চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ম্যাক্স হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব) । এতে হাসপাতালটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। শুধু তাই নয়, অভিযানে পাওয়া নানা ত্রুটি ও অনিয়ম সারাতে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম।
আর এর প্রতিবাদে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার ৮ই জুলাই রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে চিকিৎসক সংগঠন। রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) কার্যালয়ে জরুরি সভা শেষে প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড ল্যাব ওনারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সমপাদক ডা. লিয়াকত আলী খান এ ঘোষণা দেন। লিয়াকত আলী খান ম্যাক্স হাসপাতালের পরিচালকও। কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি নগরীর বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেবাও বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। তবে, হাসপাতালগুলোতে ভর্তি থাকা রোগীরা এই ঘোষণার আওতায় পড়বেন না। তাদের চিকিৎসা চলবে। এ ছাড়া, বেসরকারি চিকিৎসকরা প্রয়োজনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের সেবা দিতে পারবেন বলে জানান লিয়াকত আলী খান। তিনি বলেন, নগরীর বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ক্লিনিকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের প্রতিবাদে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সেবা দেয়া অব্যাহত রাখতে চিকিৎসকদের প্রতি অনুরোধ করছি। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর মেহেদীবাগ এলাকার ম্যাক্স হাসপাতাল, ওআর নিজাম রোডের মেট্রোপলিটন হাসপাতাল আর প্রবর্তক মোড়ের সিএসসিআর হাসাপাতালে একযোগে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই অভিযান শুরু হয়।
অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসেবে ডা. দেওয়ান মাহমুদ মেহেদি হাসানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সারোয়ার আলম বলেন, অভিযানে দেখা গেছে হাসপাতালটি নগরীর বিভিন্ন ভুইফোঁড় বা অখ্যাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নমুনা পরীক্ষা করিয়ে সেগুলো ম্যাক্স হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারের প্যাডে প্রিন্ট করে রোগীদের দেয়া হয়। তাতে প্রকৃত পক্ষে পরীক্ষা হয়েছে কী না সেটাই তো নিশ্চিত না। এমনকি অর্ধেক দামে অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে এনে রোগীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ দাম আদায় করা হয়। রোগীদের সঙ্গে এটা চরম প্রতারণা। এ ছাড়া হাসপাতালের প্যাথলজিতে কোনো মাইক্রোবায়োলজিস্টকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। অপারেশন থিয়েটারে পাওয়া গেছে অনুমোদনহীন ওষুধ। অস্ত্রোপচারের কাজে ব্যবহৃত অনেক সার্জিক্যাল আইটেমের মেয়াদ নেই। ম্যাক্স হাসপাতালের ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও দুই বছর আগেই মেয়াদ শেষ হয়েছে ড্রাগ লাইসেন্সের। তিনি বলেন, বায়োকেমিস্ট্রি ল্যাবে এইচএসসি পাস লোকজন চাকরি করছে। এখানে মিনিমাম স্নাতক ডিগ্রিধারী বা বিশেষ যোগ্যতাসমপন্নদের কাজ করার কথা। একটা হাসপাতাল চালাতে হলে অবশ্যই নমুনা পরীক্ষার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেটা তাদের নেই। এসব নানা অনিয়ম প্রতারণার দায়ে ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া অনিয়ম ও ত্রুটি সারাতে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে ত্রুটি সারাতে না পারলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম। প্রসঙ্গত, গলাব্যথা নিয়ে ২৮শে জুন বিকালে নগরীর মেহেদীবাগের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী মেয়ে রাইফা ২৯শে জুন রাতে মারা যায়। এ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ জানালে বিএমএ নেতারা পাল্টা হুঙ্কার ছাড়েন। এর ফলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন গত শুক্রবার রাতে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে রাইফার ভর্তির পর থেকে তার রোগ নির্ণয় ও ওষুধ প্রয়োগ যথাযথ থাকলেও সে যখন খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়, তখন চিকিৎসকের অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার দক্ষতা ও জ্ঞান তাদের ছিল না।
প্রতিবেদনে নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা এবং গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। ফলে ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই চিকিৎসককে চাকরিচ্যুত করেন।

