ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় শিক্ষক পরিমল জয়ধরকে যেদিন আদালত যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিলেন, সেদিন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম। মনে বড় আনন্দ হয়েছিল। যেমন কর্ম, তেমন ফল। একেবারে উচিত সাজা হয়েছে। ভেবেছিলাম, যাক আজকের পর আর কোনো ছাত্রী তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের দ্বারা কোনো ধরনের যৌন হয়রানি, নিপীড়ন বা ধর্ষণের শিকার হবে না। কিন্তু আমার ভাবনা যে কত বড় ভুল ছিল, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আদালত যেদিন পরিমল জয়ধরের রায় ঘোষণা করেন, সে দিনটি ছিল ২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর। কিন্তু গত দুই বছরের বেশি সময় দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহু ছাত্রী তাদের শিক্ষকদের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
এ ব্যাপারে সরকারিভাবে কোনো হিসাব না থাকলেও উইকিপিডিয়ার এক হিসাবে দেখা গেছে, এ ব্যাপারে প্রকাশিত খবরের সংখ্যা প্রায় ৭০। সর্বশেষ যে যৌন নিপীড়নের ঘটনার কথা জানতে পারি, তা ঘটেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। খোদ প্রধান শিক্ষক প্রায় তিন মাস ধরে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছয় ছাত্রীর ওপর নিপীড়ন চালান! চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মানে এদের বয়স ৯ থেকে বড়জোর ১১ বছর পর্যন্ত। পঁয়তাল্লিশোর্ধ্ব ওই প্রধান শিক্ষক কন্যাতুল্য এই শিশুদের সঙ্গে এই আচরণ কী করে করলেন, তা ভেবে কূলকিনারা পাই না। আমাদের সমাজে কি এতটাই পচন ধরেছে? কোনো নীতিবোধ নেই, কোনো বিবেকবোধ নেই। চাইলেই যা খুশি তা-ই করা যায়? যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর ওই ছয় ছাত্রী এখন আর স্কুলে যায় না। তিনজন ছাত্রীকে ইতিমধ্যে গ্রামের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন তাদের অভিভাবকেরা। একজনকে নতুন করে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া উপায় কী তাঁদের? কে আবার সাহস করবে মেয়েদের ওই বিদ্যালয়ে পাঠানোর? ভাবি, এ কোন সমাজে বসবাস আমাদের? যেখানে শিক্ষকেরা ছাত্রছাত্রীদের নৈতিকতার শিক্ষা দেবেন, সেখানে তাঁদেরই কেউ কেউ কিনা নীতিনৈতিকতার ধার না ধরে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি করছেন, ধর্ষণ করছেন। তবে বিশ্বাস করি, এ ধরনের নিপীড়ক শিক্ষকের সংখ্যা অতি নগন্য। কিন্তু বিষ অল্পই যথেষ্ট। এই বিষে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে অনেক মেয়ের জীবন। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা শাখার পরিমল জয়ধর স্কুলেরই দশম শ্রেণির এক ছাত্রী তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়তে গেলে জোর করে তার হাত-পা বেঁধে ও মুখে ওড়না গুঁজে দিয়ে ধর্ষণ করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি তাঁর মোবাইল ফোনে ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করেন এবং ঘটনা বলে দিলে ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন। একই ভয় দেখিয়ে ওই ছাত্রীকে আরও দুবার ধর্ষণ করেন। পরীক্ষায় বেশি নম্বর দেওয়ার লোভ দেখিয়ে এবং ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে ছাত্রীদের ধর্ষণ করেন গোপালগঞ্জের শেখ হাসিনা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক শ্রীবাস কুমার মণ্ডল। গত বছরের নভেম্বর মাসে তাঁর এ কুকীর্তির কথা ফাঁস হয়। রাজশাহী মহানগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকার একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ যৌন নির্যাতন করেছেন ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে। এ ঘটনা গত বছরের অক্টোবর মাসের। তাঁরা শিক্ষক না আর কিছু? শিক্ষক নামের কলঙ্ক তাঁরা। ছাত্রী ও অভিভাবকদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে পরিমল জয়ধরের যাবজ্জীবন হলেও শাস্তি হিসেবে শ্রীবাস কুমার মণ্ডলকে অন্য একটি কলেজে বদলি করা হয়। বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই তা-ই ঘটে। হয় বদলি, নয়তো বাধ্যতামূলক ছুটি আর নয়তো বাধ্যতামূলক অবসর। এগুলো আর যা-ই হোক, শাস্তি হতে পারে না। এসব যৌন নিপীড়নকারী, ধর্ষণকারী শিক্ষকের চাই আরও কঠোর শাস্তি। এমন শাস্তি, যে শাস্তির কথা মনে হলেই বুকে কাঁপন ধরে যাবে। অন্যরা ভয় পাবে একই ধরনের কাজ করতে। সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০০৯ সালের ১৪ মে উচ্চ আদালত কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি, বেসরকারিসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা জারি করেন। নীতিমালা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট অভিযোগ কমিটি গঠন করার কথা। তবে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের কমিটি গঠন করা হয়নি। আবার কমিটি গঠন করা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর নয়। কেন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ ধরনের কমিটি নেই বা থাকলেও কেন কার্যকর নয়, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। ওই নীতিমালায় শিক্ষা ও কর্মপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন রোধে একটি আইন করার কথাও বলা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো আইন হয়নি। সরকারের এ ব্যাপারে গাফিলতি করার আর কোনো সুযোগ নেই। খুব দ্রুত যৌন নিপীড়নবিরোধী আইন প্রণয়ন করতে হবে, যাতে থাকবে বুকে কাঁপন ধরানো শাস্তির বিধান।

