দখল-দূষণের কবল থেকে কর্নফুলী নদী-চাকতাই খালকে বাঁচাতে হবে

0
576

মো. এনামুল হক লিটন
দখল আর দূষণ! এ দুইয়ে মিলে চট্টগ্রামের নদ-নদী ও খালগুলোকে গিলে খাচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বজ্যে ভয়াবহ দূষণের পাশাপাশি পাহাড়ি পলি মাটি, ময়লা-আর্বজনা আর পলিথিনে ভরাট হয়ে এমনিতেই বিপন্ন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাণস্পন্দন কর্ণফুলী নদী। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে অবৈধ দখলের মহোৎসব। এছাড়া বানিজ্যিক খাল হিসেবেখ্যাত চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চাক্তাই খালের অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক। অবৈধ দখলদারিত্ব, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং অবাধে আর্বজনা ফেলার কারণে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে খালটি। ফলে খালটি দিয়ে বর্তমানে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ খালটি দিয়ে একসময় কর্ণফুলী নদী থেকে নগরীর বহদ্দারহাট পর্যন্ত বানিজ্যিক পণ্যবাহী নৌ চলাচল করতো। দখলসহ নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ওই খাল দিয়ে এখন নৌ চলাচলতো দূরের কথা, জোয়ার-ভাটার পানিও প্রবাহিত হতে পারে না। এতে করে নগরীর নৌ বানিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেওয়ার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুম ছাড়াও শুস্ক মৌসুমেও জোয়ার জনিত জটিলতায় নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দেশের বানিজ্যিক রাজধানিখ্যাত চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসণেও খালটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও চাকতাই খালকে বিলিন হওয়ার হাতথেকে উত্তোরণে কোনো যুগান্তকারি পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে এমন উৎকন্ঠায় নগরবাসী। বলা বাহুল্য যে, বর্তমানে নদী-নালা ও খালগুলোর যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা, তাতে বর্ষা মৌসুমতো দূরের কথা সামান্য বৃষ্টিপাতেই বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীতে ১৪৪ কিলোমিটার দৈঘ্যের বড় খাল আছে ১৭টি। এর মধ্যে চাক্তাই খাল প্রায় ৬ কিলোমিটার। খালগুলো হচ্ছে, চাকতাই খাল, বির্জাখাল, মির্জাখাল, রাজাখাল, চশমাখাল, নাছিরখাল, খন্দকিয়াখাল, বামনশাহী খাল, শীতলঝর্ণা ছড়াখাল, খাজিরখাল, গয়নাছড়া খাল, মোগলটুলি খাল, পাকিজাখাল, কাট্রলীখাল, ত্রিপুরাখাল, ডোমখাল, হিজড়াখাল, মায়াখাল, মহেশখাল, বিবি মরিয়মখাল, সদরঘাট খাল, রামপুরাখাল ও ডাইভারশন খাল। এছাড়া নগরীতে ৪৮০ কিলোমিটার নালা-নর্দমা রয়েছে। এসব অধিকাংশ নালা-খালের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। আর এ কারণে প্রতিবারের বর্ষায় নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা জনিত অস্বস্থিকর ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সহসাই যদি এ অবস্থার উন্নতি না ঘটে এবং আসন্ন পবিত্র মাহে রমজানে যদি লাগাতার বৃষ্টি হয় তাহলে, রোজাদারসহ সাধারণ মানুষের কি পরিমান ভোগান্তি পোহাতে হবে, তা সহজেই অনুমেয়। চসিক সূত্র জানায়, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসণে সিটি কর্পোরেশন আন্তরিকভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা নিরসণের সবচাইতে বড় মাধ্যম চাকতাই খালটি সংস্কারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ড্রেজিং করাসহ বেশকিছু কাজ
চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এরপরও দখলদারদের দৌড়াতœ্য বাড়ছে বৈ কমছে না। সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে কর্ণফুলী নদী, চাকতাই খালসহ নগরীর আরো ১৭টি উপখালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবীতে প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম ও চট্টগ্রাম নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ, কেন্দ্রিয় কমিটি যৌথভাবে মানববন্ধন করেছে। একইসাথে আরো বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন সময়ে একই দাবীতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচী পালন করেছে। তাদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বারবার চেষ্টা করেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অবৈধ দখলদার কর্তৃক কর্ণফুলী নদী ও প্রধান সংযোগ খাল চাকতাই খালসহ অন্যান্য খালের ভরাট, দখল ও দূষণ থেকে কোনোভাবেই মুক্ত করতে পারছে না। দখলদারদের শেকড় কতটা গভীরে প্রোতিত হলে, পুরো নগরবাসীকে জলাবদ্ধতায় জিম্মি করে নদী-নালা, খাল-বিল দখল বানিজ্যের মতো মহোৎসব চালাতে পারে? তা সহজেই অনুমেয়। অথচ কর্ণফুলী নদী রক্ষায় ২০১০ সালে ‘হিউম্যান রাইটস্ অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামক একটি মানবাধিকার সংগঠন অবৈধ দখল-দূষণের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতের রিট দায়ের করেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ উচ্চ আদালত দীর্ঘ শুনানীর শেষে কর্ণফুলী নদী দখল করে অবৈধভাবে নির্মিত সকল অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলাসহ নতুনভাবে যে কোন স্থাপনা নির্মাণের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে রুল জারি করেছিলেন। বিজ্ঞ উচ্চ আদালতের ওই আদেশে কর্ণফুলী নদীর উভয়পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠা (সরকারি ও বেসরকারি) দুই হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা সরানোর কথাই শুধু বলা হয়েছে। একইসাথে রায় পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে দুটি জাতীয় পত্রিকায় স্থাপনা অপসারণ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়। কিন্তু নোটিশ প্রদানের ১০ দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা সরাতে বলা হলেও অদ্যবদি বিজ্ঞ উচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। ফলে কর্ণফুলী নদী-চাকতাই খালসহ নগরীর সকল নালা-খালগুলো বর্তমানে অস্থিত্ব হারাতে বসেছে। কর্তৃপক্ষের কুম্ভকর্ণের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়ছে পরিবেশ। নদী-খাল দখল বন্ধে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব না থাকলেও যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে তা সফল হচ্ছে না বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। সংগত কারণে কর্ণফুলী নদী এবং নদীর সকল সংযোগ শাখাগুলোর যতœ, পরিচর্যা ও নাব্যতা সুরক্ষা করা আমাদের রাষ্ট্র, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনগণের নৈতিক দায়িত্বে পড়ে। বিশ্বের সব দেশে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখেই দায়িত্ব পালন করা হয়। প্রয়োজনে বিশেষ অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে, এর উল্টোটি। আমরা মনে করি সময় থাকতে এবং  নগরবাসীর স্বার্থে পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবনের মাধ্যমে অনতি বিলম্বে নগরীর সকল নালা-খাল দখল করে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা সমূহ উচ্ছেদের পাশাপাশি রুখতে হবে কর্ণফুলী নদী-চাকতাই খালসহ অন্যান্য উপখাল ও নালা-নর্দমা দখলের এই মহোৎসব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here