একের পর এক কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতারঃ আগামী রাজনীতির গতি প্রকৃতি

0
403

মোহাম্মদ মোশাররাফ হোছাইন খানঃ ২৮ অক্টোবরের পর প্রতিদিনই বিএনপি নেতাদের একের পর গ্রফতার করা হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীদের কারো কারো বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে বিএনপি নির্বাচনে আগে সুসংগঠিত হয়ে হরতাল, অবরোধ, অসহযোগ কোন আন্দোলন যাতে ব্যাপক শক্তিমত্তার সাথে না করতে পারে এজন্য কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারক পর্যায়ের ও যে সকল নেতা তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য (সেলফি সর্বস্ব নয়) তাদেরকে গ্রেফতার, পর্যায়ক্রমে গ্রেফতার করে চলমান আন্দোলনকে দুর্বল করার সরকার ও প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। এ কৌশল জামাআতের উপরও প্রয়োগ করা হবে। কৌশলটি পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা গেলে দলছুট বিএনপি কিছু নেতা, সরকারের বিশ্বস্ত দল সমূহ নিয়ে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা বহুলাংশেই নিরাপদ হবে। এই মূহুর্তে শেখ হাসিনার অধিনে একটি সংঘাতমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে পৌছতে যে কয়টি বিকল্প পথ আছে তার মধ্যে এটিই বেশী নিরাপদ।
বিএনপি যদি নির্বাচনে এসেই যায় অথবা বিএনপি এবং জামাআতের চলমান আন্দোলন কোন মতে সফলতা পেয়ে যায় তখন আওয়ামীলীগের পদে পদে বিপদের সম্ভাবনাও আছে। এটি মাথায় নিয়েই সরকার, আওয়ামীলীগ ও প্রশাসনের এই সুক্ষ মহাপরিকল্পনা নিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ রাখছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
আন্দোলনকারীরা যদি সফলতা পেয়ে যায় তখন সরকারের নিখুতভাবে সাজানো প্রশাসন তছনছ হয়ে যেতে পারে, বিশ্বস্ত কর্মকর্তারা কেউ কেউ হয়তো বা বিচারের মুখোমুখি হবে অথবা গুরুত্বপূর্ণ পদ সমূহ থেকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে অথবা বিশ্বস্ত হিসেবে চিহ্নিত কর্মকর্তারা অসহযোগীতাও করতে পারে এমন পরস্হিতিতে পরবর্তী নির্বাচনের গতি প্রকৃতিই বা কি হবে তাও একটি জটিল হিসাব নিকাশের বিষয় হয়ে দেখা দিতে পারে। এ কারনে যে করেই হোক বিএনপি, জামাআত যাতে আন্দোলনে সাফল্য পেতে না পারে সরকার সে দিক বিবেচনা করেই বিপদজ্জনক কঠিন পথে পেরিয়ে সাফল্য পেতে দৃঢ় অবস্হান নিয়েছে বলেও মনে করছেন অনেক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
এ ছাড়া কোন কারনে সরকারকে যদি ক্ষমতা ছাড়তেই হয় তখন খোদ শেখ হাসিনাকেও হয়তো তার দলের কাছে মুখোমুখী দাড়াতে হতে পারে, এছাড়া দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক খেলা হবে এবং বেফাস ধর্মী অনেক বক্তব্যের জন্য কঠিন প্রশ্নর জবাব দিহি করতে হতে পারে, শুধু তাই নয়, মাহবুবুল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, কামরুল ইসলাম ছিদ্দিকীর মতো অনেককে এমন অবস্হার মুখোমুখী হতে হবে যা ক্ষমতাকালীন সময় তারা ভাবতে পারছে না।
অপরদিকে, বিএনপির তৃনমূল এবং আন্দোলনমুখী নেতা কর্মীরা এখন কেন্দ্রীয় কোন নেতার একক কোন নিয়ন্ত্রণে চলছে না বলে জানিয়েছেন অনেকে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই এখন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তার সিদ্ধান্তের বাহিরে কোন সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা বিএনপির কোনো নেতা নেত্রীর নেই। তিনি যে ডিরেকশন দেন সে অনুযায়ী কাজ হয়ে থাকে। এর ব্যত্যয় ঘটার সুযোগ নেই বিএনপিতে।যেহতু, এই মূহুর্তে তারেক রহমান আন্দোন নিয়ন্ত্রণ করছেন সে কারনে বিএনপির সকল নেতাও যদি কারারুদ্ধ করা হয় এতে আন্দোলনে বিন্দু মাত্র প্রভাব পড়বে না এমনটাই মনে করছে বিএনপির তৃনমূল পর্যায়ের অনেকে। অনেকে আবার এমনও বলেছেন, এখন এ বিষয়টি ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে আসলে কে দলে থেকে সরকারের পারপাস সার্ফ করেছে, আর কে বিএনপি করেছে।
কেউ কেউ বলেছেন অজপাড়া থেকে মফস্বল, মফস্বল থেকে কেন্দ্র, সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সাথে সমভাবে তার যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন । তার সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ থাকায় আন্দোলন মুখী অনেক নেতা কর্মী বেশ সক্রিয়। এ ছাড়া তিনি ঘোষণাও দিয়েছেন একজন গ্রেফতার হলে আরেকজন যেন নিজের কে এই চিন্তা না করে মাঠের নেতৃত্ব গ্রহন করে আন্দোলন সংগ্রাম যেন চালিয়ে যায়।দলটির সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব রূহুল কবির রিজভীর বক্তব্যেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলন পুরোপুরিভাব পরিচালিত হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে। এমনও বলেছেন অনেকে।
এতে বিএনপির সকল কেন্দ্রিয় নেতাকেও যদি সরকার গ্রেফতার করে জেলবন্ধী করে রাখা হয় আন্দোলনের মাঠে খুব বেশী একটা প্রভাব পড়বে না।
এদিকে, জামাআতও একটি প্রতিশ্রুতিশীল নিয়মকান্ত্রিক মজবুত ভীতের সংগঠন।জামাআত আন্দোলন সংগ্রামের কৌশল চৌকোশভাবে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে।জামাআত যদি তাদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে আন্দোলন চালিয়ে যায় সেক্ষেত্রে সরকারের নির্বাচনী ট্রেনের সকল গতিপথ এবং হিশাব নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।
তবে আপাতদৃষ্টিতে বিএনপিকে দমিয়ে রেখে আওয়ামীলীগ নির্বাচনী রোড মার্চের যাত্রা শুরু করেছে, সব কিছু যদি ঠিক থাকে বিএনপি, জামাআত নির্বাচনে না আসলেও সরকার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাপ্ত করবে এবং টানা চতুর্থ বার শেখ হাসিনা প্রধান মন্ত্রী হবেন।
অপরদিকে, বিএনপি এবং জামাআতের আন্দোলনে সহিংসতার মাত্রাও ক্রমবৃদ্ধি হচ্ছে, এই মাত্রাটা পরবর্তীতে আরো ব্যাপক আকার ধারন করতে পারে বলেও আশংকা করছেন অনেকে।আবার কেউ কেউ বলছেন, পরবর্তী আন্দোলনে যে ব্যপক ক্ষয় ক্ষতি হবে না এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
ইতোমধ্যে, বিগত দিনে বিএনপির নেতৃত্ব নিতে আসা সেলফি সর্বস্ব নেতারা আন্দোলনের মাঠ থেকে উধাও হয়ে গেছে। আবার পুলিশের সাথে লিয়াজু করে বিপুল সংখ্যক মামলায় আসামী হওয়া নেতারাও পর্দার অন্তরালে চলে গেছে। আবার এমনও শোনা গেছে বিএনপির কিছু কিছু নেতা সংঘাতময় মূহুর্তে “ত্যাগী নেতা” সাজতে আন্দোলনের মাঠের চেয়ে জেলখানায় নিরাপদে থাকতেও বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। আবার যুবদল, শ্রমিকদল, সেচ্ছাসেবক দল, মৎসজীবি দল, কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ভিন্নপথে পদ পাওয়া নেতাদের আন্দোলনের মাঠে কিংবা দলীয় কোন কর্মসূতে পাওয়া যায় এমন নজিরও খুব কম বলে জানিয়েছেন বিএনপির অংগ সংগঠনগুলোর একাধিক সূত্র। এরা মাঝে সাজে পার্টি অফিসে দলীয় কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে কয়েকজন মিলে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্টকরেই তাদের দায়ীত্ব পালনের জানান দেয়।দলীয় গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে তাদের পাওয়া যায় না। এরাও দলীয় প্রধানের কাছে চিহ্নিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ অবস্হায় পদ বন্চিতদের অনেকে এবং তৃনমূল নেতাকর্মীরা আন্দোলনের মাঠে জীবনবাজি রেখে দলের প্রতি অবদান রেখে যাচ্ছে। দলের এই গুরুত্বপূর্ন দিনে ত্যাগী এবং পদবন্চিতরা দলকে বিপদে রেখে অভিমান নিয়ে থাকতে পারে নি বলেও জানিয়েছেন অনেকে।
২৮ তারিখের মহাসমাবেশ ভন্ডুল ও বিএনপি নেতাদের সহজে মাঠ ছেড়ে দেয়া প্রসংগে একাধিক বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতার সাথে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন কয়েক লাখ নেতা কর্মীর নিরাপত্তা এবং দলীয় বয়োবৃদ্ধ নেতাদের স্বাস্হগত বিষয়টি সামনে রেখেই সেদিন নেতাদের নিরাপদস্হানে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।এছাড়া যে কাদানো গ্যাস ছাড়া হয়েছে তাতে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত নেতারা রয়েছেন গ্যাসের প্রভাবে তাদের জীবনহানি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নেতাদের জীবন রক্ষা করাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো।ভয়ংকর এ গ্যাসে হার্টের সমস্যা, এজমা সমস্যা কিংবা অন্য কোন সমস্যা আক্রান্ত সিনিয়র নেতাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুকি এড়াতেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা মেনেই নেতারা দ্রুত জনসভাস্থল ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। তাছাড়া ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে আসা নেতা কর্মীদের জান মালের ক্ষতি করে তান্ডব সৃষ্টি করে হাজার হাজার কর্মীকে বিপদের মূখে ছেড়ে দেয়া কোন রাজনীতি হতে পারে না বলেও মত দিয়েছেন বিএনপির একটি সূত্র।
নির্বাচনের ট্রেনে আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের বেশ ফুরফুরে মেজাজেই সভা সমাবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। ২৮ অক্টোবরের পর থেকে তাদের একটি মিছিলে সশস্র পুলিশি প্রটেকশন লক্ষণীয়। কোথায়ও কোথায়ও একটি মিছিলে নেতা কর্মীর সংখ্যার চেয়ে সুসজ্জিত পুলিশের সংখ্যাই বেশী দেখা গেছে।পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া খুব কম মিছিলই লক্ষ্য করা গেছে।
আওয়ামীলীগ বাহ্যত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ খুব সহজেই পন্ড করে দিতে পরেছে। এতে সফলতাটি কার ঘরে বেশী এ নিয়েও আছে নানা আলোচনা সমালোচনা। সরকারী পক্ষ মহাসমাবেশ পন্ড করতে পারাকে তাদের মহাসফলতা হিসবে জাহির করে নেতা কর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। সভা সমাবেশেও এই সফলতাকে বেশ হাই লাইট করে দলের বিভিন্ন স্তরে বক্তারা বক্তব্যও দিচ্ছেন। তবে ২৮ অক্টোবরের ঘটনা যে আওয়ামী লীগের পূর্ব পরিকল্পিত এবং এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন পুলিশের কয়েকজন উর্ধ্বতম কর্মকর্তা তা ঘটনা পরবর্তী ভিডিও ফুটেজ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে উঠে বলেও মন্তব্য করেছেন অনেক বিশ্লেষক।
“এক অনুষ্ঠানে সরকারের তথ্যমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদেরকে আগামী ১০০ দিন রাষ্ট্র পাহারা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। ঠিক এর এক দিন পর ১৮ অক্টোবর প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে তাদের মহাসমাবেশের ডাক দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও ঘোষণা দেন, ‘তাদের (বিএনপি) দাঁড়াতেই দেওয়া হবে না। অবরোধ করতে এলে পাল্টা অবরোধ।’ এর ক’দিন পরই (২৫ অক্টোবর) ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ফজলে নূর তাপস ঘোষণা দেন, ‘২৮ অক্টোবর যেমন আমরা লগি-বৈঠা নিয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছিলাম, তেমনি এ ২৮ তারিখও আমরা গণতন্ত্রকে রক্ষা করব।’ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ ভবনে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন”।সূত্রঃ সমকাল।
দেশ এখন রাজনীতির কঠিন এক সময় অতিবাহিত হচ্ছে।সরকার যদি কোন কারনে হোচট খেয়েই যায় তা হলে একদিকে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের দল আওয়ামীলীগের তোফের মুখ থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন এমনটা যেমন আশা করা যায় না, তেমনি পরবর্তী যারা ক্ষমতায় আসবে তারাও যে গত পনের বছরের হিসাব কড়ায় গন্ডায় বুঝে নিবে না এমনটা ভাবা যায় না।এখন পর্যন্ত যা বোঝা যাচ্ছে সরকার অনেকটা শক্ত অবস্থানে থেকেই শেখ হাসিনার অধিনেই নির্বাচন শেষ করবে। তবে নির্বাচন যদিও সফলভাবে শেষ করা সম্ভব হয় উন্নয়ন সহযোগী, বানিজ্য সহযোগীদের সাথে সম্পর্ক কয়েকগুন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় তবে তিনি আগামী পাঁচ বছর নির্জন্জাটে দেশ পরিচালনার স্বক্ষম হবেন। আর যদি তা না হয় তখন ভয়ংকর অঘটন কিছু একটা ঘটে গেলেও তা অস্বাভাবিক কিছু হবে না বলেও অনেক বয়োজ্যাষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন। তারা মনে করেন, এখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে যথেষ্ট সময় আছে, আগামীদিনে আওয়ামীলীগকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত রাখার। কোন রূপ অঘটনের মাধ্যমে যদি তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয় সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনা এবং ওবায়দুল কাদের সহ মাঠে সরব নেতাদের পুরো দায়ভার নিতে হবে।এর জের কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে তা কারো হিসাবে নাও মিলতে পারে বলে মনে করেন অনেক সিনিয়র বিশ্লেষক।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here