গুড়ের নামে সাভারে তৈরি হচ্ছে ভেজাল গুড়

0
576

সাভারে নামাবাজার পাইকারি গুড়ের আড়ৎয়ের জন্য বিখ্যাত অনেকদিন থেকেই। তাই কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ভেজাল গুড়ের কারখানা। চিটাগুড়ের সঙ্গে চিনি, গোখাদ্য, রং ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে এসব কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে আখ ও খেজুর গুড়। যেখানে আখ কিংবা খেজুর রসের লেশমাত্র নেই। এমনই একটি কারখানা রুপা এন্টারপ্রাইজ। যেখানে দিনের আলোয় গুড় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও রাতের আঁধারে শুরু হয় ভেজাল গুড় তৈরী। শেষ রাতের মধ্যেই বিপুল পরিমান ভেজাল গুড় উৎপাদন করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারাদেশের খোলা বাজারে। আর এসব গুড় কিনে নিজের অজান্তেই বিষ খাচ্ছেন ভোক্তারা। তবে জেনে বুঝে এমন গুড় বিক্রি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সাভারের স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়িরা। তাদের দাবি ভেজালের কারনে সাভারে উৎপাদিত গুড় তারা এখন বিক্রি করেন না।

Advertisement

সরেজমিনে সাভার নামাবাজার এলাকার রুপা এন্টারপ্রাইজ নামের ওই গুড় তৈরির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি আটার বস্তা, আরো সাজানো রয়েছে গোখাদ্য হিসেবে ব্যাবহৃত চিটাগুড়, বিষাক্ত কাপড়ের রং, গরুর চর্বি আর কাগজে লাগানোর এক ধরনের আঠা। এসবের সংমিশ্রণে তারা তৈরি করছেন মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভেজাল গুড়।

রাতের আধারে রুপা এন্টারপ্রাইজ নামের এই গুড় তৈরির কারখানায় নিয়মিত উৎপাদন করা হচ্ছে এসব ভেজাল গুড়। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় রয়েছেন গৌতম সাহা নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ তিনি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কতিপয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছেন এই ভেজাল গুড়ের কারবার।

দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে এমন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে এমন প্রশ্ন তুলছেন সাভারের সচেতন মহল। ইতিপূর্বে ২০১৭ সালে একবার র্যাব অভিযান চালায় এই কারখানায়। সেসময় ২ লাখ টাকা জরিমানা করে কারখানার সমস্ত কাঁচামাল ও উৎপাদিত গুড় ফেলে দেয়া হয় নদীতে। পরবর্তীতে আবারো একই অভিযোগে এই কারখানায় সাভার উপজেলা রাজস্ব সার্কেল (ভূমি) অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেন। কিন্তু এতেও থেমে নেই তাদের ভেজাল গুড় উৎপাদন।

এব্যাপারে সাভার নামাবাজারের খুচরা গুড় ব্যবসায়ী মৃদুল সাহা বলেন, ময়দা, চিনি, চিটাগুড় ও চর্বির সংমিশ্রণে নামাবাজারে গৌতম বাবু গুড় বানান বলে আমরা জানি। সাভারে এসব ভেজাল গুড় উৎপাদন হওয়ায় আমরা সাভারের কোন গুড়ই বিক্রি করি না। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নির্ভেজাল গুড় সংগ্রহ করে বিক্রি করি।

অপর ব্যবসায়ী দুলাল দাশ ৩২ বছর ধরে সাভারে গুড় বিক্রি করেন। তিনি বলেন, সাভারে গৌতমের গুড় চলে না। তিনি সাভারের বাহিরে ওসব গুড় বিক্রি করেন। আমরা জেনেশুনে এমন গুড় বিক্রি করি না। তবে তার দাবি বর্তমানে চিনির মিশ্রণ ছাড়া কোন গুড়ই উৎপাদন হয় না।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত রুপা এন্টারপ্রাইজের মালিক গৌতম সাহা বলেন, আমরা মুলত কারখানায় গোখাদ্য উৎপাদন করি। আমরা গুড় উৎপাদন করি না। এসব মিথ্যা কথা। তবে প্রতিবেদকের কাছে গুড় উৎপাদনের ভিডিও সংরক্ষিত আছে এমন কথার জবাবে কিছু না বলে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়েমুল হুদা বলেন, এ ধরনের খাদ্য মানবদেহে প্রবেশের ফলে ক্যানসারসহ নানা রোগের সৃষ্টি হতে পারে এমনকি মানুষের বিভিন্ন অর্গ্যান ড্যামেজ (ধংস) হতে পারে। শিশুদের জন্য তো এমন খাদ্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব খাদ্য থেকে অব্যশ্যই বিরত থাকতে হবে।

এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর ২৩ ধারায় বিষাক্ত দ্রব্যের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন একই আইনের ২৫ ধারায় ভেজাল খাদ্য উৎপাদন এবং ৩৩ ধারায় মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় এধরণের খাদ্য উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ব্যক্ত হলে  হলে দন্ড আরোপের বিধান রয়েছে।

এছাড়াও তিনি আরো বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪২ ও ৪৩ ধারায় বিষাক্ত দ্রব্যের ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন। কিংবা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর এমন কোন খাদ্য উৎপাদন করলে ২ বছর কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আমরা এই বিষয়টি অবশ্যই ক্ষতিয়ে দেখবো। এমন প্রমান পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here