প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হল শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসবে বৃষ্টির প্রভাব পড়েনি

0
861

প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শনিবার শেষ হল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।

Advertisement

শনিবার বিকাল ৫টা ১৯ মিনিট থেকে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। শুধু সদরঘাটে প্রায় আড়াইশ’ প্রতিমা বিসর্জন করা হয়। রাস্তার দু’পাশ আর সারিবদ্ধ ট্রাকে ছিল প্রতিমা। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
দুপুর দেড়টা থেকেই মূষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। এর আগে সকাল ১০টা থেকেই রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পাশের রাস্তায় জড়ো হতে থাকে প্রতিমাগুলো। বেলা সোয়া ১টার দিকে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে শোভাযাত্রা শুরু হয়। এ সময় ৫ শতাধিক ট্রাক প্রতিমা নিয়ে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়। ঢাকেশ্বরী থেকে শুরু করে প্রতিমা যাত্রাটি শহীদ মিনার, হাইকোর্ট, পুলিশ হেড কোয়ার্টার, গোলাপ শাহ মাজার, কোর্ট এলাকা হয়ে সদরঘাট পৌঁছে। রাস্তায়, বিভিন্ন ভবনে পুলিশ ছিল সতর্কাবস্থায়। রাস্তার পাশে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
শোভাযাত্রা শুরুর আগে পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামল কুমার রায় বলেন, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন নৌকায় চড়ে। যার ফল হচ্ছে অতি বৃষ্টি ও শস্যবৃদ্ধি। আর স্বর্গলোকে বিদায় নেবেন ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে। যার ফল হচ্ছে রোগ, ব্যাধি বাড়বে ও ফসল নষ্ট হবে। তবে ভক্তদের বিশ্বাস, ফলাফল যাই হোক মা মঙ্গলময়ী, আনন্দময়ী। তিনি জগতের কল্যাণ করেন। তিনি সন্তানের কল্যাণই করবেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা যে ক’দিন পিতৃগৃহে ছিলেন, ঢোলের বাদ্য সে ক’দিন ভক্তদের মনে ভক্তি আর আনন্দ মূর্ছনা দু-ই জাগিয়েছে। শনিবার সকালে সব মণ্ডপে দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন করা হয়। শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও বিসর্জনের আগে রাজধানীর মণ্ডপে মণ্ডপে দুপুর পর্যন্ত চলে আবির খেলা আর আনন্দ উৎসব।
প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গন থেকে কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়। দুপুরে পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য এ বিজয়া শোভাযাত্রা। বিজয়া শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুর গড়িয়ে যেতেই ভক্তরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হতে শুরু করেন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানের পূজামণ্ডপ থেকে আসা প্রতিমা নিয়ে ট্রাকগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায় রাস্তায়। প্রতিটি ট্রাকে দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক ও গণেশের প্রতিমাও ছিল। সেই সঙ্গে উৎফুল্ল ছিল বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। তারা নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রাকে আরও বর্ণিল করে তোলেন। সেখান থেকে সম্মিলিত বাদ্যি-বাজনা, মন্ত্রচারণ ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শোভাযাত্রা। অধিকাংশ মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হলেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেয়া হয়। কিন্তু পূজার কাজে ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেয়া হয়। যাত্রাপথে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সংশ্লি­ষ্ট সড়কগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখে। বিপুলসংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব সদস্যরাও মাঠে ছিলেন। এ সময় বুড়িগঙ্গার দুই তীরে হাজারও ভক্ত ও দর্শনার্থী প্রতিমা বিসর্জন দেখতে ভিড় করেন। অনেকে প্রতিমা বিসর্জনের সময় নৌকায় করে নদীতে আনন্দ করেন। এ উপলক্ষে ওয়াইজঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। প্রথা অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জনের পর সেখান থেকে জল এনে (শান্তিজল) মঙ্গলঘটে নিয়ে তা আবার হৃদয়ে ধারণ করা হয়। আগামী বছর আবার এ শান্তিজল হৃদয় থেকে ঘটে, ঘট থেকে প্রতিমায় রেখে পূজা করা হবে। রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যা আরতির পর মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। এরপর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন ও মিষ্টিমুখ করেন।
পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩০ হাজার ৭৭টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। গত বছর ২৯ হাজার ৩৯৫টি মণ্ডপে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। গত বছর রাজধানীতে ৩২৬টি মণ্ডপে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩১টি।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here