মৃত্যুকে পায়ে ঠেলে জীবন বাঁচানোর আরেক লড়াই

0
522

নগরের আকবরশাহ থানা এলাকার ফিরোজশাহ কলোনি। মূল সড়কের ত্রিমুখী সড়ক থেকে পূর্ব দিকে যে সড়ক গেছে সেটি ধরেই যেতে হয় পূর্ব ফিরোজ শাহ এক নম্বর ঝিলে। মোটরসাইকেল নিয়েও ওই পথে যাওয়া যায় না। হেঁটেই যেতে হয়। কিছুটা যাওয়ার পর পাহাড়।

Advertisement

খাড়া পাহাড়ে চলাফেলার জন্য চার ফুট প্রস্থের একটি সড়ক। মূলত ইট দিয়ে কোনো মতে সড়কের মতো করা হয়েছে। এমন সড়ক ধরে পাঁচ মিনিট হাঁটতেই দেখা মেলে একটি পাহাড়ের মাঝ বরাবর কাটা হয়েছে অনেক বড় করে। যেন পাহাড়ের বুক কেটে চৌচির করা হয়েছে। মাটির স্তূপ থেকে নিচে নামতেই চোখে পড়ে সারি সারি টিনসেড সেমিপাকা ঘর। আরো কিছুটা হাঁটার পর বোঝা গেল, তিনদিক দিয়ে পাহাড়ে ঘেরা জায়গার নামই ১ নম্বর ঝিল। ঝিলের ভেতর আবার এঁকেবেঁকে যাওয়া সব উপ-সড়ক। পথ চলা কঠিন। একজন হাঁটলে আরেকজনের হাঁটা কষ্টকর। এরই মধ্যে বুক চেতিয়ে উঁচু মাথায় দাঁড়িয়ে আছে তিনটি পাহাড়। তিন পাহাড়ের পাদদেশটি নিচু এবং শত শত ঝুপড়ি ঘর। কোনোটি টিনের তৈরি। কোনটি সেমিপাকা। আবার কোনটির আধা ভাঙা। ঝিলের শেষ প্রান্তে পৌঁছতেই দেখা গেল একদল লোক দেখছেন আগের রাতে ধসে যাওয়া পাহাড়ের ঢালু এবং টিনের ঘরটি। সেখানে আছেন আশপাশের একদল নারী। তাঁদের কেউ কেউ দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত। কিছুক্ষণ আগে যে পাহাড় তিনটি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, সেই পাহাড়ের পাদদেশে খাবার রান্নার আয়োজন। এ যেন মৃত্যুকে পায়ে ঠেলে জীবন বাঁচানোর আরেক লড়াই! দেখা গেল, অন্তত ৬০ ফুট উঁচু পাহাড়ের নিচে সারিবদ্ধ ঝুপড়ি ঘর। পাহাড়ের মাথা থেকে মাটি পড়েছে নিচের টিনের ঘরে। সেই মাটিতেই চাপা পড়ে মারা গেছে তিন বছরের শিশুকন্যা নূর বানু (৩)। তার মা নূরজাহান বেগম (৪৫) ও নানী বিবি জহুরা (৮০)। শিশুকন্যা নূরবানু মায়ের কোলকেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় জানত। সেই কারণে মৃত্যুর সময়ও মায়ের বুক আঁকড়ে ছিল। সম্ভবত বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি ছিল। কিন্তু যমদূত সেই আকুতিকে পাত্তা দেয়নি। মায়ের বুকের নিরাপদ আশ্রয় থেকে শুধু শিশু নূরবানুকে কেড়ে নেয়নি। সঙ্গে তার মা নূরজাহান বেগমকেও নিয়ে গেছে। আর বৃদ্ধা নানীও যেন ধরেছেন মেয়ে-নাতনির দেখানো পথ। তিনদিকের উঁচু পাহাড়-মাঝখানে ঢালুতে কীভাবে বাস করেন?-এমন প্রশ্ন করতেই ক্ষোভ ঝাড়লেন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হামিদ। বললেন, ‘আপনারা (প্রশাসন ও সাংবাদিক) আসেন এখান থেকে সরে যাওয়ার কথা বলতে, কিন্তু যাব কই? সেটা তো বলেন না। ভিটা-ঘর নেই বলেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এখানে আমরা থাকি। শহরে কাজ করে জীবিকা চালাই। দরিদ্র বলে ভালো ঘর ভাড়া করতে পারি না। এ কারণে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে এখানে বাস করছি।’তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা এ দেশে এসে পাহাড় উজাড় করে বাস করছে কক্সবাজারে, সেদিকে আপনারা দেখেন না। শুধু দেখছেন, আমাদের। আমরা কী বাংলাদেশি নই?’আবদুল হামিদের পাশে আরো কয়েকজন ছিলেন। তাঁরাও সায় দিলেন হামিদের কথায়। যেন এ মুহূর্তে হামিদই তাঁদের সবার মনের কথা বলেছেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তাঁরা এসব পাহাড়ে বাধ্য হয়ে বাস করছেন। ছোট্ট ঘর ভাড়া পান অল্প দামে। নিজেদের আয় কম বলেই বাধ্য হয়ে মৃত্যুর ভয় থাকা সত্ত্বেও এসব ঘরে থাকেন। সুযোগ পেলে অন্য কোথাও চলে যেতেন। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে কাজ নেই। আয়ও নেই। তাঁরা সন্তানদের নিয়ে মৃত্যুকূপে আছেন। এ প্রসঙ্গে আকবরশাহ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জসীম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষগুলো নিজেদের থাকার জন্যই রোহিঙ্গা ইস্যু টেনে আনছেন। রোহিঙ্গা ইস্যু আর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি-এক বিষয় নয়। আমাদের বাস্তবতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন  বলেন, ‘সরকার ভূমিহীন পরিবারকে ভূমি দিচ্ছে। আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর দিচ্ছে। কিন্তু চট্টগ্রামে যেসব মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বাস করছে, তাঁদের অবস্থা ভিন্ন। তাঁরা দেশের নানা জেলা থেকে চট্টগ্রামে এসে বাস করছেন। তাই তাঁদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া কঠিন। তবে সরকারের উদ্যোগ আছে।’ ঘটনাস্থলে কথা হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর আবিদা আজাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় বাসকারী ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়া যায়।’তিনি বলেন, ‘আকবরশাহ থানা এলাকায় সর্বাধিক লোকজন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসত করে। তা উল্লেখ করে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অবস্থার উন্নতি হতে পারে। তবে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি এখানে যাঁরা বাস করছেন, তাঁদের উচিত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি না করে নিরাপদ স্থানে গিয়ে বাসা ভাড়া নেওয়া। মূলত কম আয়ের মানুষ কম টাকায় ঘর ভাড়া পাওয়ার আশায় এখানে মৃত্যুকূপে আসেন। জেনে শুনে মৃত্যুর মুখে পরিবারকে ঠেলে দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।’ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান জানান, যে ঘরের মানুষ মারা গেছেন, তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁরা পুনরায় ঘরে ফিরে যান এবং হতাহতের ঘটনার শিকার হয়েছেন। প্রশাসনের সতর্কবার্তা শুনে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকলে এমন মৃত্যু এড়ানো যেত।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here