সুরের করুণ রাগে আচ্ছন্ন মুক্তিযোদ্ধা ডা. গোপাল চন্দ্রের মন-প্রাণ

0

WordPress database error: [Table './abichitra_db/wp_postmeta' is marked as crashed and should be repaired]
SELECT meta_id FROM wp_postmeta WHERE meta_key = 'post_views_count' AND post_id = 4545

WordPress database error: [Table './abichitra_db/wp_postmeta' is marked as crashed and should be repaired]
INSERT INTO `wp_postmeta` (`post_id`, `meta_key`, `meta_value`) VALUES (4545, 'post_views_count', '0')

0

আবীর চক্রবর্তী
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ নাড়া দিয়েছিল তাঁকেও, তাই আর ঘরে বসে থাকা হয়নি। ভারতীয় সীমান্তের হরিণা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে পটিয়ার ধলঘাটের তৎকালীন কমান্ডার মো. করিমের নেতৃত্বে অংশ নেন মুক্তির লড়াইয়ে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় এইচএমবি ডিগ্রিধারী মানুষটি এগিয়ে আসেন অসহায় দরিদ্র রোগীদের সেবায়। আর এই সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁকে দিতে হয় চরম মূল্য। তিনি ডা. গোপাল চন্দ্র দাশ। স্বীকৃতি বঞ্চিত ৮৪ বছরের প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার এখন একটাই ইচ্ছে, নিজের ভিটায় যেন ত্যাগ হয় শেষ নিঃশ্বাসটা।
চট্টগ্রামের পটিয়া থানাধীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ধলঘাট ইউনিয়ন। এখানকার বাগদণ্ডী গ্রামে ১৯৩২ সালে ডা. গোপাল চন্দ্রের জন্ম। প্রয়াত মানিক চন্দ্র দাশ ও প্রভাবতী দাশের চার সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। বৃটিশ আমলে এন্ট্রান্স পাশ শেষে পাকিস্তান আমলে আইএ ও বি.এ এবং এইচএমবি পাশ করেন। সুন্দর হস্তাক্ষর এবং জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শীতার জন্য তিনি সবার কাছে প্রশংসীত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীর সদরঘাটস্থ ডা. জাকির হোসেন হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ডিএইচএমএস কোর্স সম্পন্ন করেন। ৩য় বর্ষে অধ্যয়নকালীন সময়ে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাকির হোসেন ১ম ও ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর দায়িত্ব দেন গোপাল চন্দ্র দাশকে। ডিএইচএমএস অধ্যয়ন শেষ করার পরই ডা.জাকির হোসেন কলেজে অধ্যাপনার প্রস্তাব পান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা পেশাকেই বেছে নেন। ১৯৭৫ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পারিবারিক জীবনে এক পুত্র ও এক কন্যার জনক। ২০১২ সালে হারিয়েছেন স্ত্রী নেলী দাশকে। ছেলে শোভন দাশকেও বানিয়েছেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। আর মেয়ে ছন্দা দাশ মুনমুন হয়েছেন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা।
স্বাধীন দেশে নিজেকে বেশ স্বাধীনই ভেবেছিলেন ডা. গোপাল। তাই নিজ সংসারের প্রতিও ছিলেন উদাসীন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কখনো নিজেকে তালিকাভুক্ত করা কিংবা সার্টিফিকেট গ্রহণ করার প্রয়োজনও মনে করেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার ঘটনায় খুবই ব্যথিত হন তিনি। এসময়কালে নগরীর বায়েজিদ এলাকায় সুলতানিয়া আয়রন এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ মিল এবং এরপর আজিজ মিয়ার ফ্যাক্টরীতে চাকরীরত অবস্থায় সেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। নিজে যে বেতন পেতেন, তা দু’হাতে বিলিয়ে দিতেন শ্রমিকদের মাঝে। নিজের পকেটের টাকায় হোমিও ওষুধ কিনে দিয়ে আসতেন রোগীদের, সঙ্গে লিখে দিতেন ওষুধ খাওয়ার নিয়মাবলী। ফলে আর্থিক অনটনে থাকলেও নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতেন না বা কারো সাহায্য সহযোগীতা নিতেও লজ্জাবোধ করতেন।
এরপর পুনরায় রাঙামাটির শেষ সীমান্তের হরিণা ক্যাম্পে গিয়ে প্রায় ত্রিশ বছর সেনাবাহিনী, বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্যদের চিকিৎসা দিয়ে গেছেন কোন প্রকার ফি ছাড়াই। পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহর এবং নিজ গ্রামে এসেও বিনামূল্যে রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন। পার্বত্যাঞ্চলের ভয়াবহ রোগ ম্যালেরিয়াসহ জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা দিয়েছেন অবলীলায়। কিন্তু বিশুদ্ধ ওষুধের অভাবে জীবন সায়াহ্নে এসে চিকিৎসা পেশা থেকে নিজেকে অনেকটা দূরে রেখেছেন এই অভিমানী। তাঁর সেবায় মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হরিণা বাজারে সাড়ে ১৭ কানি জমি দেয়া হয়। এ জমির প্রলোভন তাঁকে বিন্দুমাত্র মোহাবিষ্ট করতে পারেনি। সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন জমি গ্রহণের আবেদন।
আজীবন আত্মপ্রচার বিমুখ মানুষটির সরলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁর জন্মভিটা বাগদণ্ডীর ৬৯ শতক সম্পত্তি দখল করে নেয় দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনরা। ডা. গোপাল চন্দ্র দাশের অভিযোগ, আশ্রয় নেয়ার সুযোগে তারা পুরো সম্পত্তি দখলে নিয়ে তাঁকে কৌশলে উচ্ছেদ করেছে। নিজের দেবোত্তর সম্পত্তি ফিরে পেতে ঘুরেছেন আদালতের দ্বারে দ্বারে। নিম্ন আদালতে তিনি রায় পেলেও হাইকোর্টে বিচারাধীন আপীল মামলার রায় পেতে অপেক্ষা করছেন দীর্ঘ ১২ বছর। এ মামলার নিষ্পত্তি ও ন্যায্য বিচার চেয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন পাঠিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণে। তাই আক্ষেপ করে তিনি বলেছেন, ‘খাল কেটে কুমীর আনার প্রবাদ বাক্যটিই সত্য হয়েছে। যাদের অসহায়ত্ব দেখে আশ্রয় দিয়েছিলাম, তাদের কারণেই আমি আজ গৃহহীন, থাকতে হচ্ছে অন্যের বাড়ীতে।’
একাত্তরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘গর্ভবতী দুই মাকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে ৮-১০ জন রাজাকারের হাতে আটক হয়েছিলাম আমাদের বাগদণ্ডী গ্রামে। তারা পুড়িয়ে দেয় আমার ঘর। ঘরের সব জিনিসপত্রের সাথে পুড়ে যায় ভারত থেকে সংগৃহিত আমার মূল্যবান হোমিওপ্যাথিক ও জ্যোতিষবিদ্যার বই-পত্র। মুক্তিফৌজ আখ্যা দিয়ে তারা আমাকে একটি গাছের সাথে বেঁধে রাইফেলের বাট দিয়ে শরীরে একের পর এক আঘাত করে এবং গুলি চালায়। হাত ও ডান পায়ে হাঁটুর নিচে গুলি লাগে। রক্তক্ষরণে নিস্তেজ হয়ে গেলে একপর্যায়ে মৃত ভেবে আমাকে ফেলে চলে যায় তারা। কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যাই। তারা চলে যাবার পর নিজেকে বাঁধন মুক্ত করে পার্শ্ববর্তী পুকুরে ঝাঁপ দেই। শরীরের রক্তে লাল হয়ে যায় পুকুরের পানিও। যুদ্ধ পরবর্তীতেও স্থানীয় মো. ইদ্রিস ও আব্দুর রহমান (বর্তমানে প্রয়াত) সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার উদ্যোগ নেয় রাজাকাররা। আমি একদিন ধলঘাট বুড়াকালী বাড়ির সামনে অবস্থান করার খবর পেয়ে রাজাকাররা আমাকেও হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখান থেকে চলে আসায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই। সেই দিনগুলোর ক্ষত শুকালেও শুকায়নি আজো আমার মনের ক্ষত।’
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডা. গোপাল চন্দ্র হয়ে ওঠেন গ্রামের মানুষের মধ্যমণি। তাঁর সহজ-সরল জীবনাচার দেখে সবাই তাঁকে ‘সাধু’ নামে অভিহিত করেন। তাঁর পিতামহ বরদাচরণ নিজের যে জমি দান করেছিলেন বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য, সে জমিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান পিতার উত্তরসূরী হিসেবে তিনিও দেখভাল করেছেন। বর্তমানে বাগদণ্ডী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে পুরো গ্রামে। স্পষ্টভাষী মানুষটি যৌবনে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় নির্মিত নাটকে অংশ নিয়েছেন, ছুটে গেছেন অন্যের আপদে-বিপদে। বাংলা ভাষা-ভাষীর ওপর পাকিস্তানীদের চালানো জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছেন প্রকাশ্যে। অবসরে গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছেন বিনাবেতনে। সুঠাম দেহের অধিকারী, মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। সময় পেলেই বড়শীতে মাছ ধরতেন, বাগান করতেন এবং আপন মনে বাঁশী বাজাতেন। ভালো ফুটবল খেলতেন বলে পেয়েছিলেন বন্দরের লোভনীয় চাকরী। কিন্তু মন টেকেনি চিকিৎসা সেবার জন্য। মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছেন দীর্ঘদিন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জয়ী ডা. গোপাল চন্দ্র দাশ জীবন যুদ্ধে আজ পরাজিত সৈনিক। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি এবং অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা নিয়ে কতিপয় মানুষকে ব্যবসা করতে দেখে তিনি মর্মাহত হন ভীষণ। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে একসময় বাঁশীতে যে সুর তুলতেন, সে সুর আজ আর উঠতে চায় না। সুরের করুণ রাগে আচ্ছন্ন হয়ে আছে তাঁর মন-প্রাণ। জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁর একটাই চাওয়া-নিজের ভিটায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা। যে মাটিতে জন্মেছেন, সেই মাটিতেই যেন দেহটা হয় সমাহিত।
লেখক : সাংবাদিক

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here