মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন
বিচার বিভাগ নিয়ে কোন কথা বলা যাবে না, বললে অপরাধী হতে হবে। আইন বিভাগ বা আইন বিভাগের সংশ্লিষ্টরা যদি কোন ভুল করে বা কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেয় এবং সে সব ভুল যদি জনগণের চোখে ধরা পড়ে তাও বলা যাবে না বা মন্তব্য পর্যন্তও করা যাবে না!
অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭/১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ……..!?” দেশবাসী লক্ষ্য করেছেন, আইন বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট বিচারকরা মাঝে মাঝে ভুল করেন বা ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে বাস্তবায়ন করেন। এখানে একটা উদাহরণ দিলে তা পরিস্কার হয়ে যাবে। বেশ কয়েক বছর পূর্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল মুনির-খুকির মামলা এবং এটা নিয়ে দেশের পত্র-পত্রিকায় বেশ লেখালেখি হয়। মুনির-খুকির মামলা নিয়ে যত তোলপাড় হয়েছিল, অতীতে অন্য কোন মামলা নিয়ে এতো তোলপাড় হয়নি। এর কারণ ছিল, ওই মামলার সাথে একজন বিখ্যাত সাংবাদিকের কন্যা জড়িত ছিলেন। লম্পট মুনির তার মায়ের বয়সী খুকির প্রেমে পড়ে স্ত্রী রীমাকে হত্যা করে। পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তে আসল ঘটনা বের হয়ে আসে। ওই মামলায় মুনির ও খুকির উভয়ের ফাঁসির আদেশ দেয় বিচার বিভাগ। পরবর্তীতে তারা উচ্চ আদালতে মামলা নিয়ে গেলে, ওই আদালত মুনিরের প্রেমিকা খুকিকে বেকসুর খালাস দেয় এবং মুনিরের ফাঁসি বহাল রাখে।
উল্লেখ্য মুনিরের পরিবার ধনী ছিল বলেই মামলা উচ্চ আদালতে নিতে সক্ষম হয়েছিল। এখানে প্রশ্ন হল- যদি মুনিরের পরিবার গরীব হতো, তাহলে তো এ মামলা উচ্চ আদালতে ওঠাতে পারতো না বা সম্ভব হতো না। তাহলে মুনির-খুকির মামলার ফল কি হতো? উভয়রেই ফাঁসির রায় কার্যকরী হতো। উচ্চ আদালতে মামলা নিয়েছিল বলেই একজনের ফাঁসির আদেশ কার্যকরী হয় এবং অন্যজন বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
এ বিচারের মধ্য দিয়ে দেশবাসী বোঝতে সক্ষম হলো, বিচারকরা ভুল করে এবং তাদের ভুলের জন্য হয়তো অনেকের অকালে জীবন দিতে হয়েছে বা আজীবন কারাগারের অভ্যন্তরে ধুঁকে-ধুঁকে জীবন কাটাচ্ছেন, অথবা অনেক অপরাধী খোলা বাতাসে সুন্দরভাবে জীবন কাটাচ্ছেন। প্রশ্ন হল- দেশের মালিক প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভুলের ব্যাপারে কথা বলতে বা মন্তব্য করতে পারবেন না। কথা বললেই কোর্ট অবমাননার প্রশ্ন আসবে কেন? এ ব্যাপারে দেশবাসীকে ভাবতে হবে এবং জোরালো দাবী নিয়ে মাঠে নামতে হবে। যাদেরকে দেশবাসী তাদের কষ্টার্জিত করের টাকায় বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, তাদের ব্যাপারে জনগণ বা দেশবাসী যে কোন কথা বলা বা মন্তব্য করার অধিকার রাখেন। বিচার বিভাগে ব্রিটিশের কালো আইনগুলো বহাল রেখে আমাদের মতো দেশের মানুষ সুবিচার পাবেননা বা পেতেও পারেন না।
এইতো বেশী দিন হয়নি, রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের পূর্বপাশের প্রায় শতাধিক আবাসিক বাড়ী-ঘর ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে ওই সব বাড়ীওয়ালাদের বিতাড়িত করা হলো। বলা হয়েছিল তারা অবৈধভাবে বসবাস করছে। তারা ওই সময় অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন, সাংবাদিকদের কাছে এসেছিলেন, সুশীল সমাজের কাছে এসেছিলেন। এমনকি বিচার বিভাগের কাছেও পর্যন্ত দ্বারস্থ হয়েছিলেন কিন্তু তারা কারও সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। তাদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের নিয়ে কে কোথায় গেছেন, তার খবরও কেউ রাখেননি!! অথচ যারা সম্পূর্ণভাবে বা অবৈধভাবে বিশাল এক ভবন নির্মাণ করে বাণিজ্য করছে, তাদেরকে কেউ বাঁধা দিলো না। আজ পর্যন্ত ওই বিজিএমই ভবনটি বহাল তবিয়তে স্বমহীমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রযেছে। রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা করা হলেও, কোর্ট তাদেরকে সময় দিয়েছে। প্রশ্ন হল- যখন সাধারণ মানুষের ঘর-দুয়ার বা স্থাপনা ভেঙ্গেচুরে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলো, তখনতো বিচার বিভাগ বা সুশীল সমাজ তাদের পাশে দাঁড়ালো না বা দাঁড়াবার চেষ্টাও করলো না। তাহলে বিচার বিভাগের ওপর দেশবাসীর আস্থা থাকবে কেন? হায়রে দুনিয়ার মানুষ! সকলেই তেলা মাথায় তেল দেয়………!!!
দেশবাসী অতি ক্ষোভের সাথে বা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছে রাষ্ট্রের বা দেশবাসীর শত-শত বা হাজার-হাজার কোটি টাকা আতœসাৎ বা চুরি করে, গাড়ীতে আগুন দিয়ে, নিরীহ মানুষ হত্যা করে, সরকারী সম্পত্তি নষ্ট করে বা আতœসাৎ করে কোর্টে দাঁড়িয়ে জামিন চাইলেই, অহরহ জামিন পেয়ে যাচ্ছে এবং কিছু দিন পরে আবার তাদেরকে ওই মামলা হতে খালাস দিয়ে দিচ্ছে। শত-শত বা হাজার-হাজার কোটি টাকা চুরি করলে কারাগারে যেতে হয় না, অথচ হাজার টাকা চুরি করে অনেকে বছরের পর বছর জেলের অভ্যন্তরে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। হায়রে বিচার ব্যবস্থা আর সমাজ ব্যবস্থা……!!!
স্বৈরাচারী এরশাদ রাষ্ট্রের অর্থ সম্পদ চুরি করে রাজধানীর কাওরান বাজারে সুউচ্চ এক ভবন নির্মাণ করলো, এ ছাড়া তার দুর্নীতি ও অনিয়মেরও অভাব নেই। কই এরশাদেরতো কোন শাস্তি হলো না! আজতো এরশাদ স্বমহীমায় রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দেশ চরে বেড়াচ্ছে। যে স্বৈরাচারকে হটাবার জন্য সেলিম, তাজুন, দেলোয়ার, ময়জুদ্দিন, রাউফুুন বসুনিয়া, নূর হোসেন ও ডা. মিলনসহ অগণিত তাজা প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। আজ সে ব্যক্তি পবিত্র পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছে! সব অসম্ভবের সম্ভবের দেশ এ বাংলাদেশ। এ দেশে অনেক অসম্ভব কর্ম সম্ভব হয়ে যায় এবং তা দেশবাসীকে নীরবে মেনে নিতে হয় বা মানতে বাধ্য করা হয়।
স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর এবং আজকের বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বের বিএনপি’র বড় নেতা ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ অন্যের বাড়ী মিথ্যা বা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে দখলে নিয়ে বেদখল করে বসবাস করতে থাকে। একজন আইনজীবী হয়ে কিভাবে তিনি অন্যের বাড়ী অবৈধভাবে দখলে নিয়ে বছরের পর বছর বসবাস করেন এবং যার কারণে পুলিশ তার বাসার আসবাবপত্র রাস্তায় ফেলে দেয়। ছি! এরা আবার আইনজীবী বা দলের বড় নেতা! বিচার বিভাগ ওই বেআইনী দখলদার ব্যারিষ্টারকে কি করলো!!? এ ব্যক্তির লাজ-লজ্জা বা শরম বলতে যেন কিছুই নেই। এ সব ব্যক্তিরা লোক সমাজে বের হয় কিভাবে, এটা বোধগম্য হয় না। বলতেও লজ্জা হয়, এক ধরণের মিডিয়া এখনও এদের মত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছে…….!!!
অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া এতিমের হক আত্বসাত করার অপরাধে তাঁর নামে বিচার বিভাগে মামলা চলছে। তার বিরুদ্ধে আরো অনেক মামলা রয়েছে। তার জন্য রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে স্পেশাল কোর্টও বসানো হল। অথচ আমাদের সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” প্রশ্ন হল- এক ব্যক্তির জন্য একটি কোর্ট বসানো হল, সেখানে বিচারককে নিয়ে যাওয়া হল এবং তাঁর সাথে প্রজাতন্ত্রের অনেক কর্মচারীকেও দায়িত্বে অর্পণ করা হল। কেন একজন ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করা হচ্ছে? তাহলে এটা কি সংবিধানের চরম লঙ্ঘন নয়? যখন কোন ব্যক্তির জন্য স্পেশালভাবে বিচার বিভাগকে নিয়ে যাওয়া হয় তখনই বোঝা যায়, সেখানে কি ধরণের বিচার হবে। এখানে আমার প্রশ্ন হল- খালেদা জিয়া’র মামলা নিয়ে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কত টাকা খরচ হয়েছে এবং কত বার তাঁর তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে? যদি এক ব্যক্তির জন্য এতো খরচ, এতো সময়ক্ষেপন এবং এতো জনবলের ব্যবস্থা রাখা হয়, তবে অন্যের জন্য কি করা হবে?
এখন আসা যাক, ঝালকাঠির কাঠালিয়া রাজাপুর নির্বাচনী এলাকার এমপি বিএইচ হারুনের দুর্নীতির প্রসঙ্গ। ক্ষমতার অপব্যবহার, তথ্য গোপন, অনৈতিক কার্যকলাপের সাথে সংশ্লিষ্টতা, কর ফাঁকিসহ তার নামে অনেক অভিযোগ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হল। তার মালিকানাধীন হোটেল ‘রেইন ট্রি’ -তে অনৈতিক কর্মকান্ড সংগঠিত হলে পুলিশ প্রশাসন তার প্রমাণও পেল। এখানে প্রশ্ন হল- তার ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ কি ব্যবস্থা নিলো? নির্বাচনের পূর্বে তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের কি পরিমান অর্থ-সম্পদ ছিলো এবং কি করে মাত্র ৪ বছরের মধ্যে তাদের অর্থ-বিত্তের পরিমান কি করে এতটা বৃদ্ধি পেল!!!? তার স্ত্রীর পেশাটা কি, তিনি কি করে দ্রুত এত টাকার মালিক হয়ে গেলেন? তারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি করে যে এতো টাকা-পয়সার মালিক হয়ে গেলো রাষ্ট্র বা প্রশাসন কেন তা খতিয়ে দেখছেন না? আবার দুর্নীতি দমন (দুদক) নামে একটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, অথচ তারা এ ব্যাপারে কিছুই করছে না…….!!! যদি দুদক পত্র-পত্রিকা ফলো আপ না করবে, তাহলে পত্র-পত্রিকার প্রয়োজনই বা কেন?
অনেক সংসদ সদস্য, অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা মাদকদ্রব্য ব্যবসার সাথে জড়িত। এতো মাদক কি করে প্রবেশ করছে দেশের মধ্যে? কি করছে আইন বিভাগ, কি করছে প্রশাসন? আজকের মহাজোট সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। মহাজোট ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনী ওয়াদা করেছিলেন যে, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ-বিশেষ ব্যক্তিসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অর্থ-সম্পদের হিসেব জনসম্মুখে দেবেন। তবে কেন তারা আজ পর্যন্ত তাদের অর্থ-সম্পদের হিসেব দিচ্ছেন না??? এখানে কি করছে আইন বিভাগ??? তাহলে আইন কি কেবল গরীব মানুষের জন্য……..!!!?
হায়রে সাধের স্বাধীনতা! ওই পাকিস্তান আমলেও দেশবাসী, ছাত্র সমাজ, যুব সমাজ ও শ্রমিক সমাজ আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, সংগ্রাম করেছে। আজ স্বাধীন দেশে যেন তার চেয়ে বেশী আমলাদের প্রাধান্যতা! আমলাতন্ত্রের কারণে সর্বশ্রেণীর মানুষ আজ দিশেহারা! এ আমলাতন্ত্রের হাত থেকে বাঁচার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে ৩০ লাখ মানুষের রক্ত, ২ লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত ও ১ কোটি মানুষ পাশের দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশে আমলারা আজ স্বাধীন জাতির ওপর চেপে বসে আছে। সরকার প্রধান সংসদে দাঁড়িয়ে যখন বলেন, “আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ১২৩% বেতন বৃদ্ধি করেছি, তার পরে এতো অসন্তোষ কেন………?” তাঁর কথায় সে দিন দেশের মানুষের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, তা অদ্যাবদি শেষ হয়নি। জনগণের দুঃখ-কষ্ট ও ব্যাথা দেখার যে কেউ নেই! দুনিয়ার কোন দেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা একই সময়ে ১২৩% ভাগ বৃদ্ধি পায়নি। সেলুকাস কি বিচিত্র এ দেশ! এ দেশ অসম্ভবের দেশ। এ দেশে সবই হয় বা হয়ে যায়। কেবল গরীবের পক্ষে কিছুই হয় না। সব হয় শুধু আমলা-কামলা আর যারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত তাদের জন্য! এখানে প্রশ্ন হল- এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, মেয়র ও চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিরা আর দেশের মানুষের শতকরা হার কত? অল্পসংখ্যক মানুষের জন্য সুযোগ-সুবিধা ১২৩% ভাগ বৃদ্ধি করে দেশের সিংহভাগ মানুষের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হল, এ প্রশ্নের জবাব সরকার প্রধানকেই দিতে হবে।
লেখক : মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
ফোন # ০১৭১০৮৮৩৪১৩, ই-মেইল :

