দুদকের নীরবতা কমলাপুর আইসিডি লুটেপুটে খাচ্ছে অতিরিক্ত কমিশনার-১ মোঃ আবদুল হাকিম ডিসি মোঃ মিজানুর রহমান ও আয়েশা তামান্না

0
772

এম কাজলঃ রাজধানীর কমলাপুর আইসিডিতে কর্মরত ৩ কর্মকর্তা সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা না দিয়ে নিজেরাই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লুটেপুটে খাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ হরিলুট পরিস্থিতি নিরবে চলে আসলেও এ ধানব প্রকৃতির শীর্ষ ৩ কর্মকর্তাকে থামাবার যেন কেউ নেই। পিয়ন-সিপাহী থেকে শুরু করে সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই এদের ব্যাপারে নাখোশ থাকলেও সীমাহিন হয়রানীর শিকার হবেন এই আশংকায় কেউই মুখ খুলছেন না। শীর্ষ এই ৩ কর্মকর্তা হলেন অতিরিক্ত কমিশনার-১ মোঃ আবদুল হাকিম, উপ-কমিশনার মোঃ মিজানুর রহমান ও উপ-কমিশনার আয়েশা তামান্না।

Advertisement

আইসিডি’র সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও কর্মরত একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, অতিরিক্ত কমিশনার -১ মোঃ আবদুল হাকিম শুল্কায়ন গ্রুপ ৫,৬,৭,৮,৯,১১সহ একাধিক শাখার দায়িত্বে রয়েছেন। প্রতিদিনই এসব গ্রুপগুলোতে প্রচুর ফাইলের কাজ করতে হয়। গ্রুপগুলোর দায়িত্বে তিনি নিজে থাকার সুবাধে এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদিনই অধিকাংশ ফাইল থেকে ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের থেকে স্পিরিট মানির নামে লাখ লাখ টাকা ”ঘুষ”নিচ্ছেন। আইসিডি কমিশনার ফারজানা আফরোজ অত্যন্ত বিশ্বাস করে তাকে এ দায়িত্ব দিলেও ঠিক উল্টো কাজটাই করছেন হাকিম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগদান করার পর থেকেই তিনি স্পিরিট মানির নামে ঘুষ প্রতিনিতই খাচ্ছেন। চাকরি পর্যায়ে এসি, ডিসি, যুগ্ম-কমিশনার থেকে শুরু করে অধ্যাবধি এডিশনাল কমিশনার হয়েও ঘুষ খাচ্ছেন। এভাবে অর্থ কামিয়ে নামে-বেনামে ব্যাংক ব্যালেন্স, জমি, ফ্ল্যাটসহ অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। তার অধিনস্থ একাধিক সহকারী রাজস্ব কর্মকতা, রাজস্ব কর্মকর্তা ও ডিসি পদবীর একাধিক কর্মকর্তাকেও তিনি লাখ লাখ টাকার ঘুষ খাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে বাধাহীনভাবে স্বৈরাচারী কায়দায় লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিলেও অজানা কারনে অধরাই থেকে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে ৫ জুলাই এডিশনাল কমিশনার মোঃ আবদুল হাকিমের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি তার অফিসে এসে কথা বলার জন্যে অনুরোধ করেন। তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক তার দফতরে যাওয়ার পর তিনি উক্ত রিপোর্টারের সাথে কথা বলতে কিছুক্ষন সময় নেন। এরপর দীর্ঘক্ষণ কেটে যাওয়ার পর ভিতরে না ডাকায় উক্ত প্রতিবেদক তার মোবাইল ফোনে একাধিক ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ না করে ব্যস্ততায় আছেন বলে সিপাহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেন।
এ ব্যাপারে এনবিআরে কর্মরত নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বোর্ড সদস্য বলেন, স্পিরিট মানির নামে ঘুষ নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। হাকিম যা করছে তা বন্ধ হওয়া উচিত। এতে ডিপার্টমেন্টের বদনাম হয়। এমনিতেই আইসিডিতে প্রায় দু’শ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে।
মোঃ মিজানুর রহমান ঃ চট্টগ্রাম ভ্যাট থেকে তিনি কমলাপুর আইসিডিতে যোগদান করেছেন প্রায় অর্ধ বছর। যোগদানের পর থেকে একাধিক গ্রুপের দায়িত্ব পান তিনি। আইসিডিতে কর্মরত কাস্টমস কর্মকর্তারা বলেন, মিজানুর রহমান যে দায়িত্বে আছেন তা হলো এখানকার সবচেয়ে প্রাইজ প্রোষ্টিং। তারা অভিযোগ করে বলেন, মোঃ মিজানুর রহমান প্রতিদিন লাখ টাকার বেশি স্পিরিট মানির নামে ঘুষ বাণিজ্য নিজেই করেন। এই বিপুল টাকা তিনি কিছু সরাসরি নেন আবার তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমেও নেন। চট্টগ্রামের একাধিক ভূক্তভোগি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, চট্টগ্রাম ভ্যাটে বিভাগীয় কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এখন আইসিডিতে এসেও একই কায়দায় লাখ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিচ্ছেন। আইসিডির একাধিক ব্যবসায়ী-সিএন্ডএফ এজেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টাকা ছাড়া মিজানুর রহমান কিছুই বুঝে না। ফাইল সঠিক থাকলেও তাকে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। অন্যথায় বিভিন্ন ঝামেলায় ফেলে সীমাহিন আইনী প্যাচে ফেলে দেয়। একাধিক ব্যাংকে তার রয়েছে একাউন্ট, ফিক্সড ডিপোজিট। রয়েছে অন্যান্য সম্পদও। তার আয়ের সাথে ব্যয়ের ফারাক রয়েছে আকাশ-পাতাল। এ ব্যাপারে তার প্রতিক্রিয়া জানতে ১১ জুলাই দুপুরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।এমনকি পরবর্তীতে রিং ব্যাক না করায় তা প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।
আয়েশা তামান্না ঃ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সেবাখাত কমলাপুর আইসিডি স্টেশনে অনেক শিথীল কার্যক্রম যে চালাচ্ছে তা উপ-কমিশনার আয়েশা তামান্নাকে দিয়েই ফলক করা যায় বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আইসিডির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সহকারী কমিশনার হিসেবে আয়েশা তামান্না আইসিডিতে যোগদান করার পরই বেপরোয়াভাবে স্পিরিট মানির নামে ঘুষ নিতেন। যা অনেকটা ওপেন সিক্রেট বিষয়। সহকারী কমিশনার হিসেবে পরীক্ষণ ও শুল্কায়ন গ্রুপে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে উপ-কমিশনার হিসেবে একাধিক কমাশির্য়াল গ্রুপের দায়িত্বে আছেন। এখানেও তিনি পূর্বের ন্যায় বিরামহীমভাবে স্পিরিট মানির নামে ঘুষ নিচ্ছেন। আইসিডিতে কর্মরত একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আয়েশা তামান্না চিকিৎসা বিষয়ে লেখাপড়া করলেও মানবসেবায় না গিয়ে তিনি এসেছেন কাস্টমসে। এখানে এসে তিনি তার মনের আশা ষোল আনাই পূরণ করেছেন। নি¤œ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান আয়েশা তামান্নার নেশা শুধু স্পিরিট মানির নামে টাকাই কামানো। এ ছাড়া তার আর কোন চিন্তা ও নেশা নেই। তারা অভিযোগ কওে বলেন, বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে একাধিক একাউন্টে রয়েছে আইসিডি থেকে কামানো কয়েক কোটি টাকা ও ফিক্সড ডিপোজিট। উপ-কমিশনার পদে চাকরি করলেও তার জীবনযাপন আয়েশী। মাসিক বেতনের সাথে তার জীবনযাপন ব্যয়ের রয়েছে বিস্তর ফারাক। এ ব্যাপারে আয়েশা তামান্নার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে কমলাপুর আইসিডির কমিশনার ফারজানা আফরোজ এর বক্তব্য জানতে চাইলে তার গ্রামীণ মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিনের (দুদক) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারী কর্মকর্তারা স্পিরিট মানির নামে ঘুষ নেওয়া সম্পূর্ন্ন অবৈধ। আইসিডিতে কর্মরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগ তদন্ত করা দরকার। এভাবে অর্থ উপার্জন আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here