অবি ডেস্ক: উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত বাঙালির খাবারের তালিকায় মেন্যু হিসেবে গরু ও খাসির মাংস থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক চিত্র। তবে গরু-খাসির মাংসের নামে আমরা কী খাচ্ছি? এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দেশে আমদানি করছে হিয়ামিত মহিষ, ভেড়া ও দুম্বার মাংস। যার একটি বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ। বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই আমদানি করা দুম্বা-ভেড়ার মাংস দেশে ঢুকেই হয়ে যাচ্ছে খাসি এবং মহিষ হচ্ছে গরু। পাঁচতারকা হোটেল, সুপারশপ থেকে শুরু করে রাজধানীসহ দেশের চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের প্রতারণা করে ভোক্তাদের নকল খাসি ও গরুর মাংস খাওয়াচ্ছে। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, আমদানি করা মাংস জীবাণুমুক্ত কি-না, তাও যাচাই হচ্ছে না। মেয়াদহীন ও জীবাণুযুক্ত মাংস থেকে অনেক রোগের ঝুঁকি থাকে। সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানে দেশে হিমায়িত মাংস আমদানি এবং এ নিয়ে চরম অরাজকতার নানা দিক উঠে এসেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, আইনে রয়েছে হিমায়িত মাংস আমদানি করতে হলে অবশ্যই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছ থেকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট-এনওসি’ নিতে হবে। খাদ্যে জীবাণু শনাক্তে দেশের সব বিমান ও নৌবন্দরে কোয়ারেনটাইন স্টেশনও রয়েছে। সেখানে মাংসের নমুনা পরীক্ষা করাতে হয়। এতে যদি দেখা যায় ওই মাংসে জীবাণু নেই তাহলে দেশের ভেতরে তা ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাংস আমদানি করছে। তারা কেউ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে মাংস আমদানির অনুমতি নেয়নি। তাই দেশে যেসব হিমায়িত মাংস ঢুকেছে তার পুরোটাই অবৈধভাবে এসেছে।
তাহলে কীভাবে দেশে হিমায়িত মাংস আমদানি করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, আমদানি নীতিতে মাংস আমদানির ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। আমদানি নীতির ওই অস্পষ্টতার সুযোগ নিচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এ ছাড়া কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতার কারণে তারা এতদিন কোয়ারেনটাইন কর্মকর্তার এনওসি ছাড়াই মাংস দেশে ঢোকার অনুমতি দিয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমদানি নীতি সংশোধন করে নতুন শর্ত আরোপের কথা জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক সমকালকে বলেন, কী ধরনের তাপমাত্রায় রাখা হচ্ছে সেটা বিবেচনা করে মাংসের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর মাংস খেলে তাতে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের মাংস কীভাবে দেশে এলো, সেটা খতিয়ে দেখতে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঢাকা জেলার পশুসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এমদাদুল হক তালুকদার বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া মাংস আমদানি করলে তার মধ্যে ইকোলাই, অ্যানথ্রাক্স, তড়কা রোগের জীবাণু থাকতে পারে। এ ছাড়া ওই পশু খুরা রোগে আক্রান্ত ছিল কি-না, সেটা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই এ ধরনের মাংস খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি দেশি সুপার এগ্রো লিমিটেড থেকে দেশের নামি একটি সুপারশপের শাখার নামে ৫ কেজি দুম্বার মাংস কেনা হয়। প্রতি কেজির দাম ধরা হয়েছে ৬৬০ টাকা। ওই অর্ডারের বিল নম্বর হলো- ০৩৩৩০০। কাস্টমস ইনভয়েস কপি থেকে ক্রেতার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে গত ১১ মার্চ ওই প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তাদের সুপারশপের ওই ব্রাঞ্চে কখনই দুম্বার মাংস বিক্রি করা হয় না। গরু-খাসি, মুরগি, কবুতর নিয়মিত বিক্রি করেন তারা। ওই দিন খাসি প্রতি কেজি তারা বিক্রি করেছেন ৮৪০ টাকা, গরু ৫৪০ টাকা। তাহলে তার নামে কেনা দুম্বার মাংস গেল কোথায়- এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে বলেন, বিষয়টি তিনি বলতে পারবেন না। এ সম্পর্কে তার কিছু জানা নেই।
সংশ্নিষ্টরা জানান, ভারত থেকে মহিষ, ইথিওপিয়া থেকে দুম্বা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ভেড়া আনা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আরও কয়েকশ’ টন হিমায়িত মাংস দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। শিকাজু ও দেশি সুপারের হিমাগার থেকে জব্দ ৮০০ মণ মাংসের মধ্যে দুম্বার মাংসের মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর, ভেড়া ও মহিষের মাংসের মেয়াদ শেষ হয় একই বছরের জুলাইয়ে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেফ অ্যান্ড ফ্রেশ থেকে জব্দ এক হাজার ১০০ মণ মাংসের মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২০১৭ সালের জুলাইয়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রতি কেজি মাংসের গড় দাম পড়েছে ২৪০-২৫০ টাকা। কলিজার দাম পড়ে প্রতি কেজি ৯০-১০০ টাকা।
সম্প্রতি করা সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ হিমায়িত মাংস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে যারা নিয়মিত মাংস কিনত তাদের মধ্যে রয়েছে ২৬৮টি হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হল, মুহসীন হল, এফ রহমান হল ক্যান্টিনেও নিয়মিত আনা হচ্ছে এই মাংস।

