প্রকল্পের টাকা হরিলুটের দায়ে ৮ কর্মকর্তার নামে মামলা

0
504

মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন জলাশয় সংস্কার ও পুকুর খননের মাধ্যমে মৎস্য চাষ বৃদ্ধি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা সিন্ডিকেট করে হরিলুটের দায়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ৮ কর্মকর্তার নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বরগুনার বিজ্ঞ সিনিয়র স্পেশাল ট্র্যাইবুনাল-১, আদালতে মামলা নং-০১/২০২১। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-১৯৪৭ সালের  ২নং আইনের ৫(২)ধারা তৎসহ দন্ডবিধি-৪০৬/৪১৭/৪২০ ধারায় জনস্বার্থে এই মামলাটি দায়ের করেন তালতলী উপজেলার শারিকখালি ইউনিয়নের দক্ষিণ নলবুনিয়া গ্রামের মৃত আলহাজ্ব আব্দুল করিম তালুকদারের ছেলে মোঃ রাজা মিয়া তালুকদার। মামলায় মৎস্য অধিদপ্তর মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজ, প্রকল্প পরিচালক আলিমুজ্জামান, সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার, বরিশাল বিভাগীয় সহকারি প্রকৌশলী শরিফুদ্দিন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মাহবুব হোসেন, উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা মোঃ কাওসার হোসেন, প্রকল্পের উপকারভোগী ২৫ সদস্য ও সদস্যদের মূল হোতা হাফিজুল হক সিকদারকে আসামি করা হয়।আদালত রাজা মিয়া তালুকদারের অভিযোগ পর্যালোচনা শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা ২০০৭ এর ১৩ বিধি মোতাবেক অভিযোগটি গ্রহণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রেরণের আদেশ দেন এবং পরবর্তী ২৩ মার্চ-২০২২ তারিখের মধ্যে অবহিতকরণ পত্র প্রাপ্তির জন্য দিন ধার্য করেনমামলার এজাহারে রাজা মিয়া তালুকদার বলেন, ১নং আসামী  হাফিজুল হক সিকদার  কৌশলে নিজ খরচে ২-২৬ নং আসামীকে সি.পি.সি (উপকারভোগী) বানিয়ে তালতলী উপজেলায় জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের অধীনে পুকুর ও খাল খনন কাজের নামমাত্র প্রকল্প দেখাইয়া দপ্তরের মহাপরিচালক থেকে শুরু করে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পর্যন্ত সিন্ডিকেট গড়ে প্রকল্পের ৮০ শতাংশ টাকা পরস্পরে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। আর যাদের নামে সি.পি.সি অর্থাৎ উপকার ভোগীদের মাত্র ২০ শতাংশ টাকা প্রদানের মাধ্যমে কাজের শতভাগ বাস্তবায়ন দেখানো হয়।

Advertisement

২০২০-২১ অর্থ বছরে ভালতলী উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নেই জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের মাধমে খাল খনন কাজের স্কীমে মোট ২৭ কোটি টাকার বরাদ্ধ দেয় মৎস্য অধিদপ্তর ।

আসামীরা পরস্পর যোগসাজসে  প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পূর্ণ হইয়াছে মর্মে বিল উত্তোলন করে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করেন। বাস্তবে কাজের কোন বাস্তবায়ন করতে দেখা যায় না। আমি জনস্বার্থে তালতলী উপজেলার প্রতিটি স্কীমের কাজে অনিয়মের ব্যাপারে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজ, প্রকল্প পরিচালক আলিমুজ্জামান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার হোসেন ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন সহ দপ্তর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিকট অভিযোগ দায়ের করি। কিন্তু কোন সুফল পায়নি ।  অথচ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট হওয়ার ক্ষমতাবলে আমাকে হুমকি দেয় , যদি এই ব্যাপারে ফের নতুন করিয়া কোন অভিযোগ দায়ের করি, তাহলে মোবাইল কোর্টে মাধ্যমে সাজা দিয়া আজীবন জেলে রাখিয়া দিবে ।

পরবর্তীতে এসব অনিয়ম অপকর্মের বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রশাসককে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে অবগত করি। তিনিও বিষয়টি আমলে না নিয়ে বরং ১নং আসামীর বাড়িতে এসে ৫১ জন সফরসঙ্গী নিয়ে ভুরিভোজ শেষে পুকুরের বড় বড় মাছ, ঘুঘু পাখি ও অন্যান্য উপঢৌকন নিয়ে ‌চলে যান।

অতঃপর আসামীদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অভিযোগ দায়ের করে কোন প্রকারের সুফল না পেয়ে ২৮ এপ্রিল-২০২১ তারিখ  দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিত  দায়ের করেও কোন সুফল না পেয়ে ১৫সেপ্টেম্বর-২০২১ তারিখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ পূর্বক আদালতে মামলা দায়ের করে ন্যায় বিচারের অপেক্ষা করছি।

মৎস্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ৪শ কোটি টাকার এই প্রকল্পে প্রান্তিক উপকারভোগীর নামে যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহার ৮০শতাংশ টাকা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাগণ ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে যায়। অবশিষ্ট ২০শতাংশ টাকা দিয়ে উপকারভোগীরা নামমাত্র কাজের বাস্তবায়ন করেন। আর এ কারণেই সরকারের বড় বড় প্রকল্প গুলো মুখ থুবরে পড়ে। একটি প্রকল্পের বরাদ্দকৃত টাকার ভাগবাটোয়ারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পিয়ন থেকে শুরু করে মহাপরিচালক সহ তার উপরেও নির্দিষ্ট হারে পৌঁছে যায়। প্রকল্প পরিচালক আলিমুজ্জামান তার দপ্তরে মিস্টার টেনপার্সেন্ট নামেই এখন পরিচিত। তিনি ১০ শতাংশ হারে ঘুষ বা কমিশন বুঝিয়া না পেলে কোন ফাইলেই সই-স্বাক্ষর করেন না। এভাবে বরাদ্দের ৮০শতাংশ টাকা বিভিন্ন টেবিলে ঘুষ বা কমিশন হারে চলে যায়। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ টাকা দিয়ে ঠিকাদার বা উপকারভোগী কতটুকু কাজের বাস্তবায়ন করতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, তালতলী উপজেলায় জলাশয় সংস্কার ও পুকুর খনন প্রকল্পের অধীনে২৭কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হলেও বাস্তবে এসব কাজের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার যেগুলো পাওয়া গেছে তাও নামকাওয়াস্তে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। হাফিজুল হক সিকদার ছেলে এনামুল হক সিকদার প্রকল্পের টাকা বরাদ্দ নিয়ে সরকারি খাল দখল করে বাঁধ দিয়ে শত শত কৃষকের ফসলি জমি নষ্ট করে দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান আইয়ুব আলী জানান, এনামুল হক সিকদার প্রকল্প থেকে যে টাকা বরাদ্দ পেয়েছে তার নামমাত্র কাজ করেছে, একই চিত্র পুরো উপজেলা জুড়ে। কিন্তু এই কাজগুলো জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর পরিচালনা করে থাকে। যখন এসব কাজে দুর্নীতি হয় তখন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের উচিত এগুলো আমলে নিয়ে তদন্ত করে সত্যতা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু বরগুনা জেলা প্রশাসক এসবের কিছুই না করে ৫১জনের সফরসঙ্গী  নিয়ে হাফিজুলের বাড়িতে ভুরিভোজ করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মোঃ জাকির খান বলেন, জলাশয় সংরক্ষণ প্রকল্পের অধীনে তালতলী উপজেলা যতগুলো কাজের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার ১০% বাস্তবায়িত হয় নাই‌। শুধুমাত্র কাগজপত্রে বাস্তবায়ন দেখিয়ে প্রকল্পের টাকাগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন কমিশনারে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে গেছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এখন প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং অপরাধীরা শাস্তি পাবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক আলিমুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই, কে মামলা করেছে, কেন করেছে, আমি এর কিছুই জানিনা। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য নয়। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের মহা পরিচালক কাজী শামস আফরোজ অবসরে চলে যাওয়ায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here