সোনাগাজী থানার ওসিকে বাঁচাতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি ‘আত্মহত্যা’ বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন ফেনীর পুলিশ সুপারও । শুরু থেকেই এ ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা চেষ্টা করেছিল ফেনীর পুলিশ। মামলার এজাহার নিয়েও কূটচাল চালিয়েছিল।
ঘটনার দিন (৬ এপ্রিল) পুলিশ সদর দফতরে মৌখিক মেসেজে এসপি এটাকে আত্মহত্যা বলে মেসেজ দিয়েছিলেন। লিখিত রিপোর্টেও তিনি একই কথা জানিয়েছিলেন। পুলিশ সদর দফতরের তদন্তে তার গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির ঘটনাকে সোনাগাজীর ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন সাজানো নাটক। ৬ এপ্রিল যখন নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়, ওই একই ওসি এটাকে বলেন আত্মহত্যার চেষ্টা। আর ফেনীর এসপি এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার নুসরাতকে রক্ষায় সময় না পেলেও ওসির পক্ষে সাফাই গাইতে সময়ের অভাব হয়নি। তিনি আর ওসি মিলেই হয়তো নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার মামলার এজাহারে নানা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। অধ্যক্ষের নাম বাদ দেওয়ারও চেষ্টা ছিল। ওসিকে বাঁচাতে এসপি ছিলেন মরিয়া। ওসিকে প্রত্যাহার করা হলেও এসপি তাতে নারাজ ছিলেন। তিনি বলেন,‘ প্রত্যাহার নয়, বদলি।’ সূত্র জানায়, নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ফেনীর এসপি এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার ১১ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতর, বিশেষ শাখা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির দফতরে একটি চিঠি পাঠান। তিনি জানান, ঘটনার দিন নুসরাত মাদ্রাসায় যান। এরপর পরীক্ষা হলে তার আসনে ফাইলপত্র রেখে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদের ওপরে বাথরুমের কাছে যান। কিছুক্ষণ পর গায়ে আগুন লাগা অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে আসেন। তখন কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ও মাদ্রাসার কর্মচারীরা আগুন নিভিয়ে ফেলেন। এই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারকে বারবার অনুরোধ করা হলেও তারা মামলা করতে কালক্ষেপণ করেন। পুলিশ নুসরাতের চাচাকে বাদী করে মামলা করতে চায়। তাতে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান আপত্তি জানিয়েছিল। তারা দুইবার এজাহার বদল করেন। এই প্রসঙ্গে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘এসপি চিঠিতে ঘটনাটি যেভাবে বলেছেন, তাতে মনে হচ্ছে, নুসরাত নিজের ইচ্ছাতেই ভবনের ওপরে গেছে। অথচ তাকে পরিকল্পনা করে ডেকে নেওয়া হয়। এছাড়া হাত-পা বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কোনও কথাই উল্লেখ করা হয়নি।’ মূলত সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে রক্ষায় এসপি চিঠি দিয়েছেন অভিযোগ করে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান তদন্ত কমিটির কাছে বলেছেন, ‘২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকে ওসি বলে আসছেন, শ্লীলতাহানির অভিযোগ সাজানো। এমনকি ৬ এপ্রিল তার বোনকে হত্যাচেষ্টার ঘণ্টা দেড়েক আগেও মাদ্রাসার ইংরেজির প্রভাষক আফছারউদ্দীন মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। হত্যাচেষ্টার ৩০ ঘণ্টা পর ওসি বলেছেন, এটা হত্যাচেষ্টা না আত্মহত্যার চেষ্টা, তা তদন্ত করে দেখতে হবে। ৮ এপ্রিল ওসি যে মামলা সাজিয়ে ঢামেকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, সেখানেও তথ্য গোপনের চেষ্টা করেছেন। পরিবারের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত মামলার এজাহার বদল করেছে।’ নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘৬ এপ্রিল রাতে সোনাগাজীর পুলিশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাতের সাক্ষাৎকার নিয়ে পরিবারকে পড়ে শোনায়। কিন্তু, এজাহারে দেখা যায় ঘটনাস্থল লেখা হয়েছে ভুলভাবে। নুসরাতকে হাত-পা বেঁধে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ আসেনি। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আসামির নামও বাদ দেওয়া হয়।’
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় পুলিশের দায়দায়িত্ব খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দফতর গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনায় ফেনীর পুলিশের এডিশনাল এসপি রবিউল ইসলাম, এসআই ইকবালকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিকেএম এনামুল করিমের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ সদর দফতর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন এ বিষয়ে মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) রাতে পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট শাখায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। ডিআইজি রুহুল আমিন বলেন, ‘পুলিশের যা যা করার কথা ছিল, সেটা ঠিকমতো করেছে কি না, সেটা পুলিশ ও নুসরাতের পরিবারসহ স্থানীয়দের জবানবন্দিতে খতিয়ে দেখা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল সদর দফতরে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে, তাদের ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে আমরা সুপারিশ করেছি।’ নুসরাতের বাবা এমএ মুছা বলেন, ‘‘একজন দুঃখী পিতা হিসেবে, ‘নুসরাতের দোষীরা কেউ ছাড় পাবে না’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসের যথাযথ বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’’ নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া ও অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল ফেনীর ওইসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এরপরই অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে ১৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতরের উপ-মহাপরিদর্শক এসএম রুহুল আমিনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য কমিটি করা হয়। কমিটি দুই দফা সরেজমিন এসে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে।
জনপ্রতিনিধিরা যা বলছেন
সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ডে (নুসরাত হত্যা) সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা ও যোগসাজশের যে প্রমাণ পুলিশ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, তাতে আমরা আতঙ্কিত। ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনে থেকে আমরা জানতে পেরেছি, ফেনীর এসপি নুসরাতের অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে আমলে তো নেয়নি, বরং অভিযোগটির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি নুসরাতকে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পরও ওই পুলিশ কর্মকর্তা একে আত্মহত্যার চেষ্টা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মামলা নেওয়ার পরও ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।’ সোনাগাজী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জেডএম কামরুল আনম বলেন, ‘পুলিশ বাহিনী নিজেদের কতটা জনবান্ধব ও জনমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, সেটা তারা নিজেরাই ভেবে দেখতে পারে। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে, অথচ এরইমধ্যে ফেনীর পুলিশ সুপার লিখিতভাবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের পক্ষ নিয়েছেন। সুতরাং পুলিশের এই তদন্ত কতটা কার্যকরী হবে, সে ব্যাপারে আমরা একেবারেই আশ্বস্ত হতে পারছি না।’ফেনী আইনজীবী সমিতি সভাপতি মো. আলী বলেন, ‘শুধু সংশ্লিষ্ট জেলা বা থানা থেকে পুলিশের এসব কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নেওয়াটা কোনও শাস্তি হতে পারে না। এজন্য অনতিবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিতে হবে।’ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে এসপি এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার কোনও কথা বলতে রাজি হননি। প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম (এইচএসসি) পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে যান নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ৪-৫ জন বোরকা পরিহিত ব্যক্তি শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। পরে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যান।

