ডিপোগুলো এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে

0
478

উপজেলার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠেছে অর্ধশতাধিক পোড়া (কালো) তেলের ডিপো। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ছাড়পত্র ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছাড়াই বিভিন্ন বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশে গড়ে উঠা এসব ডিপোতে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

Advertisement

 

এতে কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি হলেও জানমাল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে ডিপোগুলো এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ডে অবস্থিত দেশের একমাত্র জাহাজ ভাঙা শিল্পে আমদানিকৃত স্ক্র্যাপ জাহাজের বিভিন্ন পণ্যের মতো ট্যাংকিতে থাকা পোড়া তেল বিক্রি করা হয়। এলাকার কিছু ব্যবসায়ী জাহাজ থেকে এসব পোড়া তেল কিনে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কয়েক রকমের মবিল, গ্রিজ তৈরি করেন। বেশ লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এ ব্যবসা। কিন্তু এসব বিকিকিনিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি, ইউনিয়ন পরিষদের লাইসেন্সসহ বেশ কিছু শর্তপূরণের প্রয়োজন হলেও এসব প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ী কাগজপত্র ও শর্তপূরণ না করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে মাঝে মধ্যেই এসব ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডসহ নানারকম দুর্ঘটনা ঘটছে। ১৭ জানুয়ারি এভাবেই সীতাকুণ্ড উপজেলার ফৌজদারহাট আব্দুল্লাহঘাটার একটি ডিপোতে আগুন লাগলে ডিপো, ভাড়াঘর ও নিটল টাটার সার্ভিসিং কারখানা পুড়ে কয়েক কোটি টাকার সম্পদহানি হয়। এ সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ ছিল। সরেজমিনে উপজেলার সর্বদক্ষিণের সলিমপুর, ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি, কুমিরা ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকার সাগর উপকূল থেকে মহাসড়ক ও রেললাইনের আশপাশে বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু পোড়া তেলের ডিপো গড়ে ওঠেছে। পরিদর্শনকালে সলিমপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘শিপব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে পোড়া তেল কিনে অনেকে ডিপো গড়ে তুলছেন কোনো নিয়ম না মেনে। ডিপোগুলোর কোনো লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কর্মী কিছুই নেই। ফলে একবার আগুন লাগলে আশপাশের বাড়ি-ঘর-দোকানপাট সব পুড়ে যায়।’ তিনি জানান, গত ১৭ জানুয়ারি আব্দুল্লাহঘাটা এলাকায় নামবিহীন যে ডিপোতে আগুন লাগে তা এতই ভয়াবহ ছিল যে চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ডের ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের ২৪টি টিমকে আগুন নেভাতে কাজ করতে হয়। এরপরও রক্ষা করা যায়নি পার্শ্ববর্তী ৬টি ভাড়াঘর ও নিটল টাটার কারখানা। আর কারখানাটি মহাসড়ক ও রেলপথের মাঝামাঝি অবস্থিত হওয়ায় দুই দিকেই যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। একইভাবে কয়েকবছর আগে ফৌজদারহাটে আরো একটি ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সে ঘটনায় মহাসড়কে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। ফৌজদারহাট তুলাতলীর বাসিন্দা গিয়াস কামাল সাগর অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ঘরের সাথেই একটি ডিপোতে পোড়া তেল, মবিল পোড়ানো হয়। যখন তেল পোড়ানো হয় তখনই এতই দুর্গন্ধ বের হয় যে ঘরের নারী-শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়। কিন্তু এসব ব্যবসায়ী কারো কথায় কর্ণপাত করেন না। আর সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরকেও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে দেখি না। ফলে এসব অবৈধ ব্যবসা বেড়েই যাচ্ছে।’এলাকাবাসী জানান, প্রায় সব পোড়া তেল ডিপোই কারো না কারো দুর্ভোগের কারণ ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির মধ্যে আছে। সলিমপুর থেকে কুমিরা-বাঁশবাড়িয়া এলাকায় প্রায় অর্ধশত পোড়া তেলের ডিপো রয়েছে। এদিকে স্ক্র্যাপ জাহাজের পোড়া তেল ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ওয়াকার বলেন, ‘অর্ধশতাধিক নয় সীতাকুণ্ডে ৪২টি পোড়া তেলের ডিপো রয়েছে। স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে পোড়া তেল এনে ডিপোগুলোতে মজুত রাখা হয়। পরে ওই তেল বিক্রি করা হয়ে থাকে।’ বিস্ফোরকসহ সরকারি দপ্তরের অনুমোদনপত্র তাঁদের কাছে আছে জানিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেও ছাড়পত্র মেলেনি।’ এদিকে পোড়া তেল ব্যবসায়ীরা নিজের পক্ষে সাফাই গাইলেও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, ‘পোড়া তেলের ডিপোগুলো অবৈধ। এগুলোর কোনো ছাড়পত্র নেই। আবাসিক এলাকায় এভাবে কোনো ডিপো হতে পারে না। তাদের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা কিংবা সেফটির কোনো কিছুই নেই। এ কারণে ১৭ জানুয়ারি আব্দুল্লাহঘাটা এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। সেই ঘটনায় ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ঘটনাটির তদন্ত করছে।’ পোড়া তেল ব্যবসার অনিয়মের কথা জানান ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিনও। তিনি বলেন, ‘উপজেলায় অনেক পোড়া তেলের ডিপো আছে। শুধু আমার ইউনিয়নে মনে হয় ১৫-২০টি ডিপো আছে। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে ব্যবসায়িক লাইসেন্স নিয়েছে মাত্র ৩-৪ জন। কিন্তু তাদেরকে আমি পরিবেশের ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংগ্রহের শর্ত দিয়েছিলাম। শুনছি তাও মানছে না তারা।’পরিবেশ অধিদপ্তর তদন্ত করলে অনিয়মের বিষয়টি বেরিয়ে আসত বলে জানান তিনি। এসব বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিকের কাছে ফোন করলে তিনি এ বিষয়ে অন্য এক কর্মকর্তা দেখভাল করেন বলে জানান। তবে তাঁর সাথে যোগাযোগের কোনো ফোন নম্বর তিনি দেননি।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here