মাধবী ইয়াসমিন রুমা: যশোরে আলোচিত গৃহবধু ও ২ সন্তানের জননী তুলি হত্যা ঘটনা যতই দিন যাচ্ছে ততই বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, স্ত্রী ও ২ সন্তান থাকা সত্ত্বেও বিমানবাহিনীর কর্মী জুলফিকার আলী নিজেকে অবিবাহীত পরিচয় দিয়ে সাবেক প্রেমিকা এক সন্তানের জননী আখিঁ আফরিন প্রিয়া নামের এক গৃহবধুকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। আখিঁ আফরিন প্রিয়া বাঘারপাড়া থানার ছোট খদুড়া গ্রামের আলমগীর হোসেন খোকনের স্ত্রী ও যশোর কোতয়ালী থানার রাজাপুর গ্রামের আলমগীর হোসেনের কন্যা। পূর্ব সম্পর্কের জের ধরে তাদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তারা গত ২৪ ডিসেম্বরে ১০ লক্ষ টাকা কাবিনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। তথ্যানুসন্ধানে আরো জানা গেছে, বিমান কর্মী জুলফিকারের দ্বিতীয় বিয়ের কাবিনে প্রথম স্বাক্ষী হিসেবে ছিলো, জুলফিকারের ভাই বিমানকর্মী শাহাবুদ্দিন, দ্বিতীয় স্ত্রী আঁখি আফরিন প্রিয়ার বাবা আলমগীর হোসেন ও মা কোহিনূর বেগম। বিয়ের পর জুলফিকার আলী দেনার অজুহাত দেখিয়ে প্রথম স্ত্রী জিনিয়া ইয়াসমিন তুলিকে ২ সন্তানসহ কৌঁশলে ঢাকা থেকে যশোরের বাঘারপাড়ায় পাঁঠাইয়ে দেয়। তুলি তার ২ সন্তান সহ শ^শুরবাড়িতে অবস্থান করছিল। জুলফিকারের কথামত তার মা ফরিদা বেগম, ছোট ভাই শাহাবুদ্দিন ও বোন সুরাইয়া তুলিকে প্রায়ই মারধর করতো।
এরই ধারাবাহিকতায় জুলফিকারের মা ফরিদা বেগম, ভাই শাহাবুদ্দিন ও বোন সুরাইয়া পূণরায় মারধর করলে তুলির পিতা শহিদুল ছোট নাতি হামজাসহ তুলিকে গত ১২ এপ্রিল তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যায়। পরেরদিন ১৩ এপ্রিল বিকালে শ্বাশুড়ী ফরিদা বেগম তুলিকে ফোন করে জানায়, তোমার বড়পুত্র আলিফ (২) অসুস্থ্য। এ কথা জানার পর তুলির বাবা শহিদুল তুলিকে নিয়ে সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার সময় বাঘারপাড়ার পান্তাপাড়া গ্রামে পৌঁছায়। তুলির পিতা শহিদুল পাশের ঘরে এশার নামাজ পড়ছিল। হঠাৎ তুলির আত্মচিৎকার শুনতে পায়। নামাজ পড়া বাদ দিয়ে ঘর হতে বের হতে যেয়ে দেখে বাইরে থেকে দরজা আটকানো।
কোনো উপায় না পেয়ে শহিদুল পাশের ঘর টপকে তুলির ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে দেখতে পায়, শাহাবুদ্দিন তুলিকে এলাপাতাড়ীভাবে ছুরি দিয়ে আঘাত করে চলেছে। আর তার মা ফরিদা বেগম ও বোন সুরাইয়া শাহাবুদ্দিনকে সহযোগিতা করছে তুলিকে মারতে। ধারালো ছুরি দিয়ে তুলির পিঠে, পেটে, বাম হাতের কব্জির উপরে ও পায়ে মোট ১২টি মারাত্বকভাবে আঘাত করে।
তখন শহিদুল রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের কবল থেকে তুলিকে উদ্ধার করে। ওই সুযোগে ঘরের দরজা খুলে ঘাতক শাহাবুদ্দিন ও তার মা এবং বোন পালিয়ে যায়। পরে ওই এলাকার এক ব্যক্তির সহযোগিতায় মাইক্রোবাসযোগে তুলিকে প্রথমে যশোর সদরহাসপাতালে ভর্তি করে। তুলির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে যশোর সিএমএইচ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে।
অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পরের দিন ১৪ এপ্রিল সকালে তুলিকে ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন কর্তব্যরত ডাক্তাররা। সকল প্রস্তুতি শেষ করে যশোর বিমানবন্দরের নেওয়ার সময় তুলি মুত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। নিহতের ভাই আলম জানান, আপুর মৃত্যুর ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাঘারপাড়া থানা পুলিশ সিএমএইচ হাসপাতালে পৌঁছায়। সেইসাথে তাৎক্ষণিকভাবে আমার বাবা শহিদুল ইসলামকে থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে।
ওই সময় আপুর মৃতদেহের পাশে আমার পিতা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিল, তারপরও থানা পুলিশ শুধুমাত্র আমার বাবাকে এক হিসেবে জোর করেই থানায় নিয়ে যায় এজাহার দায়ের করার জন্য। সেইসাথে তাদের ইচ্ছামতো শুধুমাত্র শাহাবুদ্দিন ও তার মা ফরিদা বেগমকে আসামী করে আমার পিতার স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। আমার বাবা শুধুমাত্র তার নাম ছাড়া কিছু লিখতে ও পড়তে পারেন না।
আমার আপুর ময়নাতদন্ত ও দাফন-কাফন হওয়ার পূর্বেই থানা পুলিশের অতি উৎসাহ আমাদের অবাক করে দিয়েছে। এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, তুলিকে এলোপাতাড়ীভাবে কুপিয়ে হত্যার পর থেকে তুলির শ^াশুড়ী ফরিদা বেগম ও ননদ সুরাইয়া এখনো পর্যন্ত পলাতক রয়েছে। তবে বিশ^স্ত সূত্রে জানা গেছে, জুলফিকারের দ্বিতীয় স্ত্রী আঁখি আফরিন প্রিয়া, মা ফরিদা বেগম ও বোন সুরাইয়া একইসাথে একইস্থানে আত্মগোপন করে আছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, তুলির নেপথ্য ঘাতক স্বামী জুলফিকার তার মা, ভাই, বোন ও নিজেকে এ হত্যা মামলা থেকে বাঁচাতে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মিশনে নেমেছে বলে জানা গেছে। আর এদিকে নিহত তুলির ২ অবুঝ সন্তানসহ অসহায় বাবা শহিদুল ইসলাম ও মা সখিনা বেগম দ্বারে-দ্বারে ঘুরছে বিচারের আশায়।

