টকশোর উপস্থাপক শাহেদ করিমের বহুমুখী প্রতারণা

0
1751

মো: আহসানউল্লাহ হাসান: আমাদের দেশে প্রতারকের অভাব নেই। নিত্য নতুন প্রতারকের দুর্ধর্ষ প্রতারনার খবর আসছে টিভি সহ পত্রিকার পাতা জুড়ে। ভয়ংকর প্রতারনার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারন মানুষ। আবাসন ব্যবসার নামে প্রতারনা, বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারনা, প্রেমিক সেজে প্রেমিকার সাথে প্রতারনা, চিকিৎসা নামে প্রতারনা, খাবারের ভেজাল প্রতারনা সহ হাজার হাজার প্রতারনার মাঝে রয়েছে কিছু ভিআইপি লেভেলের প্রতারনা। এসব প্রতারকরা উচু লেভেলের মুখোশ পড়ে সমাজে বুক ফুলিয়ে প্রতারনা করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সাধারন জনগনকে বানাচ্ছে পথের ফকির।

Advertisement

আর এসব বুদ্ধিজীবি প্রতারকরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাইরে। এবার প্রতারনার শীর্ষে ডজন ডজন প্রতারনার মামলার আসামী দেশের ডিজিটাল প্রতারক টিভি টকশোর বুদ্ধিজীবি প্রতারক শাহেদ করিম। মোহনা টিভি, জিটিভি, বাংলা টিভি সহ একাধিক টিভিতে বুদ্ধির গ্যারাকলে ফেলে মনগড়া প্রশ্নবাণে শুধুমাত্র প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করে অন্তরালে নিজের প্রতারনার ফাঁদকে কণ্টক মুক্ত করা কাজেই ব্যতিব্যস্ত এই মুখোশধারী বুদ্ধিজীবী।

কখনো শাহেদ, কখনো শাহেদ করিম, কখনো শাহেদ করিম চৌধুরী, ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী, আবু জাফর চৌধুরী ইত্যাদি নামে বিভিন্ন মহলে পরিচিত হলে তার বাবার নাম কিন্তু একটাই সিরাজুল করিম। নামের প্রতারনা এরকম হলেও তার কাজের প্রতারনার ক্ষেত্রগুলো আরো বেশী ভয়ংকর। শাহেদ বিগত সময়ে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর মেজর, লে: কর্ণেল, ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ, সেনাবাহিনীর ১৪তম বিএমএ লং ফোর্সের অফিসার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার এডিসি, সচিব, ডেসটিনির মতো মাল্টিলেভেল ব্যবসার জনক উল্লেখ করে সাধারন জনগনের কাছ থেকে শত হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন দেশের সেরা বুদ্ধিজীবিদের একজন।

সামান্য দারিদ্র্য পরিবারে জন্ম নেয়া শাহেদের দ্বারা প্রতারিতদের অভিযোগের আলোকে অপরাধ বিচিত্রার অনুসন্ধানী টিম দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান চালিয়ে প্রাপ্ত কিছু চমকপ্রদ তথ্য নিয়ে এবারের প্রতিবেদন।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী ওরফে শাহেদ করিম ওরফে শাহেদ। পিতার নাম সিারজুল করিম। গ্রামের বাড়ী সাতক্ষীরা জেলায়। বর্তমানে থাকেন রাজধানীর লালবাগের হরনাথ ঘোষ লেন এলাকায়। ২০০৮ সালে ১৪ দলীয় মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শাহেদ নিজেকে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর মেজর পরিচয় দিয়ে সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন জনকে চাকুরী দেয়ার নাম করে এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদে কর্মকর্তাদের প্রমোশন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

কিন্তু বিষয়টি সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি গোচর হলে শুরু হয় বিভাগীয় তদন্ত। ফলে সশস্ত্র বাহিনীর উপসচিব মোহা: নায়েব আলী স্বাক্ষরিত ৪৪.০০.০০০০.০৭৫.০৮ .০০৪.১৪.৭১৭ স্মারক লিপিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ কে অবহিত করা হয়। স্মারক লিপিতে উল্লেখ করা হয়, শহীদ ওরফে শাহেদ বিভিন্ন সময়ে নিজেকে সেনাবাহিনীর মেজর/লে: কর্ণেল এবং ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ও সেনাবাহিনীর ১৪তম বিএমএ লং কোর্সের অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

১৯৯৬-২০০১ সময়কালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এডিসি পরিচয় দিয়ে মানুষের সাথে প্রতরানা করে যাচ্ছে। অভিযুক্ত শাহেদের নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৪২০ ধারায় ৩১ টি এবং বরিশালে ১টি সহ মোট ৩২ টি মামলা রয়েছে এবং গত মঈন-ফকরুদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সে বিএনপি নেতা খাম্বা মামুনের সাথে প্রায় দুই বছর জেল খেটেছে।


শাহেদ ২০১১ সালে ধানমন্ডির ১৫ নং রোডে এমএলএম কো: ডিবিএস ওয়ান ক্লিকেই কোটিপতি শিরোনামে লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে সাধারন মানুষের নিকট থেকে অন্তত ৫শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানে তার নাম ছিল মেজর ইফতেখার করিম। শাহেদের ডিবিএস ক্লিক ওয়ান প্রতিষ্ঠানে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগকারী শাহিন আলম তার মামলার বরাত দিয়ে বলেন, ডিবিএস ক্লিকে আমি ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি, শর্ত অনুযায়ী লভ্যাংশের আরো ৪ লাখ টাকা পাওনা আছি।

আমার মাধ্যমে আরো তিনশ লোক এই প্রতিষ্ঠানে টাকা বিনিয়োগ করেছে। গত সোমবার আমাকে টাকা দেয়ার কথা ছিলো। এসে দেখি শাহেদ গ্রুপ লাপাত্তা। শাহিন আলমের মামলার তদন্তকারী এসআই জাকির হোসেন জানান, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ইফতেখার চৌধুরী, এমডি ফারুক, সহকারী পরিচালক জিল্লুর রহমান সহ কর্মকর্তারা পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ডিবিএস ক্লিক ওয়ান প্রতিষ্ঠানটি ৩শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে।


শাহেদ বর্তমানে টিভি টকশোতে বিএনপি বিরুদ্ধে মনগড়া কথাবর্তা বলে রাজনৈকি অঙ্গনে নিজেকে বুদ্ধিজীবির কাতারে রাখলেও উত্তরার ১১ নং সেক্টরে খুলেছেন লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক ব্যবসা, রিজেন্সী ইউনিভার্সিটি, ঢাকা সেন্টাল কলেজ, আরকেসিএস মাইক্রোকেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটি। উত্তরায় কর্মসংস্থান সোসাইটির রয়েছে ১২ টি শাখা অফিস। যেখানে হাজার হাজার সদস্যের নিকট থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তার ভিজিটিং কার্ডে সে রিজেন্সী গ্রুপে চেয়ারম্যান। কিছু দিন আগে সে অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছে।

শাহেদ উত্তরা সিটি কলেজের শত শত শিক্ষার্থীকে বিনা বেতনে পড়ানো কথা বলে ফুসলিয়ে ভাগিয়ে আনেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের নিকট থেকে কৌশলে লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এই বিষয়ে দৈনিক জনকন্ঠে শাহেদের প্রতারনা শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সে রাতারাতি সেন্টাল কলেজের সাইনবোর্ড খুলে ফেলে।
শাহেদ নিজেকে ক্যাপ্টেন আবু জাফর চৌধুরী পরিচয় দিয়ে মার্কেন্টাইল কো: অপারেটিভ ব্যাংক বিমানবন্দর শাখা থেকে ৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন আত্মসাৎ করে বসে আছে। ফলে ওই কোম্পানী শাহেদের নামে ২ টি মামলা করেছে। তার নামে রাজধানী সহ সারা দেশে ৩২ টি মামলা রয়েছে। সে এখন আওয়ামীলীগ ঘরনার বুদ্ধিজীবি হওয়ায় মামলা গুলো শুধু ফাইল বন্দি অবস্থাতেই রয়েছে।


শাহেদ উচু লেভেলের বুদ্ধিজীবি। তাই প্রতারনার শিকার ভুক্তভোগিরা তার প্রতারনার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করে সুবিধা করতে পারেনা। থানায় গেলে পুলিশ তার নামে নিতে চায়না আবার মামলা নিলেও তদন্ত হয় না, আসামীকে গ্রপ্তার করে না, উল্টো ভুক্তভোগিকেই ভয়ভীতি দেখিয়ে ও বকাঝকা করে থানা থেকে বের করে দেয়া হয়।
প্রিয় পাঠক, ডিজিটাল প্রতারক শাহেদের প্রতারনার প্রতিটি ঘটনা নিয়ে আলাদা আলাদা প্রতিবেদনে প্রকাশ হবে অপরাধ বিচিত্রায়। সেই পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকুন। (চলবে….)

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here