবেন হয় টাকা নিবেন, না হয় রেকার লাগাবেন। এসময় তাদের হয়রানী বন্ধ করার দাবি ও জানান।
লেগুনার দায়িত্বে থাকা সোহেল মিয়া বলেন, আপনারা খোজ নিয়ে দেখেন এই টাকা কোথায় যায়। কারা কারা পায় সেটা আপনারা বের করেন প্লিজ আমি কিছু বলতে চাই না। চাঁদা সম্পর্কে ইজিবাইকের লাইনম্যান গিয়াস উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আসলে ভাই কি যে বলি লাইন নিয়ে বড় বিপদে আছি। চাঁদা উঠানো দেখেন, কি এই টাকা যে কত হাতে দিতে হয় বলে শেষ করতে পারব না।’
তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: নুরুল মোক্তাকিন বলেন, পাকার মাথা আমার না, পরে যখন বলা হয় বাউনিয়া রোডে চলে, সেটা তো আপনার থানা এলাকা? জবাবে তখন তিনি বলেন, আচ্ছা আমি দেখছি, ওখানে আমাদের ডিয়াবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ি দেখেন, ব্যস্ত আছি বলে ফোনটা রেখে দেন।
অভিযোগের সত্যতা জানতে চাওয়া হলে জসিমউদ্দিন ট্রাফিকপুলিশ বক্সের টি আই ফারুক চাঁদা নেয়ার বিষয়টি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যখন বলা হয় আমার কাছে প্রমাণ আছে আপনার চাঁদা নেয়ার ৫০ হাজার টাকার। এসব মিথ্যে বানোয়াট আমি কোন চাঁদা নেয়না বা জানিও না বলে ফোনের লাইন কেটে দেন। পরে তাকে কল দিলে আর রিসিভ করেন নি।
ঢাকা উত্তর জোনের ট্রাফিকের ডিসি প্রবির রায় কুমার বলেন, যে কয়েকটা গাড়ির অনুমোদন আছে সেগুলো চলবে। এছাড়া যদি অতিরিক্ত গাড়ি রোডে চলে আমরা অভিযান করে ধরব। বা আপনি হয়ত অবগত আছেন আমিসহ মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করে থাকি। আপনার লোকজন এখান থেকে মোটা অংকের চাঁদা উঠান সেই সম্পর্কে অবগত আছেন কি না? এমন প্রশ্নে ডিসি বলেন, আমার জনা নেই, আপনি বলেছেন যখন আমি এখনই দেখছি। এমন প্রমাণ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিব নিশ্চিত থাকেন। কোন অন্যায়কে ছাড় দেয়া হবে না।
এছাড়াও যুবলীগ নেতা সোহেলের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদকের অভিযোগ। তার নেতৃত্বে মাদকের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তার ফুফাত ভাই অপুসহ কয়েকজন। বাউনিয়া বটতলা ইস্মাইল গার্মেন্ট থেকে প্রতি মাসে চাঁদা নেয় ৪০ হাজার টাকা। বিচার সালিসি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এছাড়া ও রয়েছে দখলবাজীর অভিযোগ।

