জাল সনদে কামাল উদ্দীন সোনালী ব্যাংকে সুদীর্ঘ ৩৫ বছর চাকরী করছেন। গোডাউন চৌকিদার থেকে সিবিএ সভাপতি হয়েছেন। প্রশাসনকে চোখ রাঙ্গিয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন পদোন্নতি। বিভিন্ন পদে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বদলীর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়না তার সবুজ সংকেত ছাড়া।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ভাগ্যবান কামালউদ্দীন সোনালী ব্যাংকে গোডাউন চৌকিদার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৮১ সালের ১২ জানুয়ারী। আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিলকৃত নবম শ্রেণির সার্টিফিকেটে তার জš§ তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৪। তার অবসরে যাওয়ার কথা ২০১৩ সালে। তার চাকরির মেয়াদ বেড়েছে এসএসসি পাসের জাল সনদ দাখিল করে। পদোন্নতিও বাগিয়ে নেন তিনি। নির্বাচন ছাড়াই এখন সোনালী ব্যাংকের সিবিএ সভাপতি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেনী জেলার পরশুরাম থানার চিতলিয়া গ্রামের মৃত নূর আহম্মদের ছেলে মোহাম্মদ কামাল উদ্দীন। আশির দশকে ঢাকার মতিঝিলে চা-পান-সিগারেট বিক্রি করতেন। পরীক্ষা ছাড়াই ১৯৮১ সালে চাকরিতে যোগ দেন। মাস্টাররোলের পদটি ছিল গুদাম চৌকিদার। এসএসসি পাসের জাল সার্টিফিকেট দাখিল করে তিনি চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন ১০ বছর। কথিত সার্টিফিকেটে তার জন্ম তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪।
রেকর্ড পত্রানুযায়ী সোনালি ব্যাংকের গোডাউন চৌকিদার কামালউদ্দীনের দাখিলকৃত এসএসসি পাসের সার্টিফিকেটে উল্লেখ রয়েছে,‘গুথুমা খানবাহাদুর আব্দুল আজিজ উচ্চ বিদ্যালয়’ থেকে ১৯৮৪ সনে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে তিনি বাণিজ্য শাখা থেকে তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ। সার্টিফিকেটটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, কুমিল্লা থেকে ১৯৮৪ সালের ২৩ জুলাই ইস্যুকৃত। সার্টিফিকেটে রোল ও নম্বর এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বরও উল্লেখ নেই। হস্তাক্ষরে লেখা সার্টিফিকেটটির লাইনে লাইনে অস্পষ্টতা।‘লেখক’, ‘পরীক্ষক’ ও ‘পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক’র স্বাক্ষরের জায়গা অস্পষ্ট। নিয়োগ সংক্রান্ত নথিতে টাইপরাইটারে লেখা নিয়োগপত্রে জন্মসনের জায়গাটিতে কাটাছেঁড়া। ইংরেজিতে হস্তাক্ষরে লেখা টেস্টমনিয়ালে তার জন্মসাল ‘১৫.২.১৯৬৪ ইং’।
এদিকে জাল সনদে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর ঘটনা উর্দ্ধতন কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জানেন।বিষয়টি আড়াল করতে তিনি সুকৌশলে প্রশাসন থেকে ২১ বছর ব্যক্তিগত ফাইলটি সরিয়ে রেখেছেন। প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মচারিদের হাত করে সবগুলো নথিতে জন্ম সাল পাল্টে দিয়েছেন। ব্যক্তিগত নথিতে থাকা কামালউদ্দীনের সার্টিফিকেটটি ভুয়া। যে সময়ে তিনি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন বলে দাবি করছেন ওই সময়ে তিনি সোনালি ব্যাংকে চাকরি করতেন। নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। এসএসসি পরীক্ষা দিলে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতেন। পরীক্ষার জন্য কোনো ছুটিও নেননি। কিভাবে তিনি ১৯৮৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তার উল্লিখিত এসএসসি পাসের সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯৮৪ সালে তার বয়স ১৭ বছরের কম। সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়স হতে হয় অন্যূন ১৮ বছর। অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক কোনো কিশোরকে সরকার নিয়োগ দেয়ার কথা নয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সোনালি ব্যাংকের সিবিএ সভাপতি বিএম বাকের হোসেনের সঙ্গে কামালউদ্দীনের বিরোধ ছিল। জাল সার্টিফিকেট ইস্যুতে বাকির হোসেন কামালকে কোন ঠাঁসা করে রাখতেন। ওই সময় তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। এক পর্যায়ে কামাল রফা করেন বাকির হোসেনের সঙ্গে।এরপর তাদের প্রকাশ্য বৈরীতার অবসান হয়। সনদ জালিয়াতির অভিযোগ অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা হলেও রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। তদন্তে সত্যতা মিললেও তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। বরং সোনালী ব্যাংকে ২০০৫ সালের পর কোনো সিবিএ নির্বাচন না হলেও কামালউদ্দীন বিনা নির্বাচনে, ‘সোনালি ব্যাংক এমপ্লয়ীজ এসোসিয়েশন (২০২)’ সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
ব্যাংকে গতকাল যোগাযোগ করে মোহাম্মদ কামালউদ্দীনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার শিক্ষাগতযোগ্যতার সনদ জালিয়াতির অভিযোগ সম্পর্কে সোনালী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সরদার নূরুল আমিন এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেননি। তিনি বলেছেন, ব্যাংকের এমডি দেশের বাইরে।
