কুয়াকাটা প্রতিনিধি: পর্যটন নগরী কুয়াকাটাকে নিরাপদ আশ্রয় স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে অপরাধীরা। আবাসিক হোটেলে হত্যা,ধর্ষণ,আত্মহত্যা,দেহ ব্যবসা,মাদক বানিজ্যসহ নানা ধরনের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। অপরাধীরা কুয়াকাটাকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। নি¤œ শ্রেনীর আবাসিক হোটেল গুলোতে নিয়ম কানুন না মেনে গেষ্ট রাখার কারনে অপরাধ সংগঠিত করে সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। প্রতিনিয়ত নানা অপরাধ সংগঠিত হওয়ায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
পুলিশ সুত্রে জানা গেছে,২০১৮ই সালে ২৩ সেপ্টেম্বর কুয়াকাটার আল মদিনা হোটেলে ঢাকার আশুলিয়ার কান্তা বিউটি পার্লারের মালিক মার্জিয়া আকতার কান্তাকে স্বামী ও দেবর হত্যা করে পালিয়ে যায়। হোটেলের মালিক কান্তার লাশ সাগরে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় কান্তার বাবা ২০১৯ইং সালের ফ্রেরুয়ারীতে নরসিংদীতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এঘটনায় স্বামী দেবর ও হোটেলের দুই মালিক আনোয়ার এবং দেলোয়ারকে পিবিআই গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
গত ১৭ই আগষ্ট আবাসিক হোটেল সাগর’র কক্ষে রাঙ্গাবালীর মাদ্রাসা ছাত্রীকে গন ধর্ষণের অভিযোগে ১৩ সেপ্টেম্বর ওই ধর্ষিতার বাবা বাদী হয়ে রাঙ্গাবালী থানায় অপহরন ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। গত ২৪ আগষ্ট সাগর হোটেলে কক্ষে পটুয়াখালীর লাউকাঠি ইউনিয়নের মিঠাখালী গ্রামের শিশু মামাতো ভাই সহ দুই যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এঘটনায় মোঃ রুবেল (২০) নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। বিশ্বাস সী প্যালেসে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর লিঙ্গ কর্তনেল মত ঘটনা ঘটেছে।
আবাসিক হোটেল রাজু ও সাগর নীড় হোটেলে আমতলীর স্কুল ছাত্রী গনধর্ষণের ঘটনায় ওই স্কুল ছাত্রীর মা গত ২৫ আগষ্ট আমতলী থানায় অপহরন ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। এ ঘটনায় দুই ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ৪সেপ্টেম্বর মৎস্য ব্যবসায়ী ইউসুফ কোম্পানীর মালিকানাধীণ আবাসিক হোটেল পাচঁতারা থেকে সরিসূপ জাতীয় বন্য প্রানী তক্ষকসহ এক পাচারকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে পাচঁতারা হোটেলে দেহ ব্যবসা,মাদক বেচাকেনাসহ নানা অপরাধ সংগঠিত হয়ে আসছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েলের মালিকাণাধীন ভাড়াটিয়া আবাসিক হোটেল ঝিনুক ডাকবাংলো থেকে পতিতা,খদ্দের ও হোটেল ম্যানেজারসহ পাচঁজনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মহিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। শিক্ষক গোলাম মোস্তফার মালিকানাধীণ হলিডে ইন হোটেলে গেীরনদীর সংখ্যালঘু এক মেয়েকে বিয়ের প্রলোভনে হোটেল কক্ষে হত্যা করে পালিয়ে যায় নির্মাণ শ্রমিক প্রেমিক। পায়রা আবাসিক হোটেলে বান্ধবীকে নিয়ে বেড়াতে এসে অতিরিক্ত মাদক সেবনে খুলনার এক যুবকের মুত্যু হয়।
অপরদিকে সান ফ্লাওয়ার হোটেলের গেষ্ট সাতক্ষীরা শ্যামনগর এলাকার পর্যটক মোবারক হোসেন (৪৫) লেম্বুর বনের জঙ্গলে আত্মহত্যা করে। এর আগেও লেম্বুর বনে নাম পরিচয়হীন এক পর্যটকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কুয়াকাটা সৈকতের গঙ্গামতি রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকা থেকে এক কলেজ ছাত্রীর লাশ এবং গঙ্গামতির চর থেকে গর্ভবতী এক নারীর লাশ উদ্ধার করে মহিপুর থানা পুলিশ।
এসব অপরাধ জনিত ঘটনা ও ঘটনার সাথে জড়িত কয়েকটি ঘটনা উম্মোচিত হলেও বেশিরভাগ অপরাধ এবং অপরাধের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে নি¤œ ও মধ্যম শ্রেণীর আবাসিক হোটেল গুলোতে দেহ ব্যবসা,মাদক পাচার,হত্যা গুমসহ নানা অপরাধ জনিত কাজ ঘটলেও পুলিশের তদারকির অভাবে বন্ধ হচ্ছে না এসব অপরাধমূলক কার্যকলাপ।
কুয়াকাটায় প্রায় শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব আবাসিক হোটেলের মধ্যে ১৫-২০টি আবাসিক হোটেলের জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স রয়েছে। বাকি আবাসিক হোটেল গুলো লাইসেন্স বিহীন। লাইসেন্স বিহীন আবাসিক হোটেল গুলোকে লাইসেন্স করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হলেও গুরুত্ব দিচ্ছে না মালিকরা।
এছাড়াও নামে বেনামে বাসা বাড়ি কটেজ রয়েছে একাধিক। নিন্মমানের আবাসিক হোটেল গুলোতে দেহ ব্যবসা.মাদক বানিজ্য সহ নানা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। হোটেল রুমে গেষ্ট রাখার ক্ষেত্রে জেলা পুলিশের দেয়া নির্দেশনা মানছে না। বিভিন্ন বাসা বাড়িতে ভাড়া দেয়া হচ্ছে দেহ ব্যবসায়ীদের। বীচে ভাসমান পতিতাদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। আর্থিকভাবে লাভবান হবার জন্য অনেক হোটেলের বয় ম্যানেজারা মালিকের অগোচরে লোভে পরে অসামাজিক ব্যবসা চালিয়ে আসছে। ট্যুরিষ্ট পুলিশ ও থানা পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এদের দু’য়েকজনকে আটক করলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেড়িয়ে এসে আবার জড়িয়ে পড়ছে অসামাজিক কাজের সাথে। অভিযোগ রয়েছে পুলিশের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে এদের সখ্যতা রয়েছে। যার ফলে এরা নানা ধরনের অপরাধ সংগঠিত করতে সাহস পাচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত আবাসিক হোটেল গুলোতে পুলিশী অভিযান চালাতে গেলে তখন হোটেল কর্তৃপক্ষ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পর্যটক হয়রানী করছে বলে অহেতুক অভিযোগ করছেন। যার ফলে অনেক সময় অসামাজিক কার্যকলাপ চললেও পুলিশ এড়িয়ে যায়।
এ বিষয়ে কথা হয় কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ মোতালেব শরীফ এর সাথে। তিনি বলেন,জেলা পুলিশের নির্দেশনা মেনে তারা আবাসিক হোটেল পরিচালনা করছেন। হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের আওতাভূক্ত কোন হোটেল অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত নয় বলে তিনি দাবী করেন। তিনি আরও বলেন এসাসিয়েশনের আওতাভূক্ত নয় এমন কয়েকটি আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার বিষয়ে তাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে। এবিষয়ে আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়ে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন নেতৃবৃন্দ।
এ ব্যাপারে মহিপুর থানার অফিসার্স ইনচার্জ মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত আবাসিক হোটেল সাগর নীড়,ঝিনুক ডাকবাংলোর বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেসকল আবাসিক হোটেল অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত রয়েছে তাদের চিহ্নিত করণে গোয়েন্দা নজরদারী রয়েছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে হোটেলে গেষ্ট রাখার ক্ষেত্রে নিয়মাবলী সম্মিলিত তথ্য সিট দেয়া হয়েছে। নিয়মাবলী অমান্য করে যারা গেষ্ট রাখবে এবং অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি। ইতোমধ্যে হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সাথে কাউন্সিল করে এবিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

