১২৩। হাদীসঃ হযরত জারীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত; বিদায় হজ্জের দিন হুযুর (সঃ) বললেন, লোকদেরকে চুপ করাও। তারপর তিনি বললেন, তোমরা আমার ইন্তেকালের পর কুফরীর দিকে ফিরে যেয়ো না, যাতে একে অপরকে হত্যা করবে। ১২৪। হাদীস: সাঈদ ইবনে যোবায়ের (রঃ) থেকে বর্ণিত, আমি এক সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বললাম, ‘নাওফুল বুকালী’ বলে, মূসা বলতে বনী ইসরাঈলের মূসা নয়; বরং অন্য কোন মূসা। তিনি বললেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। অতঃপর তিনি এ হাদীসখানা বর্ণনা করেন। উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) নবী করীম (সঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, একদা আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) বনী ইসরাঈলদের সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে ওয়াজ নসীহত করছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করলেন, কোন ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী বা আলেম? উত্তরে মূসা (আঃ) বললেন, আমি সর্বাপেক্ষা আলেম। এ কথায় আল্লাহ তাঁর উপর অসন্তুষ্ট হন। কারণ এলেমকে আল্লাহর প্রতি সোপর্দ করা হয়নি। তাই সাথে সাথে মূসা (আঃ)-এর কাছে অহী পাঠানো হল, পারস্য ও রোমের মধ্যবর্তী দু’নদীর মিলনস্থলে আমার এমন এক বান্দা আছেন, যিনি তোমা অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী। এতদশ্রবণে মূসা (আঃ) আল্লাহর কাছে আরজ করলেন, কিভাবে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হতে পারে, আমাকে বলে দিন। সুতরাং তাঁকে বলা হল, তোমার থলির মধ্যে একটি মাছ রেখে সফর আরম্ভ কর। তারপর যেথায় তুমি মাছটি হারাবে, সেখানেই তার সাক্ষাত পাবে। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন এক যুবক, যার নাম ‘ইউশা বিন নুন’। তাঁরা থলিতে একটি ভাজা মাছও নিয়ে নিলেন। তাঁরা ভ্রমণ করতে করতে যখন নদীর কিনারায় একটি বড় প্রস্তরখণ্ডের নিকটে পৌঁছলেন, তখন উভয়ে সে প্রস্তরখণ্ডের নিকটে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় ভাজা মাছটি জীবিত হয়ে থলে থেকে বের হয়ে নদীতে লাফিয়ে পড়ল এবং তার রাস্তা ধরে চলে গেল। তা দেখে হযরত মূসা (আঃ) ও যুবক উভয়েই আশ্চর্যান্বিত হলেন। তারপর ভুলক্রমে তাঁরা উভয়েই বাকী দিন এবং রাত্র পর্যন্ত চলতে রইলেন। রাত্রি শেষে যখন ভোর হল তখন মূসা (আঃ) সঙ্গী যুবককে বললেন, আমার প্রাতঃরাশ লও।
এ ভ্রমণে আমাদের ক্লান্তি অনুভব হচ্ছে। যে স্থানে তাঁদের যাবার হুকুম ছিল, ঐ স্থান অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত মূসা (আঃ)-এর কোন ক্লান্তি অনুভব হয়নি। সঙ্গী যুবক বললেন, আপনার কি স্মরণ আছে? যখন আমরা বড় প্রস্তরখণ্ডটির কাছে অবস্থান করছিলাম, তখন তো মাছটি থলে থেকে বের হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমি আপনাকে তা বলতে ভুলে গেছি। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আমরা তো সে স্থানেরই অনুসন্ধান করছি। অতঃপর তাঁরা পুনরায় সে দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁরা উক্ত প্রস্তরখণ্ডের নিকটে এসে দেখতে পেলেন, তথায় এক ব্যক্তি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে দেখতে পেয়ে সালাম করলেন। সালাম শুনে হযরত খিযির (আঃ) বললেন, তোমাদের এ যমীনে সালাম কোথা থেকে আসল? উত্তরে তিনি বললেন, আমি মূসা (আঃ)। খিযির (আঃ) বললেন, বনী ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে বললেন, আমি কি এ শর্তে আপনার সাথে চলতে পারি যে, আপনি আপনার এলেম হতে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন। হযরত খিযির (আঃ) বললেন, দেখুন! আমার সাথে চলতে পারেন, কিন্তু আপনি তো ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। হে মূসা! আপনি জেনে রাখুন, মহান আল্লাহ তাঁর এলেম হতে আমাকে এমন কিছু এলেম দান করেছেন, যা আপনাকে দেননি। আর আপনাকে যে এলেম দেয়া হয়েছে আমাকে তা দেয়া হয়নি। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ধৈর্য ধারণকারী পাবেন। আমি কোন কাজেই আপনার বিরোধিতা করব না। অতঃপর তাঁরা উভয়ে নদীর কিনারা দিয়ে পায়ে হেঁটে চলতে লাগলেন। তাঁদের কাছে কোন নৌকা ছিল না।
অতঃপর কাছ দিয়ে একটি নৌকা যেতে দেখে তাঁরা মাঝিকে বললেন, সে যেন তাঁদেরকে নৌকায় আরোহণ করায়। মাঝি হযরত খিযির (আঃ)-কে চিনতে পারে। তাই কোন বিনিময় ব্যতিরেকে তাঁদেরকে নৌকায় আরোহণ করায়। এমন সময় একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার এক কিনারায় বসল। তারপর একবার অথবা দু’বার নদীতে তার ঠোঁট দিয়ে কিছু পানি পান করল। তখন খিযির (আঃ) মূসা (আঃ)-কে বললেন, হে মূসা। আপনার আমার এলেম আল্লাহর এলেম হতে কিছুই কমাতে পারেনি; বরং এ চড়ুই পাখি তার ঠোঁট দ্বারা নদী হতে যতটুক পানি কমাতে পেরেছে। অতঃপর খিযির (আঃ) নেমে যাবার সময় নৌকার একখানা তক্তার প্রতি লক্ষ্য করলেন, তারপর তা ভেঙ্গে দিলেন। এতে মূসা (আঃ) সহ্য করতে না পেরে বললেন, এরা এমন সম্প্রদায়, যারা আমাদেরকে কোন বিনিময় ব্যতিরেকে নৌকায় আরোহণ করিয়েছে। আর আপনি তাদের নৌকা ভেঙ্গে দিলেন, যাতে তা আরোহীদের নিয়ে ডুবে যাবে। তখন খিযির (আঃ) বললেন, আমি তো আপনাকে পূর্বেই বলেছিলাম, আপনি আমার সাথে চলে ধৈর্য রাখতে পারবেন না।
সহীহ বোখারী শরীফ হযরত মূসা (আঃ) বললেন, এ ভুলের জন্য আমায় ক্ষমা করুন। আমাকে অবাধ্য মনে করবেন না। বর্ণনাকারী বলেন, প্রথম বারের এ ঘটনা মূসা (আঃ)-এর ভুলক্রমেই হয়েছিল। অতঃপর তাঁরা পুনরায় পথ চলতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁরা এক বালককে দেখতে পেলেন, সে অন্যান্য বালকের সাথে খেলা করছে। হযরত খিযির (আঃ) উক্ত বালকের মাথা উপর থেকে ধরে উপড়ে ফেললেন। তা দেখে মূসা (আঃ) বললেন, কোন কারণ ব্যতীত আপনি একটি নিষ্পাপ বাচ্চার জীবন শেষ করে দিলেন? খিযির (আঃ) বললেন, আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলাম; আপনি আমার সাথে চলে ধৈর্য রাখতে পারবেন না। ‘ইবনে উয়াইনাহ’ বলেন, এ বাক্যে পূর্বের চেয়ে অধিক তাকিদ রয়েছে। অতঃপর তাঁরা পুনরায় পথ চলতে লাগলেন। তাঁরা এক গ্রামের অধিবাসীদের কাছে এসে কিছু খাদ্য চাইলেন, কিন্তু তারা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করে। ঐ গ্রামেই খিযির (আঃ) একটি পুরাতন প্রাচীর দেখতে পেলেন, যা পতনোন্মুখ হয়ে ছিল। তিনি স্বীয় হস্তে তা ঠিক করে দিলেন। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আপনি তো ইচ্ছা করলে তাদের থেকে কিছু পারিশ্রমিক নিতে পারতেন। তখন খিযির (আঃ) বললেন, এখানেই আপনার সাথে আমার বিদায়। নবী করীম (সঃ) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা’আলা মূসা (আঃ)-এর প্রতি রহম করুন। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল, যদি তিনি ধৈর্য সহকারে তাঁর সাথে আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারতেন, তা হলে তাঁদের আরো কিছু ঘটনা আমাদের কাছে বর্ণনা করা হত। ১২৫। হাদীসঃ হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি হুযুর (সঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ কাকে বলে? যেহেতু আমাদের কেউ যুদ্ধ করেন রাগের বশবর্তী হয়ে। আবার কেউ যুদ্ধ করেন আত্মমর্যাদাবোধ প্রকাশার্থে। অতঃপর হুযুর (সঃ) তাঁর প্রতি মাথা উঠিয়ে দেখলেন। আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হুযুর (সঃ) তাঁর প্রতি মাথা উঠিয়ে দেখার কারণ হল, সে দণ্ডায়মান ছিল। তারপর হুযুর (সঃ) বললেন, যে ব্যক্তি এ কারণে জেহাদ করবে যে, আল্লাহর কালেমা উন্নত হোক, তার জেহাদই হবে ‘জেহাদ ফী সাবীলিল্লাহ’।

