চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
কয়েক মাস যেতে না যেতেই কর্ণফুলীতে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাবিটা প্রকল্পের অর্থায়নে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত অধিকাংশ সোলার স্ট্রীট লাইটে আলো নেই ও সোলার পাওয়ারের শক্তি ও কমে গেছে। কাগজে কলমে দরদাম ঠিক রেখে নি¤œ মানের যন্ত্রপাতি সেট করে অভিনব পদ্ধতিতে সরকারি টাকা লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে স্থানীয় জনগণ।
এ বিষয়ে তদন্তের দরকার রয়েছে বলেও দাবি জানিয়েছে পাঁচ ইউনিয়নের রাজনৈতিক সচেতন মহল।
জানা গেছে, বিগত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরেও প্রায় ৫৬ লাখ টাকার ১৫০টিরও বেশি অধিক সড়ক বাতি ও সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সাবেক উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিগত এপ্রিল ও জুন মাসে দুই দফায় বরাদ্ধকৃত সমুদয় টাকা অগ্রিম গ্রহণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন বলে সূত্রে জানায়। পটিয়া উপজেলার অধীনে তখন সাইফ পাওয়ার টেক ও পরে উদ্দীপন এনজিও সংস্থা তা বাস্তবায়ন করে কোটি টাকার এ প্রকল্প এর কাজ। বর্তমানে অন্য কিস্তির কাজ চলমান প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এমনকি পুনরায় প্রথম পর্যায়ের কিস্তি হিসেবে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের কোটায় কাবিটা প্রকল্পে প্রায় ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬৬টি সড়ক বাতি ও ১৮টি ছোট বড় সোলার প্যানেল বরাদ্ধ পায়।
দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মোতাবেক ”উদ্দীপন” নামে এনজিও’ সংসদ সদস্য কোটার এসব স্ট্রীট লাইট ও উপজেলা পরিষদের কোটার হোম সোলার সরবরাহের কাজ করেন। কিন্তু কর্ণফুলীতে কাজটি করতে গেলে বাধা হয়ে দাড়ায় অভ্যন্তরীণ একটি সিন্ডিকেট। যে সিন্ডিকেট বিবিধ খরচের নামে প্রাপ্ত বিল হতে ৭% কিংবা ৯% অর্থ ভাগ বাটোয়ারার চুক্তিতে উদ্দীপন এনজিও এর কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় বলে সুত্রে জানা গেছে। এতে অর্ধকোটি টাকার এ প্রকল্পে এনজিও সংস্থা খুবই নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও কম দামের সোলার এবং সড়ক বাতি সরবরাহ করার সুযোগ লুপে নিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে জুলধা ও চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইউপি সদস্য জানায়, তাদের ইউনিয়নে স্থাপিত সোলার স্ট্রীট লাইট প্রদানের কয়েক মাস পরেই এসব বাতিতে আলো নেই ঝাঁপসা হয়ে গেছে। কয়েকটি ষ্ট্রীট লাইট অকেঁজো হয়ে পড়েছে। মিউজিক লাইটের মত পর্যায়ক্রমে জ্বলা নেভা সোলার স্ট্রীট লাইট নিয়ে ফেসবুকেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কাগজে কলমে প্রতি সেট স্ট্রীট লাইটে ৭৭ হাজার ৪২০টাকা হতে ৫৬ হাজার ৪৯০ টাকা বরাদ্ধ থাকলেও ২০ ফুট উচ্চতার লোহার খুঁটিকে সিলভার কালার করে তার উপর ২০/২৫ হাজার টাকার সেটে ৩০ ওয়াটের সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে বলে অনেকে তথ্য দেন। ইতিমধ্যে অধিকাংশ সোলার স্ট্রীট লাইট অকেজো এবং সচল গুলো নিষ্প্রভ আলো নিয়ে জ্বলা নেভা করতে থাকে। এমনকি কয়েকটি আবার নষ্টও হয়ে গেছে।
টাকার সোলার বরাদ্ধ দেওয়া হয়। কিন্তু উদ্দীপন এনজিও আনুঃ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৬০ ওয়াটের সোলার এবং ১৫ ওয়াটের লাইট দিলেও কোন সোলার ফ্যান দেয়নি। এভাবে কয়েকটি স্পটে সোলার দিয়ে উদ্দীপন এনজিও লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেছে। যা তদন্ত করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে টিআর কাবিখা প্রকল্পে বরাদ্ধ রাস্তাঘাট ও সোলারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করবেন তাঁরা।
এদিকে নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক একাধিক ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানেরা জানান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার প্রদত্ত টাকার পরিমাণ অনুযায়ী সোলার সরবরাহ করা হয়েছে বলে উদ্দীপন এনজিও এর পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে।
সূূত্রে জানায় , মন্ত্রণালয় থেকে ”উদ্দীপন” এনজিও’কে সোলার স্থাপনের কাজ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কাজ পেয়ে এনজিও সংস্থা সরকারের নীতিমালা উপেক্ষা করে নিম্নমানের কম ক্ষমতার সোলার স্থাপন করে লাখ লাখ টাকা লোপাট করেছে।
ফলে অধিকাংশ সোলার স্ট্রীট লাইট অকেজো হয়ে পড়েছে। এতে জনপ্রতিনিধিরা টাকা মেরে খেয়েছে বলে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি চরম ভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।
এলাকার সামাজিক সংগঠন গুলোও দাবি তুলেছেন খুবই নিম্নমানের, কম দাম ও কম ক্ষমতার সোলার সরবরাহের সত্যতা স্বীকার করে তারা বলেন, জন প্রতিনিধিরা টাকা আত্মসাত করে বলে এনজিও সংস্থার কাজ তদারকির জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ক্ষমতা প্রদান করেও টাকা লোপাট বন্ধ হয় নি বরং যোগসাজেস করেছে।
বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় এই প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু এর বাস্তবায়ন কতটুকু হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানতে চাইলে উদ্দীপন সোলার প্রজেক্টের হেড মো. আলী সরকার বলেন, যে টাকাটা নেওয়া হয়েছে ওটা ওভাবে না। সাবেক ইউএনও যিনি ইউনিয়ন পরিষদে বসতেন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো নতুন উপজেলা অবকাঠামো উন্নয়নে অংশীদার হতে। ওদের অডিট সেইভ, ইন্টারনাল এক্সর্টানাল কিছু বিষয় আছে যার জন্য ওই টাকাটা কেটে নিয়েছে। অপর প্রশ্নে আপনাদের বাকি বিল আটকে রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের বিল আটকাতে পারবেনা গর্ভমেন্ট এর চাপ আছে।’
এ প্রসঙ্গে জনপ্রতিনিধিরা বলে, ‘গ্রামের মানুষের রাতে চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘœ করতে সরকার এ পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। মন্ত্রী মহোদয়ের বরাদ্দ থেকে প্রথমে ১৪২টি সড়ক বাতি ছাড়াও মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আরো ৬০টির মতো স্ট্রিট লাইট ও শতাধিক সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। এবারও ৬৬টি বাতি ও ১৮টি সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। যার ব্যয় অর্ধ কোটি টাকার উপরে কিন্তু জনগণ এর সুফল পাচ্ছেনা বলে সমালোচনা উঠেছে।
জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান, আমি যোগদানের পুর্বে কি হয়েছে সেটা আমি বলবনা। বর্তমান প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ের চেক দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪০% বিল চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। আমি বাকি কাজ খতিয়ে দেখে সঠিক ব্যবস্থা নেবো।
প্রসঙ্গত, কর্ণফুলীতে এসব সড়ক বাতি স্থাপনের অনুমোদিত ডিলার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড ( আইডিসিওল)। তাদের পক্ষে যা বাস্তবায়নে উপজেলায় কাজ করছে উদ্দীপন নামক এনজিও সংস্থা। স্ট্রিট লাইট স্থাপনের অনুমোদিত ডিলার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড ( আইডিসিওল)।
সোলার হোম সার্ভিস সিস্টেম বলতে গ্রামের মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে বসানো লাইটকে বুঝানো হয়েছে। আর স্ট্রিট লাইট হলো, গ্রামের মেঠোপথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানুষের চলাচল যেখানে বেশি। যেমন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাঁকা রাস্তায় বসানো বাতি ইত্যাদি।

