অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

0
1357

২৪ এপ্রিল সকাল সোয়া ৯টা। সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করতেই হাতের বামে বর্হিঃবিভাগ। ভিতরে ঢুকেই দেখা গেল ডাক্তার শূন্য রুম। বাইরে প্রায় ২৫-৩০ জন রোগী অপেক্ষমান। সবার চোখেমুখেই তখন বিরক্তির ছাপ। আবার অনেকেই ব্যস্ত ডাক্তারের খোঁজে। একে অপরকে জিজ্ঞাসা করছেন ডাক্তার কখন আসবে? এরই মধ্যে কানে আসলো মধ্য বয়স্ক এক নারী অপর দ’ুজন নারীকে বলছেন, ‘হ্যারা সরকারী ডাক্তার। ১০ টার আগে কেউই অ্যাইবনা।’ কথার সত্যতাও পাওয়া গেল যথাসময়ে। গত ২০ ও ২২ এপ্রিল গিয়েও একই চিত্র দেখা যায়।
এটি এখানকার নিয়মিত চিত্র উল্লেখ করে সাইফুল নামে এক রুগী বলেন, ‘আমার শ^াসকষ্ট। আমি মাঝে মাঝেই এখানে ডাক্তার দেখাতে আসি। কিন্তু সাড়ে ৯টার আগে কোন ডাক্তারই আসে না। আবার ঠিক মতো দেখেও না। আর সবসময়ই তিন টাকার টিকিট পাঁচ টাকা নেয়।’
অথচ এসব বিষয় দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আমজাদুল  হকের (ভারপ্রাপ্ত) এসব বিষয়ে কোন নজর নেই। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রত্যক্ষ মদদেই দীর্ঘদিন যাবৎ চলছে এমন অরাজকতা। আর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে যেন অনিয়মই এখানে নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী বললেন, ‘এখানে নিয়ম শুধু কর্মচারীদের জন্য, ডাক্তারদের জন্য কোন নিয়ম নেই। তারা মন চাইলে আসে, না চাইলে আসেনা।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে কনসালটেন্ট সহ ৩৫ জন ডাক্তার রয়েছেন। তার মধ্যে ২১ জন মেডিকেল অফিসার। কনসালটেন্টসহ মেডিকেল অফিসারদের সকাল সাড়ে ৯টা ১০টার আগে খুঁজে পাওয়া যায় না এবং বেলা সাড়ে ১২টার পর তারা কেউ থাকেন না। এতে রোগীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
জরুরী বিভাগে ঢুকেই চোখে পড়ল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) স্বাক্ষরিত মেডিকেল অফিসারদের ডিউটি রোষ্টার। দেখা যায়, তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে অফিস করেন। বর্হিঃবিভাগের তিনটি রুমে (১০১, ১০৩ ও ১০৪) ১১ জন ডাক্তার অফিস করার কথা থাকলেও বেলা ১২টার দিকে পাওয়া গেল মাত্র ৭ জনকে। বাকিরা আসেননি। জানা গেল, আজকে একজন আসলে কালকে আবার সে আসেননা। তিনি আবার পরদিন আসেন।
জরুরী বিভাগের সাত জন ডাক্তার প্রতিদিন সকাল, বিকেল ও রাত্রি এই তিন শিফটে তিনজন করে অফিস করার কথা থাকলেও তারা সপ্তাহে মাত্র একদিন এসে তিন শিফটে অফিস করে চলে যান। বাকি দিন তারা আসেননা। আর অন্তঃবিভাগে তিনজন অফিস করার কথা থাকলেও একেকদিন একেকজন অফিস করেন। সকাল ১০ টার পর এসে ওয়ার্ডে মাত্র একবার রাউন্ড দিয়ে চলে যান। এরপর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না বলে রোগীদের অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ফিজিওথেরাপিষ্ট কামরুন্নাহার এবং হারবাল অ্যাসিসন্ট্যান্ট আয়শা পাঁচ- ছয় বছর যাবৎ ডাঃ আমজাদুল হকের সাথে আতাত করে অফিস না করে শুধু স্বাক্ষর করে বাসায় চলে যান। প্রসুতি রুগীদের কাছ থেকে ১৫০০- ২০০০ টাকা এবং জরায়ু ক্যান্সার পরীক্ষা বিনামূল্যে করার কথা থাকলেও প্রতি রুগীর কাছ থেকে ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন দায়িত্বে থাকা নার্সরা। অপারেশনে থিয়েটারের ওয়ার্ডবয় আনিস প্রতিটি রুগীর কাছ থেকে জোরপূর্বক ৫০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকেন। আর এসব রুগীর প্রয়োজনীয় ঔষধ হাসপাতালের বিপরীত পাশের্^ অবস্থিত শিমু ফার্মেসী থেকে আনতে বাধ্য করা সহ বিভিন্ন ক্লিনিকে রুগী পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে এই আনিসের বিরোদ্ধে।
বর্হি:বিভাগে তিন টাকার টিকিট নেওয়া হয় পাঁচ টাকা। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ রুগী  বর্হি:বিভাগে সেবা নিতে আসেন। এছাড়া জরুরী বিভাগেও টাকা ছাড়া কোন কাজ হয় না।
বর্তমান এই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিভিন্ন কর্মকান্ড, ব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতায় খোদ হাসপাতালে কর্মরত অনেকেই ক্ষুব্ধ। অভিযোগ রয়েছে তার অবর্তমানে কোন সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে রয়েছে কড়া নিষেধাজ্ঞা।
এদিকে ডাঃ মোঃ আমজাদুল হক প্রায় ১০- ১১ বছর যাবৎ সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই কর্মরত আছেন। প্রথমে মেডিকেল অফিসার, পরে আবাসিক মেডিকেল অফিসার। আর বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য পঃ পঃ কর্মকর্তার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তিনি তার নামের পাশে ‘ভারপ্রাপ্ত’ লেখেন না।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ জাহিদুর রহমান (ভারপ্রাপ্ত) একই পথের পথিক। তিনিও তার নামের পাশে ভারপ্রাপ্ত লেখেন না এবং দুপুর সাড়ে ১২ টার পর হাসপাতালের আশেপাশেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে ডাঃ আমজাদুল হক আবাসিক মেডিকেল অফিসার থাকাকালীন সময়ে তার যোগসাজসে সিনিয়র কর্মকর্তা/কর্মচারীরা জুনিয়র কর্মচারীদের নামে কোয়ার্টার বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করতেছেন। ডাঃ কোয়ার্টারে ডাক্তারদের পরিবর্তে বসবাস করতেছেন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা। অভিযোগ আছে এদের মধ্যে অনেকেই বিনা ভাড়ায় বসবাস করতেছেন। সম্প্রতি বিনা টেন্ডারে গাছ কেটে প্রায় লক্ষাধিক টাকা আতœসাৎ করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরোদ্ধে।
এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ এর কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আমজাদুল  হকের (ভারপ্রাপ্ত) সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ  করে ডাক্তার না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘সেটা আপনাদের চিত্র কিন্তু আমার জানা মতে সব ডাক্তারই উপস্থিত থাকে’ এবং পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন ‘যদি ডাক্তাররা না আসত তাহলে গত তিন মাসে প্রায় ৩৫ হাজার রোগী কে দেখছে?’
ভারপ্রাপ্ত হয়েও কেন ভারপ্রাপ্ত লেখেননা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার আদেশটি একটি প্রাথমিক আদেশ আর এ আদেশ নিয়মিত হচ্ছে এবং এটি প্রশ্ন করার কোন অপশন না বলে জানান তিনি।’ এরপর তিনি একটি ট্রেনিংয়ে ব্যস্ত আছেন বলে জানিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here