প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযান এবার সাংবাদিকদের দিকে ফোকাস্ ফেলুন

0
770

হাবিবুল্লাহ রানা: সাংবাদিকতা সর্বোৎকৃষ্ট পেশা। এ পেশায় যারা আসেন তারা কিন্তু নির্লোভ, নির্মোহ, সত্যের অনুসন্ধানকারী, সৎ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। নোবেল প্রফেশন বলা হয় জার্নালিজমকে। ১৯৭৩ সালের ৩১ মে  রোববার প্রয়াত সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদের সুপারিশে দৈনিক গণকেন্ঠে আমার সাংবাদিকতায় প্রবেশ। সম্পাদক কবি আল মাহমুদ, চীফ রিপোর্টার মোস্তাফা জাব্বার। তাঁদের সামনে দাঁড়ানো বা দাঁড়িয়ে থেকে রিপোর্ট সম্পর্কে আলোচনা করা এখনকার মতো ছিল না। দৈনিক বঙ্গবার্তার সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ ও বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানীর চাকরি-সুবাদে সান্নিধ্য ও শিক্ষা এবং ১৯৭৪ সালের ৮ জানুয়ারী বংশাল রোডের দৈনিক সংবাদে সম্পাদক আহমেদুল কবির, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বজলুর রহমান, বার্তা সম্পাদক সন্তোষ গুপ্ত, সহকারী সম্পাদক বিনোদ দাশগুপ্ত এবং প্রাক্তন সম্পাদক ও তখনকার দরবার-ই জহুরের লেখক জহুর হোসেন চৌধুরীর সান্নিধ্যে থেকে  সাংবাদিকতার যে পাঠ আমি নিয়েছিলাম, তার সাথে এখনকার সাংবাদিকতার বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করছি বৈ কি! দৈনিক সংবাদের চীফ রিপোর্টার মজিবুর রহমান বাদলের ফ্যাসফ্যাসি দরাজ কন্ঠ, সিটি এডিটর হাসান ভাইয়ের (বেবি মওদুদের স্বামী) হাতে কলমের শিক্ষা এবং সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত ও ঐতিহাসিক কবিতা ‘কালো সূর্যের কালো জোছনার কালো বন্যায়’-এর লেখক দাউদ হায়দারের স্পর্শ আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে তা এখনো আমি ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছি। ১৯৭৪ সালে দৈনিক জনপদের সম্পাদক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সান্নিধ্যও পেয়েছিলাম, শিখেছিলাম অনেক কিছু। ১৯৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ গঠন করলে দৈনিক সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের মধ্যে আমি ৭ নম্বরে সেই দলের একজন হয়ে দস্তখত করেছিলাম।

Advertisement

বার্তা সম্পাদক সন্তোষ দা আমাকে ডেকে বললেন যে, দেশের একমাত্র এই দলের সংক্ষিপ্ত নামকরণ করতে হবে। আধা ঘন্টার ব্যবধানে আমি বাংলাদেশের ‘বা’ কৃষকের ‘ক’ শ্রমিকের ‘শ’ আওয়ামীর ‘আ’ লীগের ‘ল’ চিন্তা করে ‘বাকশাল’ বলে দিলাম দাদাকে। তৎক্ষণাত সন্তোষ দা  তা গ্রহণ করলেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগের সংক্ষিপ্ত রূপ হয়ে গেলো ‘বাকশাল’।

এতো কথা বলার অর্থ হলো, সে আমলে সাংবাদিকতা ছিলো শেখার, কষ্টের, পরিশ্রমের। আর এখন?  সাংবাদিকতা এক সহজ পণ্যে পরিণত হয়েছে। মান-সম্মানের কোন বালাই নেই। সিনিয়র-জুনিয়র মানা হয় না। সবাই যেন কি একটা কিছু হনু রে!

আজ দ:খের সঙ্গে বলতে হয়, অনেক সাংবাদিক এখন অর্থ-বিত্ত-বৈভবের পেছনে ছুটছেন। লেখালেখির ব্যাপারটি তাদের কাছে গৌণ। আমি যেহেতু প্রিন্ট মিডিয়ার, সেহেতু এদিকটার কথাই বলছিমাত্র। আইডেনটিটি কার্ড দরকার আগে। এবং কিছু কিছু পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক টাকার বিনিময়ে দেদারছে আইডি বিক্রির মহোৎসবে মেতে ওঠেন।

১৯৭৫ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধু দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক, ডেইলি বাংলাদেশ অবজারভার ও ডেইলি বাংলাদেশ টাইমস এই চারটি পত্রিকা রেখে আর সব পত্রিকা বন্ধ দিলেন। অনেকের সঙ্গে আমিও বেকার হয়ে গেলাম। বেকার সাংবাদিকদের বঙ্গবন্ধু গণভবনে ডাকলেন। সকলকে সরকারী চাকরি দেবার অঙ্গীকার করে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ‘এই ছোট সাংবাদিক এদিকে আয়।’ কাছে গেলে কাঁধে হাত দিয়ে জাতির মহীরূহ আমাকে বললেন, ‘ঘাবড়াসনে, চাকরি যদ্দিনে দিতে না পারি তোরা বেতন পাবি।’

আগষ্টের ২ বা ৩ তারিখে মূল বেতন ২শ’ ৫০ টাকা সচিবালয় শাখা সোনালী ব্যাংক থেকে তুলেছিলাম। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাঙ্গালী জাতির জীবনে নির্মম ও ভয়াবহ ঘটনা না-ঘটলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ দেশ বহু আগেই উন্নত দেশে পরিণত হতো। ২০৪১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না। আর সাংবাদিকতাও হতো উন্নত, আজকের মতো এতো এতো সাংবাদিক নামের অসাংবাদিকদের ভিড়ে অন্ততঃ আমাদের মতোদের ভিমড়ি খেতে হতো না।

এখন সাংবাদিক মানে কী একটা হনু রে! আমরা ঘঊডঝ মানে NEWS gv‡b N=North, E=East, W=West I S=South অর্থাৎ চতুর্দিকে খুঁজে বেড়াতাম খবরের পর খবর। এগুলো এখনো আছে, তবে বহু সাংবাদিক এখন ঘোরেন বিত্ত-বৈভবের পেছনে। বহু সাংবাদিক ও সাংবাদিক-নেতাদের সম্পর্কে জানি, যারা অঢেল সম্পদ-সম্পত্তির মালিক। তারা যে বেতনে চাকরি করেন, তাতে ওসব হওয়া বা প্রাপ্তির কোন প্রশ্নই আসে না। ঢাকায় দুই-তিন-চার-ছয়-আটটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট-প্লটের মালিক-সাংবাদিকের অভাব নেই। লেখালেখির কদ্দুর জানেন বা করেন জানি না, তবে বৈভব তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে, সেটা জানি। রাজউক থেকে কম দামে একাধিক প্লট নিয়ে বিক্রি করে দেয়া সাংবাদিকদের সংখ্যা হাতেগোণা বলা যাবে না।

আসলে এদের অবৈধ বিত্ত আসে দুইভাবে। প্রথমত: দুর্নীতিবাজদের পকেট কেটে, আবার এই যে বর্তমানের ক্যাসিনো-কান্ড ইত্যাদির মাধ্যমেও আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া সাংবাদিক রয়েছেন। এক্ষেত্রে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার যে, ওই সাংবাদিকরা বলতেই পারেন, যারা আকাম-কুকাম করেন, তাদের কাছ থেকে ‘গ্রহণ করা’ জায়েজের পর্যায়ে পড়ে। আসলে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে খবর না ছেপে ওই ‘গ্রহণ বাণিজ্য’ দুর্নীতিবাজদের উৎসাহিত করে এই কিসিমের সাংবাদিকরাও যে দুর্নীতি করছেন, তা তারা মানতে নারাজ।

দ্বিতীয়তঃ সাংবাদিক নেতা হওয়া। নির্বাচন আসলে এই নেতারা গদি দখলের জন্য উঠেপড়ে লাগেন। নির্বাচন প্রার্থীদের অনেককে দেখেছি বস্তায় বস্তায় টাকা খরচ করতে। এরা আবার নির্বাচিত হওয়ার পর সাধারণ ভোটার-সাংবাদিকদের স্বার্থকে থোড়াই কেয়ার করে স্ব-স্বার্থে আয়-রোজগারের জন্য সময় কাটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সকলেই এ পথের পথিক বলছি না। তবে কেউ কেউ। প্রমাণ আছে।

প্রধানমন্ত্রী এখন যে দুর্দান্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে শুদ্ধি অভিযানে নেমেছেন, দেশ ছাড়িয়ে তা বিশ্বের দেশে দেশে প্রশংসিত হচ্ছে, হয়েছে। এধারা অব্যাহত থাকবে বলেই জানি। নিজের দল ও সহযোগী সংগঠন দিয়ে এই শুদ্ধি শুরু করে শেখ হাসিনা বাপের-বেটির পরিচয় দিয়েছেন। শুনলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্টাফদেরকে অভিযানের আওতায় নিয়ে আসতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা।

শ্রদ্ধেয় আপাকে অনুরোধ করবো, ‘আপনার দুর্নীতিবিরোধী ফোকাস্টা একটু সাংবাদিক সমাজের দিকে ঘুরিয়ে দিন।’ এই সেক্টর কলুষমুক্ত হলে, রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। আমারা চাই, ভুঁইফোড় সাংবাদিকদেরকেও শুদ্ধি অভিযানের আওতায় আনা হোক। জানি, কাকের মাংস কাকে নাকি খায় না। তারপরও একজন প্রবীণ সাংবাদিক হয়ে আমাদের মধ্যে শুদ্ধি চাচ্ছি, কম দুঃখে নয়।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here