রাজধানীর চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকায় কেমিক্যালসহ দাহ্য পদার্থের ব্যবসায়ে ট্রেড লাইসেন্সসহ কারখানা ও রাসায়নিক গুদাম স্থাপনের জন্য প্রযোজ্য লাইসেন্স প্রদান বা নবায়ন অফিশিয়ালি বন্ধ রয়েছে। তারপরও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে লাইসেন্স বের করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ‘পুরান ঢাকার অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়। ভার্চুয়াল মিটিং প্ল্যাটফর্ম জুমে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন টিআইবির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. মোস্তফা কামাল।
গবেষণায় উঠে এসেছে, পুরান ঢাকায় কেমিক্যালসহ দাহ্য পদার্থের ব্যবসায়ে ট্রেড লাইসেন্সসহ কারখানা ও রাসায়নিক গুদাম স্থাপনের জন্য প্রযোজ্য লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মকর্তাদের পরামর্শে ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে ‘রাসায়নিক’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘এন্টারপ্রাইজ’ হিসেবে ট্রেড লাইসেন্স বের করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাইসেন্স বের করা কঠিন হয়ে পড়লে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব ব্যবহার করা হয়। আবার রাসায়নিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না হয়েও কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা নিজেদের নামে লাইসেন্স বের করে ব্যবসায়ীদের প্রদান করেন।
লাইন্সেন্স ও নবায়নের জন্য বিভিন্ন দফতরে নিয়মবহির্ভূত অর্থের বিনিময়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে টিআইবির গবেষণায়। এতে বলা হয়, লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নের জন্য পরিবেশ অধিদফতরে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা, বিস্ফোরক অধিদফতরে দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকা, ফায়ার সার্ভিসে ৩ থেকে ১২ হাজার টাকা এবং সিটি করপোরেশনে দেড় হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে লেনদেন হয়ে থাকে।
টিআইবি বলছে, দাহ্য পদার্থ পরিবহন করে গুদামে নেয়া পর্যন্ত ঘুষ নেয়া হয় অনেকটা প্রকাশ্যেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা চেক করে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। টহলরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গাড়িপ্রতি তিনশ টাকা করে চাঁদা নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময় গঠন করা তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে নিয়ম অনুসরণে ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে টিআইবির গবেষণায়। তারা বলছে, চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশ (গুদামের সামনের রাস্তা ৬-৯ মিটার প্রশস্ত, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে গুদামের দূরত্ব হবে পাঁচ মিটার, আবাসিক এলাকা ও ভবন বা বহুতল ভবনে রাসায়নিক মজুতের লাইসেন্স না দেয়া ইত্যাদি) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কমিটির প্রতিটি সুপারিশকে অবজ্ঞা করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে গুদাম ও কারখানার কার্যক্রম পরিচালনা ও স্থাপন অব্যাহত রয়েছে।
নিমতলী-চুড়িহাট্টাসহ পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি ও টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট দফতরকে নানা ধরনের সুপারিশ দিয়েছে জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দফতরের যেসব কর্মকর্তারা সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি যেন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা না হয়ে দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন দফতরের নিয়মবহির্ভূত লেনদেনের বিষয়ে দুদককে আমরা এনগেজড করার চেষ্টা করব। তারা অন দ্য স্পট বা ট্র্যাপ তৈরি করে তাদের আইনের আওতায় আনতে পারে।’
প্রতিবেদনের ‘গবেষণার ফলাফল’ অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরান ঢাকায় আবাসিক ভবন বা বহুতল ভবনে বিশেষ করে নিচতলায় রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম ভাড়া দেয়া ব্যাপকভাবে অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ বা অননুমোদিত গুদাম চিহ্নিত করে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এসব রাসায়নিক গুদাম বা কারখানায় মাঝে মধ্যে পুলিশি তল্লাশি চলে। ব্যবসায়ীদের মতে, মালামাল বাইরে থাকলে পুলিশ তাদেরকে হয়রানি ও নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের জন্য এসব করে। এই নিয়মবহির্ভূত অর্থ প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরাও লাভবান হন। কারণ এর মাধ্যমে তারা নিয়ম ভঙ্গ করে ব্যবসা অব্যাহত রাখতে পারেন।
টিআইবি বলছে, শিল্প-কারখানায় বিদ্যুতের লোড অনুযায়ী অনুমোদিত কোম্পানি/ঠিকাদার দিয়ে ওয়্যারিং করানো এবং বিদ্যুৎ বিভাগের ছাড়পত্র নেয়ার কথা। কিন্তু আবাসিক ভবনেই কারখানা স্থাপন করা হয় বলে সেগুলো লোড নিতে সক্ষম হয় না। ফলে শর্টসার্কিট বা ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণ হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এসব যাচাই না করেই ছাড়পত্র দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব
স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরাও কারখানা ও গুদামের মালিক বা এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া এই ব্যবসার সুবিধাভোগী হিসেবে রয়েছেন কিছু কিছু বাড়ির মালিক, ব্যবসায়িক সমিতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাংশ এবং অনেক বড় বড় কোম্পানি যারা পুরান ঢাকা থেকে প্লাস্টিক পণ্য, কাঁচামাল ইত্যাদি নিয়ে ব্যবসা করেন। তাদের পক্ষ থেকেও বাধা তৈরি হয়। অনেক মার্কেটের মালিক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের মার্কেটে থাকা রাসায়নিক গুদাম সরাতে কোনো কর্তৃপক্ষই সাহস পায় না।
একজন প্রিন্টিং প্রেসের মালিকের ভাষ্যমতে, ‘পুরো চকবাজার সিন্ডিকেটের অধীনে আছে। তাই এখানে মোবাইল কোর্ট আসলে তারা এমপির শেল্টার পায়। আগুন লাগার ব্যাপারে এখানে কেউ কথা বলতে চাইবে না। কারণ রাজনৈতিক বিপদ আছে।’

