নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পর এর কোনো প্রভাব পড়েনি বাজারে। চড়া মূল্যে অনেক নিত্যপণ্য বিক্রি হলেও বাজেট পরবর্তীতে এসব পণ্যের দাম কমার কোনো সুখবর নেই। বরং আমদানি করা চালে শুল্ক আরোপ হলে এর প্রভাব কিছুটা বাজারে পড়তে পারে। কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিশ্চিত করতে আমদানি চালে শুল্ক আরোপের কথা বলা হলেও এতে কৃষকের খুব একটা লাভ হবে না। এর সুযোগ নেবে মজুতদাররা।
সরকার নির্ধারিত সময়ে ধান-চাল সংগ্রহ না হওয়ায় মজুতদাররাই এ সুযোগ নেবে। এদিকে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই। মানভেদে কিছু সবজি ও মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে। আর চাল, ডাল, সয়াবিন তেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্য প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে। তবে, চালের দাম বাড়ার শঙ্কায় আছেন ক্রেতারা। চালের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজেট ঘোষণার পর নানা অজুহাত দেখিয়ে ইতিমধ্যে মিলাররা চালের দাম বাড়ানোর ফন্দি করছেন। ঈদকে কেন্দ্র করে চালের দাম কিছুটা বাড়বে বলেও আভাস দিয়েছেন চালের খুচরা ব্যবসায়ীরা। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, ঈদে পরিবহন ও শ্রমিক খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। আর পেলেও পরিবহন ও শ্রমিকদের খরছ অনেক বেড়ে যায়। যে কারণে এর প্রভাব পড়ে চালের দামে। গতকাল রাজধানীর কাওরানবাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার, কাপ্তানবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে বাজেট পরবর্তী বাজারের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজেট নিয়ে তাদের মধ্যে তেমন কোনো উৎসাহ নেই। নিত্যপণ্যের দাম কমলেই তারা খুশি। আর ব্যবসায়ীরাও ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করার তাগিদে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকার পক্ষেই মত দেন। গতকাল মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি ভালো মানের নাজিরশাইল চাল বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা করে। এছাড়া মিনিকেট ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা, বি আর ২৮-৪৫, বি আর ২৯-৪৫ থেকে ৪৮ স্বর্ণা-৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। এখানকার মোহাম্মদ আলী রাইস অ্যান্ড ট্রেডার্সের মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, শুনেছি চালের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। তবে, আমরা আগের দামেই বিক্রি করছি। প্রায় একই কথা বললেন সিয়াম রাইস স্টোরের মুরাদ। তিনি বলেন, পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানলাম চালের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। তবে, এখন পর্যন্ত আগের দামেই বিক্রি করছি। যদি বেশি দামে চাল কিনতে হয় তাহলে হয়তো আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। কাওরানবাজারের কিচেন মার্কেটের চাল ব্যবসায়ী বিজয় বলেন, বাজেট ঘোষণার পর মিলাররা আমাদের ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন যে তারা চালের দাম বাড়াবেন। কিন্তু কেন বাড়াবেন তার কোনো উত্তর নেই। তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে চালের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে পরিবহন সংকট দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়া আড়তে শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য খরছ বেড়ে যাচ্ছে। যে কারণে চালের দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তিনি জানান, প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) নাজিরশাইল চাল গতকাল বিকাল পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা (প্রতি কেজি ৬০ টাকা) পর্যন্ত বিক্রি করেছেন তিনি। আর মিনিকেট বিক্রি করেছেন ২ হাজার ৭শ’ থেকে ২ হাজার ৮শ’ টাকা করে। কাওরানবাজারের কিচেন মার্কেটের মনোহারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, মশুরি ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি, ছোলা, খেসারি ডাল, রসুন, আদা, পিয়াজ প্রায় আগের দামেই বিক্রি করছেন তারা। এর মধ্যে দেশি পিয়াজ ৪০ টাকা, আমদানি করা পিয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা করে বিক্রি করছেন। গত কয়েকদিনে রসুনের দাম কমেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে আমদানি করা চায়না রসুন ৮০ থেকে ৯০ টাকা, আমদানি করা আদা প্রতি কেজি ১শ’ টাকা করে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কাওরানবাজারের কিচেন মার্কেটের ব্যবসায়ী রাকিবুল হাসান বলেন, বাজেটের পর সকল নিত্যপণ্যই আগের দামে বিক্রি করছি। একই মার্কেটের অন্য ব্যবসায়ী মো. মমিন বলেন, দাম বাড়েনি। কাপ্তানবাজারের ‘নাছরিন ট্রেডার্স’র মো. শরীফ বলেন, বাজেটে কি আছে না আছে এ নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই। ক্রেতাদের ন্যায্য ও কম মূল্যে পণ্য দিতে পারলেই আমরা খুশি। তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপণ্যে দাম বাড়েনি। মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজারের ‘শাওন ট্রেডার্স’র সৈকত বলেন, নিত্যপণ্যের দাম গেল সপ্তাহে যা ছিল এখনো তাই আছে। গতকাল কাওরানবাজার, মোহাম্মদপুর টাউনহল কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, গেল সপ্তাহের চাইতে মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে। কেজিতে ৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। আর লেয়ার মুরগি বিক্রি করছেন ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা কেজিতে। ১৫০ টাকার কেজির ব্রয়লার মুরগির দাম কেন বেড়েছে- এমন প্রশ্নে মোহাম্মদপুর টাউনহল কাঁচাবাজারের ‘চিটাগাং ব্রয়লার হাউস’র জাহিদ বলেন, এটা পাইকারি পোলট্রি ব্যবসায়ীরা বলতে পারবেন। আমরা বেশি দামে কিনে এনেছি, তাই একটু বেশি দামে বিক্রি করছি। কাওরানবাজারের কিচেন মার্কেটের কয়েকজন মুরগি ব্যবসায়ীও প্রায় একই সুরে বলেন, কাঁচাবাজারে দাম একটু উঠানামা করেই। এছাড়া সামনে ঈদুল ফিতর। এই সময়ে মুরগির মাংসের চাহিদা বেশি থাকে। এসব কারণেই হয়তো দাম একটু বেড়েছে। আর বাজারে আমদানি বাড়লে দাম কমেও যেতে পারে বলে জানান তারা। এছাড়া অন্যান্য মুরগির দামও কেজি বা প্রতি পিসে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রমজানের শুরুতে সবজির দাম বাড়লেও রমজানের প্রথম ১০ দিন পর থেকে তা কিছুটা কমে এসেছিল। গত কয়েক দিন এই ধারাবাহিকতা বাজায় থাকলেও গতকাল বাজার ঘুরে পাওয়া গেছে একটু ভিন্ন চিত্র। বিশেষ করে একই মানের সবজি বিভিন্ন বাজারে ভিন্ন দামে এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক বেশি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে। কাওরানবাজারে গতকাল লম্বা বেগুন মানভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকা ও গোল বেগুন ৪০ থেকে ৫০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। কিন্তু একই বেগুন মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। আবার কাঁচা পেঁপে, কাঁকরোল, পটল কাওরানবাজারে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও একই পণ্য মোহাম্মদপুরে বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা কেজি দরে। মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ীরা বলছেন তারা দেশের যে এলাকা থেকে সবজি আনেন তার মান ভালো, পরিবহন খরচও বেশি, তাই দামও একটু বেশি।

