ভালো-মন্দের চার সাক্ষী

0
160

আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, আমাদের উঠা-বসা, চলা-ফেরা সবকিছুর ভালো-মন্দের থাকছে চারটি সাক্ষী। আমরা যেখানেই থাকি; আলোতে বা আঁধারে, জনসমাবেশে বা লোকচক্ষুর অন্তরালে, দিনে কিবা রাতে, সকালে কি সন্ধ্যায়, সব সময়ই আমরা চারটি সাক্ষীর আওতাভুক্ত। কোনো কথা বা কোনো কাজ যত গোপনেই করি না কেন, চারটি সাক্ষী থেকে আমরা তা গোপন করতে পারি না।

Advertisement

তারপরও কীভাবে আমরা নাফরমানীর পথে পা বাড়াই! প্রথম সাক্ষী : যমীন প্রথম সাক্ষী হল এই যমীন; আমাদের পায়ের নিচের মাটি, পায়ের নিচের আশ্রয়। প্রতিটি মুহূর্তে আমরা যার উপর অবস্থান করছি, চলা-ফেরা করছি, আহার গ্রহণ করছি, নিদ্রা যাচ্ছি। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের দান করছেন আমাদের রিযিক; হাজার রকমের ফল-ফসল, যা খেয়ে আমরা জীবন ধারণ করছি। প্রতিটি মুহূর্তে আমরা যার মুখাপেক্ষী।

যার গর্ভ হবে আমাদের শেষ ঠিকানা। এই যমীন আল্লাহ তাআলার অনেক বড় একটি নিআমত। কিন্তু…! কিন্তু কখনো আমরা ভুলে যাই এই নিআমতের কথা, এই নিআমতের যিনি মালিক তাঁর কথা। আমরা লিপ্ত হয়ে পড়ি নাফরমানিতে, এই যমীনের পৃষ্ঠে, যমীনের রবের নাফরমানিতে। যমীনের সহ্য হয় না। কিন্তু তার রবের হুকুমে নীরবে সে বহন করে চলে আমার মত পাপীকে।

আমাকে সে গিলে ফেলে না। আল্লাহ নাফরমান বান্দাকে সতর্ক করে বলছেন, যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের সহ যমীন ধসিয়ে দেয়া থেকে কি তোমরা নিরাপদ হয়ে গেছ, অতঃপর আকস্মিকভাবে তা থর থর করে কাঁপতে থাকবে? [সূরা আল-মুলক আয়াত ১৬] যেমন তিনি কারূনকে ভূগর্ভে ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি আমাদেরকেও ধ্বসিয়ে দিতে পারেন। হাঁ, কোনো মানুষ জানে না আমার পাপের কথা।

যমীন গিলে ফেলে না আমাকে। তবে…! তবে সে সাক্ষী হয়ে থাকে আমার নাফরমানির। তার সাক্ষী হওয়ার ব্যাপারে আমি উদাসীন, কিন্তু সে উদাসীন নয়। সে সব বলে দিবে, তার রব যেদিন তাকে বলার অনুমতি দিবেন। হে আমার রব, আমি সাক্ষী। তোমার এই বান্দা তোমার হাজারো নিআমত ভোগ করে, আমার পৃষ্ঠে অবস্থান করে, অমুক পাপ করেছিল, অমুক দিন করেছিল, অমুক সময় করেছিল।

আমি তার সাক্ষী হে আল্লাহ! যমীনের এই সাক্ষী হওয়ার বর্ণনা আল কুরআনুল কারীমে এভাবে এসেছে – সেদিন যমীন তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, [সূরা আল-যিলযাল আয়াত ৪] তেমনিভাবে এই যমীন আমার সকল ভাল কাজের সাক্ষী হবে। যমীনের যে অংশে যে ভাল কাজ আমি করব, তা আল্লাহর দরবারে আমার ঐ ভাল কাজের সাক্ষী হবে। সে সাক্ষী দেবে; হে আল্লাহ তোমার অমুক বান্দা, অমুক দিন, অমুক সময় এই ভাল কাজ করেছিল, আমি তার সাক্ষাৎ-সাক্ষী।

দ্বিতীয় সাক্ষী : ফিরিশতা (ও তাদের লিপিবদ্ধ আমলনামা) দ্বিতীয় সাক্ষী হল ফিরিশতা। আমাদের অমলনামা লিপিবদ্ধের কাজে নিয়োজিত ফিরিশতা । আমরা যা ভাল কাজ করি তাঁরা তা লিপিবদ্ধ করেন। আমরা যা মন্দ কাজ করি তাঁরা তাও লিপিবদ্ধ করেন। তাঁরা তৈরি করেন এমন এক আমলনামা যা কোনো ছোট আমলও ছাড়ে না, কোনো বড় আমলও বাদ দেয় না।

যে আমলনামা কিয়ামতের দিন আমাদের সামনে মেলে ধরা হবে। আমরা সেদিন স্বচক্ষে তা দেখতে পাব। তাঁরা সম্মানিত ফিরিশতা, তাঁরা আমাদের অমলনামা লিপিবদ্ধ করছেন। সকালে সন্ধ্যায়, দিনে রাতে, সদা সর্বদা। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, নিশ্চয় তোমাদের উপর সংরক্ষকগণ রয়েছে। সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানে, যা তোমরা কর।

নিশ্চয় সৎকর্মপরায়ণরা থাকবে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে। আর নিশ্চয় অন্যায়কারীরা থাকবে প্রজ্জ্বলিত আগুনে। তারা সেখানে প্রবেশ করবে প্রতিদান দিবসে। [সূরা আল-ইনফিতার আয়াত ১০-১৫] আমরা যা প্রকাশ্যে করি যা গোপনে করি, দিনের আলোয় করি বা রাতের অন্ধকারে করি, সব আল্লাহ জানেন।

সাথে সাথে তাঁর ফিরিশতাগণও তা লিপিবদ্ধ করছেন। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, না কি তারা মনে করে, আমি তাদের গোপনীয় বিষয় ও নিভৃত সলাপরামর্শ শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ, আর আমার ফেরেশতাগণ তাদের কাছে থেকে লিখছে। [সূরা আয-যুখরুফ আয়াত ৮০] আমি যতদিন বেঁচে থাকব, যত আমল করব, সব ফিরিশতারা লিপিবদ্ধ করতে থাকবেন।

যেদিন আমি ইন্তেকাল করব সেদিন তাদের এই আমলনামা লেখা শেষ হবে। তবে হাঁ, আমার কিছু আমলের সাওয়াব চলতে থাকবে এবং এই আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। নেক আমল বা বদ আমল। ‘সাওয়াবে জারিয়া’ বা ‘গুনাহে জারিয়া’। আমি যদি এমন কোনো ভাল আমল করি যার ফলাফল চলমান, তাহলে যতদিন তা চলতে থাকবে আমার আমল করার শক্তি ও সুযোগ ফুরিয়ে যাবার পরও ঐ আমলের সাওয়াব যুক্ত হতে থাকবে আমার আমলনামায়।

যে ফলাফল দেখে আমি কিয়ামতের দিন বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলব, এত আমল আমি কবে করলাম? আমার আমলনামার ভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ হল কী করে? হাঁ, এমনই হবে আমার আমলনামা যদি রেখে যাই কোনো নেক সন্তান বা নেক আলেম সন্তান। সে যত ভাল কাজ করবে তার সাওয়াবের ভাগ যুক্ত হবে আমার আমলনমায়। কিন্তু…! কিন্তু আমি যদি এমন কোনো বদ আমল করি যার পাপ চলমান।

তাহলে আমার আর রক্ষা নেই। আমার মত হতভাগা আর কেউ নেই। সুতরাং এখন থেকেই সাবধান! খুবই সাবধান!! আমি নিজেকে মুক্ত করব, এখনই মুক্ত করব; যদি আমি এমন কোনো কাজ করে থাকি। আমার সন্তানকে যদি আমি খারাপ কাজ শিখিয়ে থাকি যার কারণে তার গুনাহ হবে, আমি বেঁচে থাকতে তো অবশ্যই, মরে যাওয়ার পরও আমার এ গুনাহে জারিয়া আমার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে (নাউযুবিল্লাহ)।

তা আমাকে ভোগাবে কবরে, হাশরে, মিযানে, পুলসিরাতে। এভাবে চলমান গুনাহের যত পথ আছে আমি যদি তার কোনোটা অবলম্বন করি, তা আমার গুনাহের বোঝাকে করবে বিশাল, আরো বিশাল। কোন নির্বোধ আছে যে এপথ অবলম্বন করবে। আল্লাহ হেফাযত করুন।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ যদি হিদায়াতের পথে আহবান করে তাহলে সে তার অনুসারীর সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে, তবে অনুসরণকারীদের সাওয়াব থেকে মোটেও কম করা হবে না।

আর বিপথের দিকে আহবানকারী ব্যক্তি তার অনুসারীদের পাপের সমপরিমাণ পাপের অংশীদার হবে, তবে তাদের (অনুসরণকারীদের) পাপ থেকে মোটেই কমানো হবে না। [সূনান আত তিরমিজী ২৬৭৪] এভাবে পাপের বোঝা ভারি হবে বা পুণ্যের। তারপর কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমার আমলনামা বের করে দিয়ে দিবেন আমার হতে। মহান আল্লাহ তা’

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here