নিরাপদ সড়কের দাবিতে চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে নিরাপত্তার অজুহাতে অঘোষিতভাবে গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। ৯ দফা দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে নগরের বিভিন্ন সড়কে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। কিন্তু চালকদের লাইসেন্স না থাকার পাশাপাশি বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনেক গাড়ি তিন দিন ধরে সড়কে নেই।
শনিবার গাড়ির মালিক-চালকরা গণপরিবহন চলাচল অনেকটা বন্ধ করে দেওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। তবে সন্ধ্যার পর কিছু গাড়ি বিভিন্ন সড়কে নামলেও দুর্ভোগ কমেনি। এ কারণে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরা মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। শনিবার নগরের বিভিন্ন সড়ক-উপসড়ক ঘুরে দেখা যায়, পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠনগুলো সকাল ১০টার পর থেকে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখায় চরম দুর্ভোগের শিকার হন হাজার হাজার যাত্রী। স্থবিরতা দেখা দেয় নগরজীবনে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা সকাল থেকে নগরের নিউমার্কেট মোড়, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, অক্সিজেন, ওয়াসা মোড়, চকবাজার, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্লোগান দেয়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের এলাকার সড়ক থেকে শিক্ষার্থীরা সরে গিয়ে ওয়াসা মোড় এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে তারা অ্যাম্বুলেন্সসহ যাত্রীবাহী যেসব যানবাহনের কাগজপত্র ঠিক আছে সেগুলোকে ছেড়ে দেয়। আর যেসব গাড়ির কাগজপত্র বৈধ নেই সেগুলোর চাবি রেখে দেয়। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন তা অবশ্যই ভালো কাজ। সাধারণ জনগণের পাশাপাশি সরকারও তাদের যৌক্তিক দাবির প্রতি একমত। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে নিরাপদ সড়কের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যা অতীতে অন্য কোনো সরকার করেনি। নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবার থেকে বলা হয়েছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যেতে। এতো কিছুর পরও শিক্ষার্থীরা রাজপথে কেন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ এদিকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে তাদের সঙ্গে কিছু বহিরাগতদের দেখা গেছে। বিকেলে নগরের কাজির দেউড়ি এলাকায় অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের মধ্যে দেখা গেছে এক যুবক সিগারেট টানছে। ওই সময় স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হলে তাকে কোন স্কুলের ছাত্র জানতে চাওয়া হলে সে জানায়, মুসলিম স্কুলের। উপস্থিত ওই স্কুলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন ছাত্র শনাক্ত করে সিগারেট টানা যুবকটি ছাত্র নয়। সে বহিরাগত। পরে ওই যুবক সেখান থেকে সরে যায়। শনিবার অপ্রীতিকর ঘটনার আশংকায় এবং সড়কে নিরাপত্তায় ছিল মোড়ে মোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের সামনেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় ছিল। জিইসি মোড়ে গণপরিবহনের অপেক্ষায় থাকা মো. সোহেল নামে এক যুবক বলেন, ‘বারিকবিল্ডিং যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। এক ঘণ্টা হবে কোনো বাস-মিনিবাস এমনকি টেম্পোও পাচ্ছি না। সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া বেশি চাচ্ছে।’ ওয়াসার মোড়ে গাড়ি না পেয়ে হেঁটে জিইসি মোড়ে আসা রহিম উদ্দিন বলেন, ‘আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোনো গাড়ি না পাওয়ায় হেঁটে এসেছি। এখান থেকে মুরাদপুর যাব। বাস পাচ্ছি না। কিছুক্ষণ দেখি না পেলে হেঁটে চলে যাব।’ এভাবে গণপরিবহন সংকটে নগরের মুরাদপুর, চকবাজার, দুই নম্বর গেট, কালুরঘাট, আন্দরকিল্লা, নিউমার্কেট, কাজির দেউড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। এছাড়া দূরপাল্লার বাস কাউন্টার বন্ধ ছিল। পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করা হয়নি জানিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পূর্বাঞ্চলীয় সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘নিরাপত্তার অভাবে হয়তো চালকরা গাড়ি চালাচ্ছেন না!’ চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী মঞ্জু বলেন, ‘সড়কে গাড়ি চলাচলের নিরাপত্তা নেই। তাই মালিকরা ভয় পাচ্ছেন গাড়ি নামাতে। চালকরাও গাড়ি চালাতে আগ্রহী নয়।’ নোয়াখালী থেকে সামসুল হাসান মিরন জানান : শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল শেষে জেলা শহরের প্রধান সড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এ সময়ে তারা বিভিন্ন যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করে। শহর থেকে দূরপাল্লার অধিকাংশ যানবাহন দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ ছিল। সকাল ১১টার দিকে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা জেলা শহর মাইজদীতে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে শিক্ষার্থীরা শহরের কোর্টবিল্ডিং মোড়ে প্রধান সড়কে অবস্থান নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করে। এ সময় শহরে ছোট যানবাহন চলাচল করলেও দূরপাল্লার গাড়ি চলেনি। সমাবেশের পর শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ মিছিল করে স্থান ত্যাগ করে। এদিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয়েছে যথারীতি। তবে কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় সড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সুধারাম থানার ওসি মো. সাহেদ উদ্দিন জানান, শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বিক্ষোভ করলেও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর কিছু করেনি। দূরপাল্লার যানবাহন ছাড়া সকল যানবাহনই চলাচল করেছে। শহরের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে। ফেনী থেকে আসাদুজ্জামান দারা জানান : ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ স্লোগানে চলমান আন্দোলনে একাত্ম হয়েছে ফেনীর শিক্ষার্থীরাও। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মুহুর্মুহু স্লোগানে ফেনীর প্রধান সড়ক ট্রাঙ্ক রোড ছিল মুখর। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করে। এ সময় তাদেরকে বিভিন্ন যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করতে দেখা যায়। তবে বড় রকমের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মিছিলের একটি বড় অংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপালে গিয়ে শিক্ষার্থীরা কিছু সময় অবস্থান করে। চকরিয়া (কক্সবাজার) থেকে ছোটন কান্তি নাথ জানান : নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে প্রচারে নেমেছেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান। তিনি সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের তথ্যসম্বলিত লিফলেট বিতরণসহ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত ইউএনও সচেতনতামূলক এমন প্রচার চালান। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার বেশ কিছু অংশে উপজেলা স্কাউট ও আনসার-ভিডিপি সদস্যদের নিয়ে চলাচলরত যানবাহনের চালক-হেলপারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেন তিনি। ইউএনওর এই ব্যতিক্রমী প্রচার দেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষ মুগ্ধ হয়েছেন। শনিবার উপজেলার দক্ষিণাংশের খুটাখালী ইউনিয়নের কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতন, ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ডুলাহাজারা কলেজ, ডুলাহাজারা উচ্চ বিদ্যালয়, মালুমঘাট আইডিয়াল স্কুল, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের রসিদ আহমদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় ও লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের চকরিয়া কলেজে যান ইউএনও। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করেন, কারো পাতা ফাঁদে পা দিয়ে অযথা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করতে। ইউএনও শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। এ সময় ইউএনওর সঙ্গে ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী, ডুলাহাজারা কলেজের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, রসিদ আহমদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন, কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক নুরুল কবিরসহ স্থানীয় চেয়ারম্যান-জনপ্রতিনিধিরা। এ প্রসঙ্গে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, ‘যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মহাসড়কের পাশে রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের সামনে এখন থেকে তিনজন করে গ্রাম পুলিশ দায়িত্ব পালন করবেন। যাতে কোনো শিক্ষার্থী সড়কে দুর্ঘটনার শিকার না হয়। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ ডুলাহাজারা কলেজ অধ্যক্ষ ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চকরিয়ার সাবেক সভাপতি ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারাদেশে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বুঝে না বুঝে যেভাবে সড়কে নেমে পড়েছে তা সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে।’

