প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে সরে যেতে চায় পাউবো

0
654

ক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজদের রাহুগ্রাস থেকে হাওরকে বাঁচাতে চান সবাই * বাঁধ উন্নয়নের কাজ সেনাবাহিনীকে দেয়া হোক

Advertisement

সুনামগঞ্জে হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে রাজি নন খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা চান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের মাধ্যমে এই কাজ বাস্তবায়ন করা হলে হাওরবাসী বাস্তবিক অর্থে উপকৃত হবে। এ বিষয়ে যুগান্তরের কাছে অনেকটা খোলামেলা মন্তব্য করেন খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্পটির পিডি মো. আবদুল হাই।
এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পান তারা সবাই স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মী। দরপত্র সিডিউল অনুযায়ী তারা কোনো কাজ করতে চান না। রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে তারা কোনোরকম দায়সারাভাবে কাজ করে বিল তুলে নিতে চান। আশঙ্কা আছে, ক্ষেত্রবিশেষে কাজ না করেও অনেকে বিল তুলে নিতে পারে। এতে করে এ বছর ঝুঁকিপূর্ণ অনেক বাঁধ ভেঙে গিয়ে হাজার হাজার একর উঠতি ধানের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে অপূরণীয়। একমাত্র এই ধানের ওপর নির্ভরশীল সুনামগঞ্জের লাখ লাখ পরিবার। এ কারণে অনেকে রাতারাতি পথে বসে গেছে। এ অবস্থায় তারা চাচ্ছেন সেনাবাহিনীকে এই কাজের দায়িত্ব দেয়া হলে কাজের শতভাগ মান নিশ্চিত হবে।
একই দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সমাজ সচেতন মানুষ। তাদের প্রত্যেকের মূল বক্তব্য ছিল- ক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজদের রাহুগ্রাস থেকে হাওরকে বাঁচাতে সবাই চান বাঁধ উন্নয়নের কাজ সেনাবাহিনীকে দেয়া হোক।
এদিকে সূত্র বলছে, ইতিমধ্যে ৬ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ১২৬ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। প্রকল্পটির বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬৮৫ টাকা। এ হিসাবে বাকি আছে প্রায় সাড়ে ৪শ’ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এতে আরও ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে প্রকল্প ব্যয় ৭শ’ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত হবে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সময়মতো ও যথাযথভাবে সংস্কার না করার কারণে। ৮টি বাঁধে কোনো কাজই করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খন্দকার শাহীন আহমেদ। বাকি ১৫টি বাঁধে কাজের পার্সেন্টিজ খুবই হতাশাজনক। আর সামগ্রিকভাবে গত দুই বছরে বাঁধ নির্মাণে ১৬১টি কার্যাদেশ নিয়ে ৫ থেকে ২০ ভাগ কাজের বেশি কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করেনি। পিআইসির মাধ্যমে যারা বাঁধ সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তারা প্রত্যেকেই মাটি ভরাটের কাজ বিক্রি করে লাভের খাতা খুলেছিলেন। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় পিআইসিদের দেয়া অর্থে। যে কারণে সবগুলো হাওর এখন পানির নিচে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ সদরের এমপি পীর ফজলুর রহমান মিজবাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘যে প্রক্রিয়াই হাওর উন্নয়নের কাজ করা হোক না কেন, সেটা যেন স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য হয়।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় কৃষক এবং হাওর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আগামী বছর থেকেই মহাপরিকল্পনা নেয়া হোক। আমরা কোনো কৃষকের চোখে পানি দেখতে চাই না। জনপ্রতিনিধি হিসেবে এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা হাওরবাসীর অধিকার হরণ করেছে তদের বিচার করতে হবে।’ বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করার দাবিও জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মতিউর রহমান বলেন, পিআইসি, ঠিকাদার যারাই কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের প্রত্যেককে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আর দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে পানি উন্নয়নের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। হাওরবাসীর সঙ্গে ছিনিমেলা খেলা কোনোক্রমেই সহ্য করা হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের মাধ্যমে বিশাল এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক, সেখানে এলাকার মানুষ হিসেবে আমাদেরও একই দাবি। সেনাবাহিনী এই কাজটি করলে হাওরবাসীর চেহারা পাল্টে যাবে। জগন্নাথপুরের চিলাউরা গ্রামের বাসিন্দা ও এলাকার হাওর উন্নয়ন পরিষদের সেক্রেটারি শহীদুল ইসলাম বকুল বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে হাওর উন্নয়ন হবে না। হাওরকে উন্নয়ন করতে হলে বিকল্প চিন্তা করতে হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর হাওরাঞ্চল সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিন তাহিরপুর উপজেলা সদরে এক বিশাল জনসভায় হাওর উন্নয়নে মেঘা প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণা দেন। এরপর ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here