বিদেশ ফেরত রূপসীদের কান্নার শোনবে কে?

0
713

অবি ডেস্ক: মেয়েটির বয়স হবে বড়জোর ১৫। জর্ডান থেকে আজ (রোববার) ভোরে দেশে ফিরেছে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে। বিমানবন্দরের আর্মড পুলিশ দলের (এপিবিএন) এক নারী সদস্য মেয়েটিকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। পাশে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের এক কর্মকর্তা। মেয়েটি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ব্র্যাকের একজন নারী স্বেচ্ছাসেবী মেয়েটির পাশে। যোগাযোগ করা হলো মেয়েটির ভাইয়ের সঙ্গে। অপেক্ষা এখন তার জন্য।

Advertisement

 

ততক্ষণে জানা গেল, গৃহকর্মী হিসেবে তিন বছর আগে জর্ডানে গিয়েছিল মেয়েটি। পাসপোর্ট বলছে, মেয়েটির নাম রূপসী আক্তার। বাড়ি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানায়। পাসপোর্ট অনুযায়ী, মেয়েটির জন্ম ২০ এপ্রিল ১৯৯০। দেখলেই বোঝা যায় তথ্যটি বানানো। কারণ মেয়েটির বয়স কোনভাবেই ১৪ থেকে ১৫ এর বেশি নয়। আচ্ছা, তিন বছর আগে যখন বিদেশে গেল তখন তার বয়স কত ছিল? বড়জোর ১২। কী করে গেল মেয়েটি? পাসপোর্ট অফিস, পুলিশ, বিমানবন্দর কারও মনে প্রশ্ন জাগলো না?

আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী হিসেবে ২৫ বছরের নিচে কারও বিদেশে যাওয়ার কথা নয়। গত বছর বিদেশ থেকে ফিরেছেন দেড় হাজার নারী। এদের মধ্যে অনেককে আমরা পেয়েছি যাদের বয়স ১৮ হয়নি। কী করে গেল তারা?

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে নারী গৃহকর্মীরা দেশে ফিরে আসছেন। গত তিন বছরে অন্তত আট হাজার নারী ফেরত এসেছেন। ফিরে আসা এই নারীদের অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ি বেতন পাননি। কোন ছুটি নেই। সারাদিন কাজ। জোটে শারিরীক নির্যাতন। অনেকে আবার যৌন নিপীড়নের শিকার। এদের মধ্যে অন্তত ১৮ জন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। অন্তত পাঁচজনকে আমরা পেয়েছি অন্তঃসত্ত্বা অবস্তায়।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকারি সব দপ্তরের লোকজন রোজ এসব দেখেন। অস্বীকারের প্রবণতার এই দেশে এপিবিএনের কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা এই মেয়েদের জন্য যে মমতা দেখান তাতে মাঝে মধ্যে চোখ ভিজে যায়। এপিবিএন ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় রোজ আমরা ফিরে আসা মেয়েদের পাশে থাকার চেষ্টা করি। শুনি তাদের আর্তনাদ।

মাঝে মধ্যে ভাবি, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাত লাখ নারী কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে কতজন ফেরত এসেছেন সেই তথ্য সঠিকভাবে কারও কাছে নেই। অথচ রোজ কেউ না কেউ ফিরছে। কেউ ফিরছে বেতন না পেয়ে, কেউ ফিরছে গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে। কাউকে পিটিয়ে হাত পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আয়রন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শরীর। প্রতিবাদ করায় কোন কোন নারীর চুল টেনে টেনে তুলে ফেলা হয়েছে। নির্যাতনের কারণে চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছেন এমন ঘটনাও আছে।

গতবছর ফেরত আসা দেড়হাজার নারীর কান্না আমরা শুনেছি। এই নারীদের অনেকের বাড়িতে ফেরার মতো পরিস্থিতি থাকে না। ফেরত আসার খবর পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় জানতেও পারেন না। আর সবার মতো নয়, বিমানবন্দরে তারা ফেরেন এক কাপড়ে। তাদের কান্নায় থমকে যায় সবকিছু। তারা যেসব কষ্টের বিবরণ দেন, নির্যাতনের যেসব চিহৃ দেখান সেগুলো সহ্য করা কঠিন।

মেয়েদের বিদেশে পাঠানোর বিপক্ষে আমরা বলছি না। অনেকেই বলেন, বিদেশে যারা যাচ্ছে সব মেয়ে কী খারাপ আছে? নিশ্চয়ই নয়। অনেকে হয়তো ভালোও আছেন। কিন্তু বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমরা চাই, আমাদের একটা মেয়েও নিপীড়নের শিকার হবে না। কারণ একটা মেয়েও যদি কাঁদে আমার কাছে সেটা পুরো বাংলাদেশের কান্না। চলুন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করে এই কান্না বন্ধ করি। প্রশ্ন হলো আর কত নির্যাতন হলে, আর কত মেয়ে ফেরত এলে আমাদের সবার সেই বোধ জাগবে?

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here