সারা দেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ৫ দিনের দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
পঞ্জিকা অনুসারে গতকাল রবিবার প্রতিটি পূজামণ্ডপে সায়ংকালে দেবীর বোধন অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভক্তি ভরে আশীর্বাদ চেয়ে দেবী দুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করবেন। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে মর্ত্যে আসবেন এবং দোলায় ফিরে যাবেন। দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। পুরাণ মতে, রামায়ণ যুগের অবতার শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কার অধিপতি রাবণের অশোক বনে বন্দি সহধর্মিণী সীতাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে শরৎকালের অমাবস্যা তিথিতে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার স্তুতি করেছিলেন। তখন থেকে প্রতি বছর শরৎকালের অকাল বোধনের তিথিতে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় দুর্গোৎসবের আয়োজন করে। আশি^ন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ ষষ্ঠী থেকে দশমী- এই পাঁচ দিন শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। এ সময়কে আবার দেবীপক্ষ বলা হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশের মন্দির ও পূজামণ্ডপে উৎসবের আমেজ। সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাব অনুযায়ী এবার সারা দেশে ৩১ হাজার ২৭২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতে ২৩৪টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। গতবার রাজধানীতে ২২৯টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বরাবরের মতো এবারো রাজধানীর ঢাকেশ^রী জাতীয় মন্দিরে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মহাষ্টমীর দিন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে দুর্গাপূজার মূল আকর্ষণ কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রমনা কালী মন্দির, সিদ্ধেশ^রী কালী মন্দির, কলাবাগান, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি, শাঁখারী বাজার, তাঁতিবাজার, মহাখালী, বনানী, মনিপুরীপাড়া, মিরপুর, সবুজবাগ, উত্তরাসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। পূজার শেষ দিন রাজধানীর ঢাকেশ^রী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শুভ বিজয়ার র্যালি বের হবে। এখান থেকেই সদরঘাটে গিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সার্বজনীন দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে র্যাব, পুলিশ ও আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দেশের সব পূজামণ্ডপে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। পূজায় ৫ দিনের অনুষ্ঠান সূচি : দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান সূচির মধ্যে আজ সোমবার ১৫ অক্টোবর মহাষষ্ঠী। উৎসবের প্রথম দিন সকাল সাড়ে ৯টায় কল্পারম্ভ এবং বোধনের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠীপূজা শুরু হবে। সন্ধ্যায় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠীপূজা সম্পন্ন হবে। এদিন সকাল থেকেই প্রতিটি পূজামণ্ডপ চণ্ডীপাঠে মুখরিত থাকবে। সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তিমূলক গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিকেল ৩টায় রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে পূজামণ্ডপ ও বিকেল ৪টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র, আইজিপি, র্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা ও দলীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন। দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার ১৬ অক্টোবর মহাসপ্তমী। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন, সপ্তম্যাদি কল্পারম্ভ ও সপ্তমী বিহিত পূজা সম্পন্ন হবে। এদিন দুপুরে দুস্থদের মাঝে বস্ত্র ও ভক্তদের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হবে। তৃতীয় দিন বুধবার ১৭ অক্টোবর মহাষ্টমী পূজা। এদিন সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর মহাষ্টমী কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা সম্পন্ন হবে। অঞ্জলি প্রদান ও মধ্যাহ্নে মহাপ্রসাদ পরিবেশন। বেলা ১১টায় রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রসাদ বিতরণ করা হবে। এরপর দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে সন্ধিপূজা শুরু হবে এবং ১টা ১৯ মিনিটে সম্পন্ন হবে। দুপুরে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হবে। চতুর্থ দিন বৃহস্পতিবার ১৮ অক্টোবর মহানবমী। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও মহানবমী বিহিত পূজা সম্পন্ন হবে। সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আরতি প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পঞ্চম দিন শুক্রবার ১৯ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে। এদিন সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর দশমী বিহিত পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন হবে। বিকেল ৩টায় ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা শুরু হবে। ঢাকা (দক্ষিণ) সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বিজয়া শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন। এর আগে দুপুর ১২টায় ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি রয়েছে।

