বর্ষায় ভয়াবহ দূর্ভোগের শঙ্কা : কর্ণফুলী-চাকতাই দখলের মহোৎসব রুখতে হবে

0
654

মো. এনামুল হক লিটন
বর্ষা অত্যাসন্ন। মৌসুমের কয়েকদফা বৃষ্টিপাতও হয়ে গেছে। গত ৪ এপ্রিলের মাত্র দুই ঘন্টার বৃষ্টিাপাতে নগরবাসী নিদারুন জলাবদ্ধতার দূর্ভোগের সম্মুখিন হয়েছেন। এক কথায় মৌসুমের শুরুর বৃষ্টিপাতে নগরবাসী ভয়াবহ রকমের নাযেহাল হয়েছেন। নগরীর নালা-খালগুলো অবমুক্ত না থাকায় পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্থ হয়ে সামান্য বৃষ্টিপাতে নগরী জলমগ্ন হয়ে পড়া নতুন কিছু নয়। ক্রমশ : বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম তথা সারাদেশের নদী-নালা ও খাল-বিল। কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন শিল্প কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বজ্যে ভয়াবহ দূষণের পাশাপাশি পাহাড়ি পলি-মাটি ময়লা-আর্বজনা আর পলিথিনে ভরাট হয়ে এমনিতেই বিপন্ন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাণস্পন্দন কর্ণফুলী নদী। একইসাথে চলছে অবৈধ দখলেরও মহোৎসব। এছাড়া বানিজ্যিক খাল হিসেবেখ্যাত চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চাক্তাই খালের অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক। অবৈধ দখলদারিত্ব, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং অবাধে আর্বজনা ফেলার কারণে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে এ খালটি। এতে করে খালটি দিয়ে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ এক সময় খালটি দিয়ে কর্ণফুলী নদী হতে বহদ্দারহাট পর্যন্ত বানিজ্যিক পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করত। দখলসহ নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে খালটি দিয়ে এখন নৌ চলাচলতো দূরের কথা জোয়ার-ভাটার পানিও প্রবাহিত হতে পারে না। এতে করে নগরীর নৌ বানিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়ার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুম ছাড়াও শুস্ক মৌসুমেও জোয়ার জনিত জটিলতায় নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দেশের বানিজ্যিক রাজধানিখ্যাত চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসণেও খালটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও চাকতাই খালকে বিলীন হওয়ার হাতথেকে উত্তোরণে কোনো যুগান্তকারি পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে আগামী বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে এমন উৎকন্ঠায় রয়েছে নগরবাসী। এছাড়া জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পেছনে আরো ৩টি কারণ রয়েছে, -তা হলো খাল ও নালা-নর্দমার জায়গা দখল ছাড়াও, নিয়মনীতি না মেনে ভবণ নির্মাণ এবং নগরজুড়ে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ১৯৯৫ সালে প্রণীত মহাপরিকল্পনার এগুলো উত্তোরণের সুপারিশ থাকলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। প্রসঙ্গত, জলাবদ্ধতা মোকাবেলাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরে ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল ৩৬ দফা উন্নয়ন প্রতিশ্র“তির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষনা করেছিলেন, আ জ ম নাছির উদ্দিন। ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন। এরপর ৬ মে শপথ নেন তিঁনি। পরবর্তীতে একই বছরের ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে তিঁনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের ওই সময়টিতে টানা বর্ষণে জলমগ্ন ছিল নগরী। এরপর গত ৩ আগষ্ট নগর ভবণের কে বি আবদুচ ছত্তার মিলনায়তনে চসিকের পরিছন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় জলাবদ্ধতার কারণ কী জানতে চেয়ে সিটি মেয়র সাত কর্মদিবসের মধ্যে নগরীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং তা সমাধানের জন্য প্রস্তাব দিতে পরিছন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। ওই প্রস্তাবে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে বিদ্যমান নালা-নর্দমার সংখ্যা ও ধারণ ক্ষমতা এবং খালের পরিমাণ ও
খালসমূহের অবস্থারও চিত্র তুলে ধরতে বলা হয়। একইসাথে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে কর্মরত পরিছন্ন কর্মিদের জরিপ করে এ তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছিল। বলা বাহুল্য যে, বর্তমানে নালা-খালগুলোর যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা, তাতে বর্ষা মৌসুমতো দূরের কথা সামান্য বৃষ্টিপাতেই বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীতে ১৪৪ কিলোমিটার দৈঘ্যের বড় খাল আছে ১৭টি। এরমধ্যে চাকতাই খাল প্রায় ৬ কিলোমিটার। খালগুলো যথাক্রমে চাকতাই খাল, বির্জাখাল, মির্জা খাল, রাজা খাল, চশমা খাল, নাছির খাল, খন্দকিয়া খাল, খাজির খাল, গয়নাছড়া খাল, মোগলটুলি খাল, বামনশাহী খাল, পাকিজা খাল, কাট্রলি খাল, ত্রিপুরা খাল, ডোম খাল, শীতল ঝরনাছড়া খাল, হিজড়া খাল, মায়া খাল, মহেশখাল, বিবি মরিয়ম খাল, সদরঘাট খাল, রামপুরা খাল ও ডাইভারশন খাল। এছাড়া ৪৮০ কিলোমিটার নালা-নর্দমা রয়েছে নগরীতে। কিন্তু এসব অধিকাংশ নালা-খালের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। ফলে প্রতিবারের বর্ষাতেই নগরবাসীকে জলাবদ্ধতাজনিত অস্বস্তিকর ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অন্যদিকে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসণের সবচাইতে বড় মাধ্যম চাক্তাই খালটি সংস্কারে ইতোপূর্বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ড্রেজিং করাসহ বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও অবৈধ দখলদারদের দৌড়াতœ্য দিনদিন বেড়েই চলেছে। কেউ যেন রুখতে পারছে না তাদের। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বারবার চেষ্টা করেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, অবৈধ দখলদার কর্তৃক কর্ণফুলী ও প্রধান সংযোগ খাল চাকতাই খালসহ অন্যান্য খালের ভরাট, দখল ও দূষন থেকে কোনভাবেই মুক্ত করতে পারছে না। তাদের শেকড় কতটা গভীরে প্রোতিত হলে, পুরো নগরবাসীকে জলাবদ্ধতায় জিম্মি করে নদী-নালা, খাল-বিল দখল বানিজ্যের মহোৎসব চালাতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আর এসব কারণে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে বৈকি। এছাড়া সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসার ৫ বছর মেয়াদি খসড়া মাষ্টারপ্লানে এসব খাল-নালার কোথায় কি পরিমান পলি-মাটি জমেছে তা উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া খালগুলোর কোথায় কি পরিমান সংস্কার কাজ প্রয়োজন তাও ওই মাষ্টার প্লানের খসড়ায় তুলে আনা হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, কর্ণফুলী নদী রক্ষায় ২০১০ সালে ‘হিউম্যান রাইটস্ অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামক একটি মানবাধিকার সংগঠন অবৈধ দখল-দূষণের বিরুদ্ধে আদালতের রিট দায়ের করে, এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত দীর্ঘ শুনানীর শেষে কর্ণফুলী নদী দখল করে অবৈধভাবে নির্মিত সকল অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলাসহ নতুনভাবে যে কোন স্থাপনা নির্মাণের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে রুল জারি করেছিলেন। উচ্চ আদালতের ওই আদেশে কর্ণফুলী নদীর উভয় পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠা (সরকারি ও বেসরকারি) ২ হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা সরানোর কথাই শুধু বলা হয়েছে। একইসাথে রায় পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে দুটি জাতীয় পত্রিকায় স্থাপনা অপসারন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়। কিন্তু নোটিশ প্রদানের ১০ দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা সরাতে বলা হলেও অদ্যবদি উচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। ফলে কর্ণফুলী ও চাকতাই খালসহ নগরীর সকল খালগুলোতে এখন দখল আর দূষণের মহোৎসব চলছে। সংগত কারণে কর্ণফুলী নদী এবং নদীর সকল সংযোগ শাখাগুলোর যতœ, পরিচর্যা ও নাব্যতা সুরক্ষা রক্ষা করা আমাদের রাষ্ট্র, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনগণের নৈতিক দায়িত্বে পড়ে। বিশ্বের সব দেশে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখেই দায়িত্ব পালন করা হয়। প্রয়োজনে বিশেষ অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আমরা এর কোনটিই করি না। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন বারবার প্রচেষ্টা চালিয়েও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহল কর্তৃক কর্ণফুলী ও প্রধান সংযোগ খাল চাকতাই খালের ভরাট, দখল ও দূষন থেকে কোনভাবেই মুক্ত করতে পারছে না। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে এবং নগরবাসীর স্বার্থে পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবনের মাধ্যমে অনতি বিলম্বে নগরীর সকল নালা-খাল দখল করে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা সমূহ উচ্ছেদের পাশাপাশি রুখতে হবে কর্ণফুলী-চাকতাই খালসহ অন্যান্য উপখাল ও নালা-নর্দমা দখলের এই মহোৎসব। এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here